আমাদের দেশ ও সমাজের সবচেয়ে বড় শত্রু এখন মাদক। দেশের তরুণ প্রজন্মের এক বিশাল অংশ মাদকের ভয়াল থাবায় জড়িয়ে নিজেদের সুন্দর ভবিষ্যৎ ধ্বংস করে দিচ্ছে। সমাজকে এই ভয়াবহ অভিশাপ থেকে পুরোপুরি মুক্ত করতে এবং যুবসমাজকে রক্ষা করতে ঝিনাইদহ জেলার শৈলকুপা থানা পুলিশ এক জোরালো ও সাঁড়াশি অভিযান শুরু করেছে। মঙ্গলবার দিনব্যাপী ও রাতভর শৈলকুপা পৌর এলাকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অভিযান চালিয়ে পুলিশ মোট ৬ জন কুখ্যাত মাদক কারবারিকে গ্রেপ্তার করেছে। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে বিপুল পরিমাণ গাঁজা এবং ইয়াবা ট্যাবলেট।
শৈলকুপা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হুমায়ুন কবির মোল্লার সরাসরি ও কঠোর দিকনির্দেশনায় পুলিশের কয়েকটি চৌকস দল এই সফল অভিযানগুলো পরিচালনা করে। প্রথম দফার অভিযানে পুলিশ তিনজনকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তার হওয়া এই তিন মাদক কারবারি হলো ঝাউদিয়া গ্রামের নিরাধ সরকারের ছেলে প্রসেনজিৎ, মালিপাড়া গ্রামের মৃত আমির আলির ছেলে মো. বুলবুল হোসেন এবং বাজারপাড়া এলাকার শ্রী চিত্ত দাসের ছেলে শ্রী বিপুল দাস। পুলিশের দল যখন তাদের গ্রেপ্তার করে, তখন তাদের কাছে বিক্রির উদ্দেশ্যে রাখা মোট ৭৫ গ্রাম গাঁজা পাওয়া যায়।
এরপর পুলিশ দ্বিতীয় দফায় শহরের অন্য একটি এলাকায় অভিযান চালায়। এই অভিযানে পুলিশ আরও তিনজনকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়। এই তিন অভিযুক্ত হলো বাজারপাড়া এলাকার আফানের ছেলে মো. লাল্টু, শরিফুল ইসলামের ছেলে মো. আব্দুল কাদের ওরফে অভি আলী এবং মো. তোয়াজ উদ্দীন শেখের ছেলে মো. মাসুদ শেখ। আটকের পর তল্লাশি করে তাদের কাছ থেকে মোট ৫০ পিস মরণঘাতী ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করা হয়। এই দুই সফল অভিযানে সরাসরি নেতৃত্ব দেন শৈলকুপা থানার এসআই তরিকুল ইসলাম, এসআই সাইফুল ইসলাম, এএসআই আলামিন এবং এএসআই ফেরদৌসসহ পুলিশের আরও বেশ কয়েকজন সদস্য।
মাদকের এমন বিস্তার আমাদের দেশের অর্থনীতি ও স্বাস্থ্যখাতের জন্য এক বিরাট অশনিসংকেত। বিভিন্ন স্বাস্থ্য ও সামাজিক জরিপ থেকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক তথ্য পাওয়া যায়। দেশে বর্তমানে যারা মাদকাসক্ত, তাদের প্রায় ৭০% থেকে ৮০% হলো তরুণ ও যুবক। একবার এই মাদকের জালে জড়ালে সেখান থেকে সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা একজন মানুষের জন্য খুব কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। যুবসমাজ এই মাদকের পেছনে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকা নষ্ট করছে। অর্থনীতিবিদদের একটি গবেষণা অনুযায়ী, অবৈধ মাদকের পেছনে প্রতি বছর দেশে প্রায় ১০০ মিলিয়ন ডলার ($) বা হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ অর্থ কালোবাজারে লেনদেন হয়, যা দেশের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিচ্ছে।
বিশেষ করে ইয়াবার মতো একটি ছোট্ট ট্যাবলেট মানুষের স্নায়ুতন্ত্রকে পুরোপুরি অকেজো করে দেয়। চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা বারবার সতর্ক করে বলছেন, যারা নিয়মিত ইয়াবা সেবন করেন, তাদের মধ্যে অন্তত ৫০% মানুষ একসময় তাদের মানসিক ভারসাম্য পুরোপুরি হারিয়ে ফেলেন। এর পাশাপাশি হার্ট অ্যাটাক, কিডনি নষ্ট হওয়া থেকে শুরু করে আত্মহত্যার প্রবণতাও মাদকাসক্তদের মধ্যে বহুগুণ বেড়ে যায়। তাই মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার এখনই সবচেয়ে উপযুক্ত সময়।
শৈলকুপার সাধারণ মানুষ পুলিশের এই জোরালো ভূমিকায় অনেক বেশি খুশি এবং তারা পুলিশকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানান, গত কয়েক মাসে এলাকায় মাদকের আনাগোনা বেশ বেড়ে যাওয়ায় তারা নিজেদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় ছিলেন। অনেক উঠতি বয়সী কিশোর স্কুল-কলেজ ফাঁকি দিয়ে এসব মাদক কারবারিদের পাতা ফাঁদে পা দিচ্ছিল। সমাজের এই অবক্ষয় রোধে শুধু পুলিশের দিকে তাকিয়ে থাকলে চলবে না বলে মনে করেন সচেতন নাগরিকরা। প্রতিটি পরিবারকে তাদের সন্তানদের প্রতি অন্তত ১০০% খেয়াল রাখতে হবে। সন্তান কার সাথে মিশছে, দিনের বেলা কোথায় যাচ্ছে, সেদিকে বাবা-মায়ের কড়া নজর রাখা অত্যন্ত জরুরি।
শৈলকুপা থানা পুলিশ নিশ্চিত করেছে যে, গ্রেপ্তার হওয়া এই ছয়জন মাদক কারবারির বিরুদ্ধে প্রচলিত মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে পৃথক দুটি মামলা দায়েরের কাজ ইতিমধ্যেই প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। খুব দ্রুতই তাদের আদালতে হাজির করে রিমান্ডের আবেদন করা হবে। পুলিশ আশা করছে, রিমান্ডে এনে ব্যাপকভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করলে হয়তো তাদের পেছনে থাকা বড় হোতা বা গডফাদারদের নাম বেরিয়ে আসবে। ওসি হুমায়ুন কবির মোল্লা অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় গণমাধ্যমকে জানিয়ে দিয়েছেন, মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশের অবস্থান জিরো টলারেন্স বা সম্পূর্ণ শূন্য সহনশীলতার। সমাজকে সম্পূর্ণ মাদকমুক্ত করতে পুলিশ দিনরাত নিরলসভাবে কাজ করে যাবে।
















