টাঙ্গাইলের বাসাইলে কৃষক আনছার আলী হত্যার বিচার দাবি: আসামির ফাঁসি চেয়ে উত্তাল রাজপথ

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

শনিবার দুপুরের কথা। টাঙ্গাইলের বাসাইল বাসস্ট্যান্ড চত্বর হঠাৎ সাধারণ মানুষের স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে। রোদের তীব্রতা উপেক্ষা করে সাধারণ কৃষক থেকে শুরু করে নারী, শিশু ও বৃদ্ধরা রাস্তায় নেমে আসেন। তাদের সবার মুখে একটাই কথা, একটাই দাবি কৃষক আনছার আলী হত্যা মামলার প্রধান আসামি লাবু মিয়া ওরফে লেবু মেলেটারীর ফাঁসি চাই। নিহতের নিজ গ্রাম কলিয়ার শত শত মানুষ এই বিশাল বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধনে যোগ দেন। তারা প্রথমে কলিয়া বটতলা এলাকা থেকে একজোট হয়ে প্রায় ৩ থেকে ৪ কিলোমিটার পথ হেঁটে বাসাইল জিরো পয়েন্টে এসে জড়ো হন। মানুষের চোখেমুখে ছিল ক্ষোভ, হতাশা আর স্বজন হারানোর তীব্র কষ্ট।

ঘটনার সূত্রপাত চলতি বছরের ১ ফেব্রুয়ারি সকালে। গ্রামের সাধারণ আর দশটা ঘটনার মতোই কৃষি জমির আইল বা সীমানা কাটাকে কেন্দ্র করে কৃষক আনছার আলীর সাথে লেবু মেলেটারীর কথা কাটাকাটি হয়। কিন্তু সেই সামান্য তর্ক থেকে লেবু মেলেটারী চরম আক্রোশে আনছার আলীর ওপর প্রাণঘাতী হামলা চালান। মুহূর্তের মধ্যেই রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়েন আনছার আলী এবং সেখানেই প্রাণ হারান এই নিরীহ কৃষক। আমাদের দেশের গ্রামাঞ্চলে ঘটা মোট মারামারির প্রায় ৬০% থেকে ৭০% ঘটে মূলত এই জমির সীমানা বা আইল ঠেলাঠেলি নিয়ে। কিন্তু মাত্র কয়েক ইঞ্চি মাটির জন্য একটি তরতাজা প্রাণ এভাবে কেড়ে নেওয়ার ঘটনা পুরো কলিয়া গ্রামের মানুষকে একেবারে স্তব্ধ করে দেয়।

ADVERTISEMENT
3rd party Ad. Not an offer or recommendation by hardwareanalytic.com.

হত্যার পরপরই লেবু মেলেটারী এলাকা ছেড়ে দ্রুত পালিয়ে যান। টানা প্রায় ১০০ দিনের বেশি সময় তিনি পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে আত্মগোপনে ছিলেন। অবশেষে গত ১০ মে টাঙ্গাইলের র‌্যাব-১৪ এর একটি চৌকস দল গোপন সংবাদের ভিত্তিতে টাঙ্গাইল শহরের একটি বাসা থেকে তাকে পাকড়াও করে। বর্তমানে তিনি টাঙ্গাইল কারাগারে বন্দী জীবন কাটাচ্ছেন। কিন্তু এতেও নিহত আনছার আলীর পরিবারের মনে কোনো শান্তি বা স্বস্তি নেই। কারণ, লেবু মেলেটারী এলাকায় বেশ প্রভাবশালী ও উশৃঙ্খল মানুষ হিসেবে পরিচিত। তার পরিবার প্রচুর অর্থ ও ক্ষমতার জোরে তাকে দ্রুত জামিনে বের করার জন্য জোর চেষ্টা চালাচ্ছে।

আইনি লড়াই চালাতে গিয়ে আনছার আলীর গরিব পরিবারটি এখন চরম বিপাকে পড়েছে। আইনজীবীর খরচ ও আদালতে যাতায়াত মিলিয়ে তারা হয়তো লাখ টাকার বেশি আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বে, যা তাদের মতো সাধারণ পরিবারের জন্য মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা। মানববন্ধনে দাঁড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন নিহত আনছার আলীর স্ত্রী জরিনা বেগম। তিনি বুক চাপড়ে স্বামীর হত্যাকারীর ফাঁসি চান। তার দুই ছেলে জুয়েল মিয়া ও জসিম মিয়াও বাবার খুনিকে সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়ার দাবি জানিয়ে বলেন, তাদের বাবা কারও কোনো ক্ষতি করেননি, তাকে সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে মারা হয়েছে।

ADVERTISEMENT
3rd party Ad. Not an offer or recommendation by hardwareanalytic.com.

সমাবেশে উপস্থিত স্থানীয় সাবেক ইউপি সদস্য আক্কেল আলী বলেন, আনছার আলী অত্যন্ত সহজ-সরল মানুষ ছিলেন। তাকে এভাবে নির্মমভাবে খুন করা পুরো গ্রামের জন্য একটি বড় কলঙ্ক। লেবু মেলেটারীর উশৃঙ্খল আচরণের কথা গ্রামের ১০০% মানুষ জানে। আজ গ্রামের সব মানুষ তার এই নিষ্ঠুর কাজের বিরুদ্ধে একজোট হয়েছেন। মানববন্ধনে আরও কথা বলেন স্থানীয় বাসিন্দা ছালমা আক্তার, আলেয়া বেগম ও মিনহাজ মিয়া। তারা সবাই আদালত ও প্রশাসনের কাছে জোর দাবি জানান, কোনোভাবেই যেন এই খুনিকে আদালত থেকে জামিন দেওয়া না হয়।

প্রভাবশালীরা যদি টাকা ছড়িয়ে আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে পার পেয়ে যায়, তবে সমাজের গরিব মানুষের আর কোনো নিরাপত্তা থাকবে না। তারা লেবু মেলেটারীর দ্রুত বিচার কাজ শেষ করে দৃষ্টান্তমূলক ফাঁসির দাবি তুলে দীর্ঘক্ষণ স্লোগান দিতে থাকেন। বিক্ষোভ ও মানববন্ধন শেষ করে এই উত্তেজিত জনতা সরাসরি মিছিল নিয়ে বাসাইল থানার ভেতরে প্রবেশ করেন। তারা পুলিশের কাছে মামলার বর্তমান অবস্থা ও অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চান।

এ সময় বাসাইল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আলমগীর কবির জনতার মুখোমুখি হয়ে তাদের শান্ত করেন। তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় নিহতের পরিবার ও গ্রামবাসীদের জানান, মূল আসামি ইতিমধ্যে গ্রেফতার হয়েছে এবং পুলিশ খুব গুরুত্ব ও পেশাদারিত্বের সাথে ঘটনার তদন্ত করছে। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই পুলিশ এই হত্যা মামলার পূর্ণাঙ্গ চার্জশিট বা অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেবে বলে তিনি সবাইকে শক্ত আশ্বাস দেন। পুলিশের কথায় জনতা কিছুটা শান্ত হয়ে বাড়ি ফিরে যান।

ADVERTISEMENT
3rd party Ad. Not an offer or recommendation by dailyalo.com.

একটি সামান্য জমির আইল কীভাবে একটি পরিবারকে চিরতরে ধ্বংস করে দিতে পারে, আনছার আলীর মৃত্যু আজ তার সবচেয়ে বড় ও মর্মান্তিক প্রমাণ। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষকে হারিয়ে জরিনা বেগম ও তার সন্তানেরা আজ দিশেহারা। বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে প্রকৃত অপরাধী যদি সঠিক শাস্তি পায়, তবেই সমাজে এমন নির্মম হত্যাকাণ্ড অন্তত ৫০% কমে আসবে বলে মনে করেন স্থানীয় সচেতন মহল। এখন পুরো কলিয়া গ্রামের মানুষ কেবল আদালতের দিকে তাকিয়ে আছেন, কবে তারা তাদের প্রিয় আনছার ভাইয়ের হত্যার ন্যায়বিচার পাবেন।

সম্পর্কিত নিবন্ধ