গ্রামবাংলার আনাচে-কানাচে গড়ে ওঠা অনেক চায়ের দোকান এখন আর শুধু চা চক্র বা সাধারণ আড্ডার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। দিনের বেলা এসব দোকানে সাধারণ মানুষের ভিড় থাকলেও, রাতের অন্ধকার নামলেই কিছু অসাধু মানুষের উপস্থিতিতে এসব জায়গা পরিণত হয় অবৈধ জুয়া ও নেশার আসরে। এমনই এক ভয়ংকর চিত্র দেখা গেছে ঝিনাইদহ জেলার শৈলকুপা উপজেলায়। গ্রামের একটি চায়ের দোকানে গভীর রাতে বসা জমজমাট জুয়ার আসরে এক সাহসী ও ঝটিকা অভিযান চালিয়েছে স্থানীয় থানা-পুলিশ। এই শ্বাসরুদ্ধকর অভিযানে হাতেনাতে ৬ জন জুয়াড়িকে আটক করেছেন পুলিশ সদস্যরা। গত শুক্রবার রাতের এই ঘটনার পর পুরো এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য ও স্বস্তি তৈরি হয়েছে।
পুলিশ ও স্থানীয় মানুষের সাথে কথা বলে জানা যায়, শৈলকুপা উপজেলার সারুটিয়া ইউনিয়নের অন্তর্গত বড় মৌকুড়ী গ্রামে এই ঘটনা ঘটে। ওই গ্রামের গহর নামের এক ব্যক্তির একটি চায়ের দোকান রয়েছে। প্রতিদিন রাত গভীর হওয়ার সাথে সাথে গহরের এই দোকানটি হয়ে উঠত জুয়াড়িদের নিরাপদ আস্তানা। সারা দিন মাঠেঘাটে বা বাজারে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে গ্রামের খেটে খাওয়া মানুষগুলো দিনের শেষে নিজেদের কষ্টের টাকা এই সর্বনাশা তাস খেলায় উড়িয়ে দিতেন। এই অসাধু চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে অত্যন্ত গোপনে গ্রামের সহজ-সরল যুবকদের টাকার লোভ দেখিয়ে এই জুয়ার বোর্ডে টেনে আনছিল।
অর্থনীতিবিদ ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, গ্রামের নিম্ন আয়ের মানুষ তাদের দৈনিক উপার্জনের প্রায় ৩০% থেকে ৪০% অর্থ এমন নেশা বা জুয়ার পেছনে নষ্ট করে ফেলে।
শুক্রবার রাতেও গহরের ওই চায়ের দোকানে যথারীতি জুয়ার আসর বসেছিল। টাকার নেশায় মত্ত হয়ে তাস পেটাচ্ছিলেন এলাকার বেশ কয়েকজন যুবক ও মধ্যবয়সী মানুষ। কিন্তু এলাকার সচেতন কয়েকজন বাসিন্দা এই বেআইনি কাজের বিষয়টি আর মেনে নিতে পারেননি। তারা সরাসরি শৈলকুপা থানা-পুলিশকে গোপনে এই জুয়ার আসরের সুনির্দিষ্ট খবর জানিয়ে দেন। এমন গোপন সংবাদ পাওয়ার পর পুলিশের একটি চৌকস দল একটুও কালক্ষেপণ না করে দ্রুত বড় মৌকুড়ী গ্রামের ওই চায়ের দোকানের দিকে ছুটে যায়। তারা চারপাশ থেকে দোকানটি ঘেরাও করে ফেলেন। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে জুয়াড়িরা দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাদের সেই চেষ্টা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়।
পুলিশ সেখান থেকে হাতেনাতে ৬ জন ব্যক্তিকে আটক করতে সক্ষম হয়। আটককৃতরা সবাই এই বড় মৌকুড়ী গ্রামেরই স্থায়ী বাসিন্দা। এদের মধ্যে রয়েছেন তোহুর শিকদারের ছেলে ৩৬ বছর বয়সী মো. জাহিদ এবং নায়েব আলী শেখের ছেলে ৪৫ বছর বয়সী মো. বাবু। এছাড়া নজরুল ইসলামের দুই ছেলে ২৩ বছরের মো. খবির ও ২৬ বছরের মো. নবীন পুলিশের হাতে ধরা পড়েন। এদের সাথে ছিলেন রহিমের ছেলে ৩০ বছর বয়সী মো. মিলন এবং মো. আনিচের ছেলে ২৯ বছর বয়সী মো. মোশারফ। এদের বয়সের দিকে তাকালে খুব সহজেই বোঝা যায়, গ্রামের সবচেয়ে কর্মক্ষম যুবসমাজ কীভাবে দ্রুত এই ধ্বংসের পথে পা বাড়াচ্ছে।
গ্রামের সাধারণ মানুষ ক্ষোভের সাথে জানান, এই ধরনের জুয়ার আসরের কারণে এলাকায় চুরি, ছিনতাই এবং পারিবারিক কলহ মারাত্মকভাবে বেড়ে যায়। একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, জুয়া ও মাদকের বিস্তারের কারণে গ্রামাঞ্চলে পারিবারিক সহিংসতা প্রায় ৫০% বৃদ্ধি পায়। জুয়ার বোর্ডে হেরে গিয়ে অনেক যুবক খালি হাতে বাড়ি ফেরেন এবং স্ত্রীদের ওপর অমানবিক শারীরিক নির্যাতন চালান। গহরের চায়ের দোকানে এমন আসর বসায় আশপাশের সামাজিক পরিবেশও বেশ নষ্ট হচ্ছিল। পুলিশের এই তাৎক্ষণিক ও সাহসী পদক্ষেপে গ্রামের সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে বয়স্ক ব্যক্তি ও নারীরা বেশ স্বস্তি প্রকাশ করেছেন।
শৈলকুপা থানার পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, সমাজ থেকে অপরাধ দমনে তারা সম্পূর্ণ জিরো টলারেন্স বা শূন্য সহনশীলতা নীতি মেনে চলছেন। আটক এই ৬ জন ব্যক্তির বিরুদ্ধে পুলিশ বাদী হয়ে জুয়া আইনে শৈলকুপা থানায় একটি নিয়মিত মামলা দায়ের করেছে। আইনি প্রক্রিয়া শেষে তাদের আদালতে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছে পুলিশ। প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, এলাকায় কোনো ধরনের অবৈধ জুয়া, মাদক ব্যবসা বা অসামাজিক কার্যকলাপ চলতে দেওয়া হবে না। যেখানেই এমন আসর বসবে, সেখানেই পুলিশ অত্যন্ত কঠোর হাতে তা দমন করবে।
সমাজ থেকে জুয়ার মতো এই ভয়াবহ ব্যাধি দূর করতে শুধু পুলিশের অভিযানের ওপর নির্ভর করলেই চলবে না। সমাজের প্রতিটি সচেতন নাগরিককে এর বিরুদ্ধে জোরালোভাবে সোচ্চার হতে হবে। বিশেষ করে তরুণ সমাজ যেন সহজে রোজগারের আশায় এই মরণফাঁদে পা না দেয়, সেদিকে পরিবারের সদস্যদের কড়া নজর রাখতে হবে। জনপ্রতিনিধি এবং গ্রামের মাতব্বররা যদি পুলিশের সাথে একসাথে কাজ করেন, তবে সমাজ থেকে ১০০% জুয়া ও মাদক নির্মূল করা সম্ভব। শৈলকুপার এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, সাধারণ মানুষ সঠিক তথ্য দিয়ে সাহায্য করলে পুলিশ খুব দ্রুতই সমাজবিরোধীদের আইনের আওতায় আনতে পারে।
















