জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর ঝিনাইদহে এক অতর্কিত হামলার ঘটনা ঘটেছে। আজ শুক্রবার (২২ মে ২০২৬) দুপুর ২টার দিকে জুমার নামাজ শেষে ঝিনাইদহ পৌর কালেক্টরেট জামে মসজিদ থেকে বের হওয়ার সময় এই ন্যাক্কারজনক হামলা চালানো হয়। নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ও তাঁর দলের অন্যান্য নেতা-কর্মীদের লক্ষ্য করে প্রথমে ডিম ও ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করা হয় এবং পরে হকিস্টিক দিয়ে বেধড়ক পেটানো হয়। এ হামলায় অন্তত ছয়জন নেতা-কর্মী আহত হয়েছেন, যাঁদের মধ্যে তিনজনের মাথা ফেটে গেছে। নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী এবং এনসিপির নেতারা এই হামলার জন্য সরাসরি স্থানীয় ছাত্রদল ও যুবদলের নেতা-কর্মীদের দায়ী করেছেন।
ঘটনার পর আজ বেলা ৩টা ১০ মিনিটে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে একটি পোস্ট দিয়ে হামলার বিস্তারিত তুলে ধরেন। তিনি অভিযোগ করেন, পূর্বনির্ধারিত একটি মতবিনিময় কর্মসূচি অনুযায়ী তিনি ঝিনাইদহে গিয়েছিলেন। জেলা প্রশাসকের বাসভবনের ঠিক বিপরীতে অবস্থিত পৌর কালেক্টরেট জামে মসজিদে জুমার নামাজ আদায় করে বের হওয়ার পরপরই পুলিশের উপস্থিতিতেই তাঁর ওপর এই হামলা চালানো হয়। তিনি ফেসবুক পোস্টে লেখেন, “প্রথমে ডিম, ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করা হয়, এরপর হকিস্টিক দিয়ে অতর্কিতভাবে আঘাত করা হয়। তিনজনের মাথা ফাটিয়ে দেওয়া হয় এবং বেশ কয়েকজন আহত হন। আমাকে এবং এনসিপির যুগ্ম সদস্য তারেক রেজাকে লক্ষ্য করেও কিল-ঘুষি মারা হয়”[।
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী তাঁর ফেসবুক পোস্টে আরও অভিযোগ করেন যে, হামলাকারীরা তাঁদের মুঠোফোন, ক্যামেরা ও মানিব্যাগ ছিনিয়ে নিয়ে গেছে। তিনি আরও জানান যে, হামলার পর তাঁরা ঝিনাইদহ সদর থানায় গিয়ে অবস্থান নিয়েছেন এবং মামলা দায়েরের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তবে তাঁর অভিযোগ, ছাত্রল, যুবদল এবং বিএনপির নেতা-কর্মীরা আবারও থানার সামনে জড়ো হয়ে নতুন করে হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, জুমার নামাজ শেষে মসজিদ থেকে বের হওয়ার সময় নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর সঙ্গে কথা বলতে এগিয়ে আসেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক সাহেদ আহম্মেদ। ঠিক সেই সময়েই পেছনের দিক থেকে একদল যুবক হঠাৎ করে ‘ভুয়া ভুয়া’ স্লোগান দিতে শুরু করে এবং পাটওয়ারীকে লক্ষ্য করে ডিম ও ইট-পাটকেল ছুড়তে থাকে। এতে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং একপর্যায়ে তা পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও হাতাহাতিতে রূপ নেয়।
হামলার এই অভিযোগের বিষয়ে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের আহ্বায়ক সাহেদ আহম্মেদ স্থানীয় গণমাধ্যমকে জানান, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বিভিন্ন জেলায় সফরে গিয়ে বিএনপির সিনিয়র নেতাদের নিয়ে কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য দিচ্ছেন। তিনি ঝিনাইদহে আসায় সাহেদ তাঁর সঙ্গে দেখা করে এই ধরনের বক্তব্য না দেওয়ার অনুরোধ করতে গিয়েছিলেন। সাহেদ দাবি করেন, স্থানীয় বিক্ষুব্ধ জনতাই পাটওয়ারীর ওপর ডিম নিক্ষেপ করেছে এবং এই মারামারি বা হামলার সঙ্গে ছাত্রদলের কোনো সম্পর্ক নেই। এছাড়া, জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছিরও তাঁর ফেসবুক স্ট্যাটাসে দাবি করেছেন যে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী মূলত ‘মব’ বা বিশৃঙ্খলা তৈরি করতেই ঝিনাইদহে গিয়েছিলেন এবং সেখানে সাধারণ জনতাই তাঁকে ডিম ছুড়ে মেরেছে। নাছির উল্টো অভিযোগ করেন যে পাটওয়ারীর সঙ্গে থাকা অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা সাধারণ জনতাকে গুলি করার চেষ্টা করেছিল।
অন্যদিকে, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী এই হামলার পেছনে সরাসরি আইনমন্ত্রী ও ঝিনাইদহ জেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল মজিদের ইন্ধন রয়েছে বলে দাবি করেছেন। তিনি বলেন, আইনমন্ত্রীর লোকেরাই এই হামলা চালিয়েছে। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আইনমন্ত্রীর নিজের এলাকাতেই যদি আইনশৃঙ্খলার এমন চরম অবনতি ঘটে, তবে তাঁর আর মন্ত্রী থাকার কোনো অধিকার নেই। তিনি অবিলম্বে আইনমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেছেন।
এই হামলার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন এনসিপির শীর্ষ নেতারা। এনসিপির নেতা ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক সারজিস আলম তাঁর ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন যে, জুমার নামাজ শেষে ছাত্রদলের সন্ত্রাসীরা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর অতর্কিত হামলা চালিয়েছে এবং এতে বেশ কয়েকজন রক্তাক্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। আরেক নেতা ও সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহও ফেসবুক পোস্টে জানিয়েছেন যে বিএনপির সন্ত্রাসীরাই এই হামলা চালিয়েছে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়েরও এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছেন যে, রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে এমন সহিংসতা ও অপমানজনক আচরণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
ঝিনাইদহ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আসাদউজ্জামান জানিয়েছেন যে, বর্তমান পরিস্থিতি তাঁদের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। তিনি নিশ্চিত করেছেন যে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী থানায় এসেছেন, তবে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক বা লিখিত অভিযোগ জমা দেননি। তবে এনসিপির নেতা-কর্মীদের অভিযোগ, তাঁরা থানায় মামলা জমা দিলেও পুলিশ নানা অজুহাতে মামলা নিচ্ছে না এবং থানার বিদ্যুৎ সংযোগও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। মামলা গ্রহণ না করা পর্যন্ত তাঁরা থানার সামনে অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যাবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন।
এই হামলার প্রতিবাদে আজ শুক্রবার বিকেলে রাজধানীতে এক বিশাল বিক্ষোভ মিছিল করেছে এনসিপির নেতা-কর্মীরা। মিছিলে দলের কেন্দ্রীয় নেতা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াসহ অনেকেই অংশ নেন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ঝিনাইদহ শহরে বর্তমানে চরম থমথমে পরিস্থিতি ও উত্তেজনা বিরাজ করছে।
















