প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজের পৈতৃক ভিটা পরিদর্শনে আসবেন, তাই রাতারাতি একটি কাঁচা রাস্তায় ইট বিছিয়ে চলাচলের উপযোগী করেছিল স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। কিন্তু তিনি ঢাকা ফিরে যাওয়ার পরপরই সেই সড়ক থেকে সব ইট তুলে নিয়ে গেছে কর্তৃপক্ষ। মাত্র আধা কিলোমিটার রাস্তার এই অদ্ভুত ভেলকিবাজিতে এখন চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন বগুড়ার গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ী এলাকার সাধারণ মানুষ। বৃষ্টির দিনে কাদা মাড়িয়ে চলতে গিয়ে এলাকাবাসীর ক্ষোভ এখন চরমে পৌঁছেছে। সরকারি টাকার এমন অপচয় ও লোকদেখানো কাজ নিয়ে পুরো উপজেলাজুড়ে এখন ব্যাপক সমালোচনা চলছে।
স্থানীয়রা জানান, গাবতলী উপজেলার নশিপুর ইউনিয়ন পরিষদ থেকে চৌকির খাল হয়ে প্রধানমন্ত্রীর পৈতৃক বাড়ি পর্যন্ত রাস্তাটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৫০০ মিটার। এই কাঁচা সড়কটি পাকাকরণের জন্য গত অর্থবছরেই এলজিইডি ৮৪ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়। বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী এই টাকার পরিমাণ প্রায় ৭০ হাজার ডলার ($৭০,০০০)। দরপত্র আহ্বানের পর মেসার্স হক ট্রেডার্স নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ বুঝিয়ে দেওয়া হয়। চুক্তি অনুযায়ী এ বছরের আগস্ট মাসের মধ্যে তাদের কাজ শেষ করার কথা ছিল। কিন্তু তারা সঠিক সময়ে কাজ শুরু করেনি। এদিকে গত ২০ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী ওই এলাকায় সফরে আসার কথা জানান। তখনই শুরু হয় এলজিইডির তোড়জোড়। কাঁচা রাস্তায় তড়িঘড়ি করে ইট বসিয়ে সাময়িক মেরামতের নামে খরচ করা হয় প্রায় ১০ লাখ টাকা।
গত ২০ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাগবাড়ী শহীদ জিয়া ডিগ্রি কলেজ মাঠে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন। এরপর চৌকিরদহ খাল খননকাজের উদ্বোধন শেষে তিনি নিজের পৈতৃক ভিটা জিয়াবাড়ি পরিদর্শন করেন। প্রধানমন্ত্রীর গাড়ি যেন নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারে, সে জন্যই মূলত এলজিইডি এই ৫০০ মিটার কাঁচা রাস্তায় রাতারাতি ইট বিছানোর কাজ করে। এই বিশেষ কাজের দায়িত্ব পান শাজাহানপুর উপজেলার মাদলা ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি আতিকুর রহমান। তিনি দ্রুত শ্রমিক লাগিয়ে ইট বিছানোর কাজ শেষ করেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর সফর শেষ হওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যেই আতিকুর রহমান তাঁর শ্রমিক দিয়ে রাস্তা থেকে ১০০% ইট তুলে নিয়ে যান।
ইট বিছানোর পর এলাকাবাসী ভেবেছিলেন তাদের দীর্ঘদিনের যাতায়াতের কষ্ট হয়তো এবার দূর হলো। কিন্তু ইট তুলে নেওয়ার পর তাদের সেই আনন্দ দ্রুতই হতাশায় রূপ নেয়। মিনহাজুল ইসলাম নামের এক স্থানীয় বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, প্রধানমন্ত্রী আসছেন শুনে যখন রাস্তায় ইট বসানো হলো, তখন আমরা খুব খুশি হয়েছিলাম। ভেবেছিলাম এবার বর্ষায় অন্তত কাদা মাড়াতে হবে না। কিন্তু নেতারা যাওয়ার পরই তারা ইটগুলো ট্রাকে করে তুলে নিয়ে গেল। এখন বৃষ্টিতে এই রাস্তা দিয়ে হাঁটাই যায় না। লোকদেখানো এই কাজের কারণে আমাদের ভোগান্তি আগের চেয়ে অনেক গুণ বেড়ে গেছে।
পুরো বিষয়টি নিয়ে এলজিইডির কর্মকর্তারা অদ্ভুত এক যুক্তি দাঁড় করিয়েছেন। এলজিইডি বগুড়ার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাসুদুজ্জামান দাবি করেন, তারা সব নিয়মনীতি মেনেই এই কাজ করেছেন। তিনি বলেন, ওই সড়ক স্থায়ীভাবে পাকা করতে ৮৪ লাখ টাকার কাজ আগেই ঠিকাদারকে দেওয়া আছে। তাই সাময়িকভাবে ইট বিছিয়ে আবার তা তুলে নেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, এলজিইডি মূলত ইটভাটা থেকে ইটগুলো ভাড়া নিয়েছিল। নতুন ইট কিনে বসালে খরচ অনেক বেড়ে যেত। অন্যদিকে, মাদলা ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি আতিকুর রহমান বলেন, এলজিইডি তাকে ইট সোলিংয়ের দায়িত্ব দিয়েছিল। তিনি ভাটা থেকে ইট এনে বসিয়েছেন এবং সফর শেষে আবার ভাটায় ফেরত দিয়েছেন। এর বিনিময়ে তিনি শুধু পরিবহন ও শ্রমিক খরচ পেয়েছেন।
গাবতলী উপজেলা প্রকৌশলী মো. সাজেদুর রহমানও ঠিকাদারের পক্ষ নিয়ে কথা বলেন। তিনি জানান, রাস্তার সীমানা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে জটিলতা থাকায় মূল ঠিকাদারকে সাইট বুঝিয়ে দিতে দেরি হয়েছে। এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর সফরের তারিখ চলে আসায় তারা সাময়িকভাবে ইট বিছানোর সিদ্ধান্ত নেন। তিনি স্বীকার করেন, এই অস্থায়ী কাজের জন্য প্রায় ১০ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। এর মধ্যে গাবতলী উপজেলা পরিষদ ৬ লাখ টাকা দিয়েছে এবং বাকি টাকা এখনো ঠিকাদারকে দেওয়া হয়নি।
তবে সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বিষয়টিকে সরকারি অর্থের চরম অপচয় হিসেবে দেখছেন। সুশাসনের জন্য প্রশাসন (সুপ্র) বগুড়ার সম্পাদক কে জী এম ফারুক বলেন, একটি রাস্তা পাকা করার জন্য যখন দরপত্র হয়ে গেছে, তখন সেখানে নতুন করে রাষ্ট্রের টাকা খরচ করার কোনো আইনি সুযোগ নেই। শুধু একজন ভিআইপি অতিথির কয়েক ঘণ্টার সফরের জন্য ১০ লাখ টাকা খরচ করে আবার সেই ইট তুলে নেওয়া সাধারণ মানুষের সাথে একধরনের ছলচাতুরী। এই ১০ লাখ টাকার পুরোটাই জলে গেছে। সরকারি কোষাগারের টাকা এভাবে অপচয় করার পর এর স্বচ্ছতা নিয়ে সাধারণ মানুষ প্রশ্ন তুলবেই। প্রশাসনের উচিত দ্রুত মূল ঠিকাদারকে দিয়ে রাস্তাটি স্থায়ীভাবে পাকা করে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমানো।














