ঝিনাইদহ শহরে আজ শুক্রবার এক চরম উত্তেজনাকর ও ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। জুমার নামাজের ঠিক পর পরই জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সংগঠক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর হঠাৎ হামলার ঘটনা ঘটে। এই হামলার পরপরই ঝিনাইদহ জেলা ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা শহরের রাস্তায় বিশাল বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। তাঁরা উল্টো নাসীরুদ্দীনের বিরুদ্ধে অস্ত্র প্রদর্শন এবং মব বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির গুরুতর অভিযোগ এনেছেন। অবিলম্বে তাঁকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছে ছাত্রদল। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুরো শহর জুড়ে এখন থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে।
আজ দুপুরে শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত পুরাতন কালেক্টরেট জামে মসজিদে এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার সূত্রপাত হয়। জুমার নামাজ আদায় করতে সেখানে সাধারণ মুসল্লিদের বিপুল ভিড় ছিল। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী নামাজ শেষ করে মসজিদ থেকে ধীরপায়ে বের হচ্ছিলেন। এ সময় তিনি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের আহ্বায়ক সাহেদ আহমেদের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক বিষয়ে কথা বলছিলেন। ঠিক ওই মুহূর্তেই ভিড়ের ভেতর থেকে কে বা কারা হঠাৎ নাসীরুদ্দীনকে লক্ষ্য করে কয়েকটি ডিম ছুড়ে মারে। মুহূর্তের মধ্যেই ওই এলাকার ১০০% শান্ত পরিবেশ চরম উত্তেজনায় রূপ নেয়। সাধারণ মুসল্লিরা ভয়ে এদিক-সেদিক ছোটাছুটি শুরু করেন।
ডিম ছোড়ার পর সেখানে ব্যাপক হট্টগোল ও ধাক্কাধাক্কি শুরু হয়। পরিস্থিতি খারাপ দেখে এনসিপি এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা-কর্মীরা দ্রুত নাসীরুদ্দীনকে চারদিক থেকে মানববর্ম তৈরি করে ঘিরে ধরেন এবং নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু ক্ষুব্ধ লোকজনের উত্তেজনা ততক্ষণে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। দুই পক্ষের সমর্থকেরা একে অপরের দিকে অন্ধের মতো ইট-পাটকেল নিক্ষেপ শুরু করেন। রাস্তায় রীতিমতো লাঠিপেটা এবং পাল্টাপাল্টি স্লোগানের ঘটনা ঘটে। এই অনাকাঙ্ক্ষিত মারামারিতে নাসীরুদ্দীনসহ এনসিপি, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন এবং ছাত্রদলের অন্তত পাঁচজন নেতা-কর্মী বেশ গুরুতর আহত হয়েছেন। আহতদের দ্রুত উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।
এই হামলার বিষয়ে ঝিনাইদহ জেলা এনসিপির যুগ্ম সমন্বয়ক হামিদ পারভেজ গণমাধ্যমের কাছে নিজেদের অবস্থান অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী পূর্বনির্ধারিত একটি শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিতেই ঢাকা থেকে ঝিনাইদহে এসেছিলেন। তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে অভিযোগ করেন, মসজিদ থেকে বের হওয়ার সময় ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা সম্পূর্ণ পূর্বপরিকল্পিতভাবে তাঁদের ওপর এই অতর্কিত হামলা চালান। হামলায় নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ছাড়াও কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্যসচিব তারেক রেজা এবং জেলা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সভাপতি সাইদুর রহমান মারাত্মকভাবে আহত হয়েছেন। চিকিৎসার জন্য আহতদের অনেকেরই তাৎক্ষণিক খরচ হয়ে গেছে। এনসিপির নেতারা জানান, তাঁরা এই হামলার সুষ্ঠু বিচার চেয়ে থানায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দেওয়ার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
অন্যদিকে, এই ঘটনার প্রতিবাদে আজ বিকেলেই ঝিনাইদহ শহরের রাস্তায় নেমে আসেন ছাত্রদলের অসংখ্য নেতা-কর্মী। তাঁরা একটি বড় বিক্ষোভ মিছিল শেষ করে প্রতিবাদ সমাবেশ করেন। সমাবেশে জেলা ছাত্রদলের সভাপতি ইমরান হোসেন সরাসরি নাসীরুদ্দীনের দিকে আঙুল তোলেন। তিনি অত্যন্ত কড়া ভাষায় বলেন, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী মূলত একটি মব তৈরি করে শহরে ইচ্ছাকৃতভাবে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে চান। ইমরান হোসেন আরও অভিযোগ করেন যে, আজ নামাজের পর সংঘর্ষ শুরু হলে নাসীরুদ্দীন নিজের কাছে থাকা একটি অস্ত্র বের করে প্রকাশ্যে মহড়া দিয়েছেন। সাধারণ একটি জমায়েতে প্রকাশ্যে এমন আগ্নেয়াস্ত্র কোথা থেকে এল, তা পুলিশকে দ্রুত খতিয়ে দেখার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে নাসীরুদ্দীনকে অবিলম্বে আইনের আওতায় এনে গ্রেপ্তার করার কড়া দাবি জানান ছাত্রদলের এই নেতা।
রাজনৈতিক দলগুলোর এমন পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের কারণে ঝিনাইদহ শহরের সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। শহরের ব্যস্ত এলাকার দোকানপাট, শপিং মল ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবসায়ীরা আতঙ্কে দ্রুত বন্ধ করে দেন। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা আক্ষেপ করে জানান, এমন রাজনৈতিক সংঘাতের দিনে শহরের প্রায় ৬০% থেকে ৭০% ব্যবসা-বাণিজ্য পুরোপুরি স্থবির হয়ে যায়। রিকশাচালক ও দিনমজুরদের দৈনন্দিন আয়ও এক ধাক্কায় অনেক কমে যায়, যা তাদের পরিবারকে নিদারুণ আর্থিক সংকটে ফেলে। সাধারণ মানুষ বারবার রাজনৈতিক দলগুলোকে সংঘাত পরিহার করে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান বজায় রাখার অনুরোধ জানালেও বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।
বর্তমান উত্তপ্ত পরিস্থিতি নিয়ে ঝিনাইদহ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আসাউজামান গণমাধ্যমকে সর্বশেষ অবস্থা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, মসজিদে ঝামেলার খবর পাওয়ার পরপরই শহরের গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোতে বিপুল সংখ্যক অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। পুলিশের কঠোর তৎপরতায় বর্তমানে শহরের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ শান্ত ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ওসি নিশ্চিত করেন, এনসিপির পক্ষ থেকে থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়া হলে পুলিশ আইন অনুযায়ী নিরপেক্ষ ও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। পাশাপাশি, ছাত্রদল প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শনের যে ভয়ংকর অভিযোগ তুলেছে, পুলিশ সেই বিষয়টিও সমান গুরুত্ব দিয়ে গভীরভাবে তদন্ত করে দেখছে। এদিকে, শহরের এই উত্তেজনাকর পরিস্থিতির কারণে বড় ধরনের সংঘাত এড়াতে এনসিপি তাদের আজকের পূর্বনির্ধারিত আলোচনা সভাটি আনুষ্ঠানিকভাবে স্থগিত ঘোষণা করেছে।
















