রাজধানীর পল্লবীতে আট বছরের এক ফুটফুটে শিশুকে অত্যন্ত নির্মমভাবে হত্যা করেছে পাষণ্ড প্রতিবেশীরা। এই ভয়ংকর ঘটনাটি শুধু পল্লবী নয়, সারা দেশের বিবেকবান মানুষের হৃদয়কে গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে। সন্তানহারা শোকসন্তপ্ত পরিবারটিকে একটু সান্ত্বনা দিতে বৃহস্পতিবার রাতে তাদের পল্লবীর বাসায় ছুটে যান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। জানা যায়, ওই দিন রাতে মন্ত্রিসভার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক ছিল। সেই দীর্ঘ বৈঠক শেষ করেই তিনি আর কালক্ষেপণ না করে সরাসরি ওই বাড়িতে উপস্থিত হন। দেশের সরকারপ্রধানকে এত কাছে পেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন নিহত শিশুটির অসহায় বাবা-মা। পুরো এলাকার পরিবেশ তখন এক শোকাবহ রূপ ধারণ করে।
প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং থেকে উপস্থিত সাংবাদিকদের এই পরিদর্শনের বিস্তারিত তথ্য জানানো হয়েছে। প্রেস উইং জানায়, প্রধানমন্ত্রী দীর্ঘক্ষণ শিশুটির বাবা, মা এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে কথা বলেন। তিনি তাদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান এবং তাদের বুকে টেনে নেন। প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে পরিবারটিকে আশ্বাস দেন যে, এই জঘন্য অপরাধের সাথে জড়িতদের কোনোভাবেই বিন্দু পরিমাণ ছাড় দেওয়া হবে না। তিনি সাথে থাকা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন যেন এই ঘটনার ১০০% সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত খুব দ্রুত নিশ্চিত করা হয়। অপরাধীরা যাতে কোনো আইনি ফাঁকফোকর দিয়ে বেরিয়ে যেতে না পারে, সরকার ব্যক্তিগতভাবে সেদিকে কড়া নজর রাখবে বলে তিনি পরিবারটিকে কথা দিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রীর এই আবেগঘন সফরে তাঁর সঙ্গে সরকারের বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন, যা প্রমাণ করে সরকার বিষয়টিকে কতটা গুরুত্বের সাথে নিয়েছে। তাঁদের মধ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান এবং যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এছাড়া সেখানে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এ কে এম শামছুল ইসলাম, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব আবু আবদুল্লাহ এম ছালেহ এবং অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা সবাই শোকাহত পরিবারকে সাহস জোগান এবং সব ধরনের সরকারি সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দেন।
এই হৃদয়বিদারক ঘটনাটি ঘটে গত মঙ্গলবার সকালে। নিহত শিশুটি স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণির অত্যন্ত মেধাবী ছাত্রী ছিল। প্রতিদিনের মতো সকালে সে বাসা থেকে বের হয়। কিন্তু পাশের ফ্ল্যাটের ভাড়াটিয়া তাকে কৌশলে ফুসলিয়ে নিজেদের ঘরে নিয়ে যায়। এরপর সেখানে অবুঝ শিশুটিকে চরম নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়। দীর্ঘক্ষণ মেয়েকে না পেয়ে পরিবার হন্যে হয়ে চারদিকে খোঁজাখুঁজি শুরু করে। একপর্যায়ে পুলিশকে খবর দেওয়া হলে তারা এসে পাশের ওই ফ্ল্যাট থেকে শিশুটির খণ্ডিত ও বীভৎস মরদেহ উদ্ধার করে। এমন পৈশাচিক নৃশংসতা দেখে এলাকার সাধারণ মানুষ ও পুলিশের অভিজ্ঞ কর্মকর্তারাও রীতিমতো শিউরে ওঠেন।
এই ভয়ংকর হত্যাকাণ্ডের খবর পাওয়ার পরপরই পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে ওই ফ্ল্যাটের বাসিন্দা মূল ঘাতক সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়। শিশুটির বাবা বাদী হয়ে এই দুজনসহ অজ্ঞাতপরিচয় আরও একজনকে আসামি করে থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় শিশুটিকে ধর্ষণ ও হত্যার মতো অত্যন্ত গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে। পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে গতকাল বুধবার ঢাকার একটি আদালতে হাজির করা হলে সোহেল রানা নিজের সব দোষ স্বীকার করে বিচারকের কাছে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
আমাদের সমাজে নারী ও শিশুদের ওপর এমন সহিংসতা এক বিরাট ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। একটি সাধারণ নিম্নবিত্ত বা মধ্যবিত্ত পরিবারের পক্ষে বছরের পর বছর দীর্ঘ আইনি লড়াই চালানো অনেক সময় অসম্ভব হয়ে পড়ে। উকিল, যাতায়াত ও মামলার খরচ চালাতে গিয়ে অনেক দরিদ্র পরিবারকে লাখ লাখ টাকা ধারদেনা করতে হয়। এতে তারা আর্থিকভাবে পুরোপুরি পথে বসে যান। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী পরিবারটিকে আশ্বস্ত করেছেন যে, এই মামলার সব খরচ রাষ্ট্র বহন করবে। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, এমন চাঞ্চল্যকর ও স্পর্শকাতর মামলার বিচার যদি দ্রুততম সময়ে শেষ করে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া যায়, তবে সমাজে এই ধরনের ঘৃণ্য অপরাধের প্রবণতা অন্তত ৪০% থেকে ৫০% পর্যন্ত কমে আসবে।
বর্তমান সরকার নাগরিকদের সার্বিক নিরাপত্তা বাড়াতে আধুনিক প্রযুক্তির ওপর প্রচুর জোর দিচ্ছে। সাইবার মনিটরিং ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে এবং এলাকাভিত্তিক সিসিটিভি ক্যামেরা বসাতে সরকার প্রতি বছর কয়েক মিলিয়ন ডলার ($) খরচ করছে, যাতে অপরাধীরা অপরাধ করে সহজেই ধরা পড়ে। পল্লবীর সাধারণ মানুষ এখন একজোট হয়ে একটাই দাবি করছেন, তা হলো খুনি সোহেল রানা ও তার স্ত্রীর দ্রুততম সময়ে ফাঁসি। প্রধানমন্ত্রীর এই সরাসরি উপস্থিতি ও কড়া নির্দেশ পুলিশের কাজের গতি আরও কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেবে এবং শিশুটির শোকাহত পরিবার খুব দ্রুতই ন্যায়বিচার পাবে বলে সবাই গভীরভাবে বিশ্বাস করেন।
















