মধ্যপ্রাচ্যের চরম উত্তেজনার মাঝে বিশ্ববাসীর জন্য একটি বড় স্বস্তির খবর এসেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান চলমান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও বৃদ্ধি করতে এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করতে একটি প্রাথমিক মতৈক্যে পৌঁছেছে। নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো জানিয়েছে, নতুন এই চুক্তিটি সফলভাবে স্বাক্ষরিত হলে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ এক ধাক্কায় আরও ৬০ দিন বেড়ে যাবে। তবে এত বড় সুখবরের পরও কিছুটা শঙ্কা রয়ে গেছে। কারণ, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখনো এই চুক্তিতে নিজের চূড়ান্ত অনুমোদন বা স্বাক্ষর দেননি। অন্যদিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমও জানিয়েছে যে চুক্তির খসড়া এখনো পুরোপুরি চূড়ান্ত হয়নি।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি দুই দেশের মধ্যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এটিকে শান্তির পথে সবচেয়ে বড় ও কার্যকর পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন রাজনীতি বিশ্লেষকেরা। এপ্রিল মাসের শুরুতে প্রথম যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। এখন নতুন করে ৬০ দিনের সময় পেলে দুই দেশের আলোচকেরা একটি টেবিলে বসে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির মতো জটিল ও দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো সমাধানের দারুণ সুযোগ পাবেন। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি দিয়ে আগের মতোই নির্বিঘ্নে জাহাজ চলতে পারবে। এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর ওপর থেকে তাদের কঠোর অবরোধ তুলে নেবে। পাশাপাশি ইরানের তেল বিক্রির ওপর থাকা বেশ কিছু অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাও প্রত্যাহার করবে ওয়াশিংটন।
এই চুক্তির খবরটি বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলোর অর্থনীতির জন্য খুবই ইতিবাচক। কারণ, পুরো বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় ২০% এই হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এই পথটি বন্ধ থাকায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম হু হু করে বাড়ছিল। কিন্তু প্রণালিটি আবার খুলে যাওয়ার সম্ভাবনার খবর ছড়াতেই বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি কয়েক ডলার ($) কমে গেছে। তেলের দাম কমলে বিশ্বজুড়ে পরিবহন খরচ কমবে, যা আমাদের দেশেও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম কমাতে সাহায্য করবে।
চুক্তির বিষয়ে দুই পক্ষের নেতাদের মধ্যে এখনো কিছুটা লুকোচুরি চলছে। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স ওয়াশিংটনে সাংবাদিকদের সামনে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন। তিনি বেশ আশাবাদী সুরে বলেন, তারা এখনো চুক্তির একেবারে চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেননি, তবে তারা সফলতার খুব কাছাকাছি আছেন। তিনি জানান, পরিস্থিতি ভালো হলেও তিনি এখনই চুক্তির বিষয়ে ১০০% নিশ্চয়তা দিতে পারছেন না। অন্যদিকে, ইরানের আলোচক দলের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ একটি সূত্রের বরাত দিয়ে দেশটির বার্তা সংস্থা তাসনিম নিউজ জানিয়েছে, চুক্তির খসড়া এখনো কাগজপত্রে চূড়ান্ত করা হয়নি। এর আগে ট্রাম্প প্রশাসন বেশ কয়েকবার চুক্তি প্রায় চূড়ান্ত বলে দাবি করলেও ইরান প্রতিবারই তা সরাসরি অস্বীকার করেছে।
শান্তি চুক্তির এসব আশাব্যঞ্জক আলোচনার মধ্যেও চলতি সপ্তাহে দুই দেশের মধ্যে বেশ কয়েকটি পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, তাদের সামরিক বাহিনী ইরানের পাঁচটি ড্রোন গুলি করে ভূপাতিত করেছে। এখানেই শেষ নয়, তারা ইরানের বন্দর আব্বাস শহরের একটি ড্রোন নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রেও সরাসরি বিমান হামলা চালিয়েছে। এর ঠিক পরেই কুয়েতের দিকে ধেয়ে আসা একটি ভয়ংকর ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মাঝপথেই ধ্বংস করে দেয় কুয়েতি বাহিনী। উল্লেখ্য, কুয়েতে আমেরিকার একটি বিশাল সামরিক ঘাঁটি রয়েছে, যা মূলত ওই ক্ষেপণাস্ত্রের লক্ষ্যবস্তু ছিল।
অন্যদিকে ইরানও বসে নেই। ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জোর দিয়ে দাবি করেছে যে, তারা বুশেহরের কাছে একটি অত্যাধুনিক মার্কিন সামরিক বিমান গুলি করে নামিয়েছে। তবে এক মার্কিন কর্মকর্তা ইরানের এই দাবিকে পুরোপুরি নাকচ করে দিয়েছেন। তাসনিম বার্তার খবর অনুযায়ী, ইরানের ইসলামি বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী বা আইআরজিসি জানিয়েছে, বন্দর আব্বাসে হামলার কড়া জবাব দিতেই তারা মার্কিন ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে ওই পাল্টা হামলা চালিয়েছে। তারা কড়া ভাষায় হুঁশিয়ারি দিয়েছে, আমেরিকা আবার এমন হামলা করলে তারা ভবিষ্যতে আরও কঠোর জবাব দেবে। ছোটখাটো এসব হামলার ঘটনা স্পষ্ট প্রমাণ করে যে, এই ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতিকে একটি স্থায়ী শান্তিতে রূপ দেওয়া কতটা কঠিন কাজ।
দুই দেশের এই চরম সংকট সমাধানে এখন মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে পাকিস্তান। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইশহাক দার শুক্রবার ওয়াশিংটনে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে একটি বিশেষ বৈঠক করবেন। তবে এই সফরের সুনির্দিষ্ট ফলাফল কী হবে, তা এখনো পরিষ্কার নয়। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে ওমানকে কড়া ভাষায় সতর্ক করেছে। হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর নতুন করে কোনো টোল বা শুল্ক বসানোর বিষয়ে ওমান যেন ইরানের সঙ্গে কোনো আলোচনা না করে, আমেরিকা সেই নির্দেশ দিয়েছে।
ওমানের সঙ্গে আমেরিকার দীর্ঘদিনের গভীর অর্থনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক রয়েছে। তা সত্ত্বেও গত বুধবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ওমানে সরাসরি বোমা হামলার হুমকি দিয়েছেন। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট অবশ্য পরে জানিয়েছেন, ওমানের রাষ্ট্রদূত তাকে নিশ্চিত করেছেন যে, জাহাজের ওপর নতুন কোনো শুল্ক বসানোর পরিকল্পনা তাদের নেই। ওমান সরকার জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক জলসীমায় অবাধে জাহাজ চলাচলের বিষয়ে ইরানের সঙ্গে তাদের শুধু সাধারণ কিছু আলোচনা হয়েছে। তবে মার্কিন কর্মকর্তাদের এমন সরাসরি হুমকির পর ইরান প্রকাশ্যে ওমানের পাশে থাকার ঘোষণা দিয়েছে।














