হরিণাকুণ্ডুতে মাঠে কাজ করার সময় বজ্রপাতে কৃষকের মর্মান্তিক মৃত্যু, দিশেহারা পরিবার

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

ঝিনাইদহ জেলার হরিণাকুণ্ডু উপজেলায় কালবৈশাখী ঝড় ও বৃষ্টির মধ্যে মাঠে কাজ করার সময় আকস্মিক বজ্রপাতে আজিজুল ইসলাম নামের এক কৃষকের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। বুধবার, ১০ জুন বিকেলে উপজেলার চটকাবাড়ীয়া গ্রামে এই হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে। ৪০ বছর বয়সী আজিজুল ইসলাম ওই গ্রামেরই বাসিন্দা আব্দুর রহিমের ছেলে। জীবিকার সন্ধানে মাঠে গিয়ে লাশ হয়ে ফেরা এই কৃষকের মৃত্যুতে পুরো গ্রামে এখন শোকের মাতম চলছে।

স্থানীয় গ্রামবাসী ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বুধবার দুপুরের পর থেকেই এলাকার আকাশ ঘন কালো মেঘে ঢেকে যায়। কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হয় প্রবল ঝড়ো হাওয়া ও মুষলধারে বৃষ্টি। আজিজুল ইসলাম তখন নিজের কৃষিজমিতে ফসলের পরিচর্যা করছিলেন। বৃষ্টি শুরু হলেও কাজ দ্রুত শেষ করে বাড়ি ফেরার তাগিদে তিনি মাঠেই থেকে যান। এমন সময় হঠাৎ বিকট শব্দে ঠিক তার ওপর বজ্রপাত হয়। শক্তিশালী বিদ্যুতের ঝলকানিতে তিনি মারাত্মকভাবে দগ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। তার শরীর ঝলসে যায়।

আশপাশের অন্য জমিতে কাজ করা কৃষকরা এই ভয়ংকর ঘটনাটি দেখতে পেয়ে নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দ্রুত তার দিকে ছুটে আসেন। তারা তাকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে হরিণাকুণ্ডু উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের দিকে রওনা দেন। কিন্তু বিধিলিপি ছিল অন্যরকম। হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই পথিমধ্যে আজিজুল মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পৌঁছানোর পর কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে পরীক্ষা করে মৃত ঘোষণা করেন। খবর পেয়ে স্বজনরা হাসপাতালে ছুটে গেলে সেখানে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়।

আজিজুলের এই অকাল মৃত্যুতে তার পরিবারটি এখন রীতিমতো পথে বসেছে। তিনি ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তার আয়ের ওপর নির্ভর করেই স্ত্রী ও সন্তানদের প্রতিদিনের সংসার চলত। স্বামীকে হারিয়ে স্ত্রী এখন বারবার জ্ঞান হারাচ্ছেন। অবুঝ সন্তানরা এখনো ঠিকমতো বুঝতে পারছে না যে তাদের মাথার ওপরের ছাদ চিরতরে হারিয়ে গেছে। প্রতিবেশীরা এই শোকাহত পরিবারটিকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন, কিন্তু কোনো কথাই তাদের কান্না থামাতে পারছে না। গ্রামের সাধারণ মানুষও এক পরিশ্রমী ও সৎ মানুষকে হারিয়ে গভীরভাবে শোকাহত।

বাংলাদেশে প্রতি বছরই বজ্রপাতের কারণে শত শত মানুষের প্রাণ যায়। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বজ্রপাতে মারা যাওয়া মানুষের প্রায় ৭০% থেকে ৮০% হলেন সাধারণ কৃষক ও দিনমজুর। তারা জীবিকার তাগিদে খোলা মাঠে কাজ করার সময় এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের নির্মম শিকার হন। সরকার সাধারণত বজ্রপাতে নিহত প্রতিটি দরিদ্র পরিবারকে তাৎক্ষণিক সাহায্য হিসেবে ২০ হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকা দিয়ে থাকে। বর্তমান আন্তর্জাতিক মুদ্রার হিসাবে এই অনুদানের পরিমাণ প্রায় ১৭০থেকে২১০(ডলার) এর সমান। কিন্তু একটি পরিবারের প্রধান উপার্জনকারী মানুষটি চলে গেলে এই সামান্য টাকায় তাদের পুরো জীবন কীভাবে চলবে, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।

পরিবেশবিদরা মনে করেন, দেশে বজ্রপাতের হার এত বেশি বেড়ে যাওয়ার পেছনে মূল কারণ হলো নির্বিচারে বড় গাছ কেটে ফেলা। বিশেষ করে গ্রামগঞ্জে তালগাছের সংখ্যা এখন অনেক কমে গেছে। আগে মাঠেঘাটে প্রচুর উঁচু তালগাছ থাকত, যা বজ্রপাত নিজের দিকে টেনে নিয়ে সাধারণ মানুষের জীবন বাঁচাত। সরকার সারা দেশে কয়েক লাখ তালগাছের চারা লাগানোর একটি বড় প্রকল্প হাতে নিয়েছিল। কিন্তু তদারকি ও অবহেলার কারণে সেই চারাগুলোর মাত্র ২০% থেকে ৩০% শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে পেরেছে। ফলে খোলা মাঠে কাজ করা কৃষকরা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি মৃত্যুঝুঁকির মধ্যে থাকেন।

এই মর্মান্তিক ঘটনার পর স্থানীয় প্রশাসন ও আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা সাধারণ মানুষকে বারবার সতর্ক করছেন। তারা কৃষকদের নির্দেশ দিচ্ছেন, আকাশে কালো মেঘ জমলে বা বৃষ্টির সামান্য পূর্বাভাস পেলেই তারা যেন দ্রুত কাজ ফেলে নিরাপদ স্থানে চলে যান। বজ্রপাতের সময় খোলা মাঠ, উঁচু গাছ বা বিদ্যুতের খুঁটির নিচে দাঁড়ানো একদমই উচিত নয়। দুর্যোগের সময় ঘরের ভেতর থাকা এবং সব ধরনের বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি থেকে নিজেদের দূরে রাখাই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।

আজ সকালে গ্রামের মসজিদে জানাজা শেষে আজিজুল ইসলামকে তাদের পারিবারিক গোরস্থানে দাফন করা হয়েছে। গ্রামবাসী তার আত্মার শান্তি কামনা করেছেন। আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, আগামী কয়েক দিন দেশের বিভিন্ন স্থানে এমন ঝড় ও বজ্রপাত অব্যাহত থাকতে পারে। তাই নিজের এবং পরিবারের জীবন বাঁচাতে প্রতিটি মানুষকে এখন অনেক বেশি সচেতন হতে হবে। একটু সতর্কতা হয়তো বাঁচিয়ে দিতে পারে এমন অনেক আজিজুলের জীবন, রক্ষা করতে পারে একটি সুন্দর ও সাজানো পরিবারকে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ