কোরআন ও হাদিসের আলোকে কোরবানির হুবুম

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

মুসলিম উম্মাহর জীবনে প্রতি বছর যে দুটি সবচেয়ে বড় আনন্দের উৎসব ফিরে আসে, তার মধ্যে অন্যতম হলো ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ। ‘কোরবানি’ শব্দটি আরবি ‘কুরব’ বা ‘কুরবান’ শব্দ থেকে এসেছে। এর আভিধানিক অর্থ হলো নৈকট্য অর্জন করা, ত্যাগ স্বীকার করা বা কাছাকাছি যাওয়া। ইসলামি পরিভাষায়, মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভের আশায় নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট পশু জবেহ করাকেই কোরবানি বলা হয়। কোরবানি শুধু একটি উৎসব নয়, এটি মুসলিমদের জন্য একটি বড় ইবাদত এবং ত্যাগের এক অনন্য মহড়া।

কোরবানির ইতিহাস ঘাঁটলে আমরা দেখতে পাই, এর শেকড় লুকিয়ে আছে মুসলিম জাতির পিতা হযরত ইব্রাহিম (আ.) এবং তাঁর পুত্র হযরত ইসমাইল (আ.)-এর এক অভাবনীয় ত্যাগের ঘটনার মধ্যে। মহান আল্লাহ যখন ইব্রাহিম (আ.)-কে স্বপ্নে তাঁর সবচেয়ে প্রিয় বস্তু কোরবানি করার নির্দেশ দিলেন, তখন তিনি তাঁর প্রাণপ্রিয় পুত্র ইসমাইল (আ.)-কে আল্লাহর রাস্তায় উৎসর্গ করতে একটুও দ্বিধা করেননি। পিতা-পুত্রের এই অতুলনীয় আনুগত্য ও ভালোবাসার পরীক্ষায় আল্লাহ খুশি হয়ে ইসমাইল (আ.)-এর বদলে একটি দুম্বা কোরবানির ব্যবস্থা করে দেন। সেই মহান ত্যাগের স্মৃতিকে ধারণ করেই প্রতি বছর জিলহজ মাসে সারা বিশ্বের সামর্থ্যবান মুসলিমরা কোরবানি করে থাকেন। কিন্তু বর্তমান সময়ে আমরা অনেকেই কোরবানির প্রকৃত বিধান, এর হুকুম এবং এর পেছনের শিক্ষা সম্পর্কে গভীরভাবে জানি না। অনেকেই কোরবানিকে শুধু গোশত খাওয়ার উৎসব বা লোকদেখানোর মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেছেন। তাই বর্তমান বাস্তবতায় কোরআন ও হাদিসের আলোকে কোরবানির হুকুম বা বিধানগুলো সহজভাবে জানা আমাদের জন্য অত্যন্ত জরুরি।

ADVERTISEMENT
3rd party Ad. Not an offer or recommendation by hardwareanalytic.com.

কোরবানির গুরুত্ব ও তাৎপর্য

ইসলামে কোরবানির গুরুত্ব অপরিসীম। এটি শুধু একটি পশুকে জবাই করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি একজন মুমিনের ঈমানি পরীক্ষার একটি বড় মাধ্যম। পবিত্র কোরআন এবং প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর হাদিসে কোরবানির গুরুত্ব সম্পর্কে সুস্পষ্ট বর্ণনা দেওয়া হয়েছে।

কোরআনের আলোকে কোরবানি

পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন সূরায় আল্লাহ তায়ালা কোরবানির নির্দেশ দিয়েছেন এবং এর পেছনের উদ্দেশ্য পরিষ্কার করেছেন। সূরা আল-কাওসারের ২ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা সরাসরি তাঁর রাসুল (সা.)-কে নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, “অতএব আপনার পালনকর্তার উদ্দেশ্যে নামাজ পড়ুন এবং কোরবানি করুন।” এই আয়াত থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, নামাজের মতোই কোরবানি করা মহান আল্লাহর একটি সরাসরি নির্দেশ।

ADVERTISEMENT
3rd party Ad. Not an offer or recommendation by hardwareanalytic.com.

কোরবানির আসল উদ্দেশ্য কী, তা বোঝাতে গিয়ে সূরা আল-হজের ৩৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা এক চমৎকার কথা বলেছেন। তিনি বলেন, “আল্লাহর কাছে কখনোই এগুলোর (কোরবানির পশুর) গোশত এবং রক্ত পৌঁছায় না, বরং তাঁর কাছে পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া (খোদাভীতি ও আন্তরিকতা)।” এই আয়াতের অর্থ অত্যন্ত গভীর। আমরা কত টাকা দিয়ে গরু কিনলাম, কত বড় পশু জবাই করলাম, তা আল্লাহ দেখেন না। আল্লাহ দেখেন আমাদের মনের ভেতরের অবস্থাটা কেমন। আমাদের নিয়ত কি কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টি নাকি সমাজের মানুষকে নিজের বড়ত্ব দেখানো—এটাই হলো কোরবানির আসল বিচার্য বিষয়।

হাদিসের আলোকে কোরবানি

কোরবানির ফজিলত এবং গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে রাসূলে কারিম (সা.) অসংখ্য হাদিস বর্ণনা করেছেন। সাহাবি হযরত যায়েদ ইবনে আরকাম (রা.) একবার রাসূল (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করলেন, “হে আল্লাহর রাসূল! এই কোরবানি আসলে কী?” রাসূল (সা.) উত্তর দিলেন, “এটি তোমাদের পিতা ইব্রাহিম (আ.)-এর সুন্নত।” সাহাবি আবার জানতে চাইলেন, “এতে আমাদের জন্য কী সওয়াব বা পুণ্য রয়েছে?” নবীজি (সা.) বললেন, “কোরবানির পশুর প্রতিটি পশমের বিনিময়ে তোমাদের জন্য একটি করে নেকি বা সওয়াব রয়েছে।” (সুনানে ইবনে মাজাহ)

অন্য একটি হাদিসে উম্মুল মুমিনিন হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) বলেছেন, “কোরবানির দিন রক্ত প্রবাহিত করা (পশু কোরবানি করা)-এর চেয়ে আল্লাহর কাছে বেশি প্রিয় আর কোনো আমল নেই। কেয়ামতের দিন কোরবানির পশু তার শিং, খুর ও লোমসহ উপস্থিত হবে। কোরবানির পশুর রক্ত মাটিতে পড়ার আগেই তা আল্লাহর দরবারে কবুল হয়ে যায়। সুতরাং তোমরা আনন্দচিত্তে কোরবানি করো।” (সুনানে তিরমিজি)

ADVERTISEMENT
3rd party Ad. Not an offer or recommendation by dailyalo.com.

তবে যাদের সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কোরবানি করে না, তাদের জন্য হাদিসে কঠোর হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তির সামর্থ্য আছে অথচ কোরবানি করল না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের ধারেকাছেও না আসে।” (সুনানে ইবনে মাজাহ)। এই হাদিসটি প্রমাণ করে ইসলামে সামর্থ্যবানদের জন্য কোরবানি করা কতটা জরুরি।

শরীয়তের দৃষ্টিকোণে কোরবানির হুকুম বা বিধান

কোরবানি কার ওপর ওয়াজিব (আবশ্যক) এবং এর সময়সীমা কী এসব বিষয়ে ইসলামি শরীয়তে খুব স্পষ্ট ও সহজ বিধান বা হুকুম রয়েছে। সাধারণ মানুষের জন্য এই বিধানগুলো জানা থাকা অত্যন্ত প্রয়োজন, যাতে ইবাদতটি সঠিক নিয়মে আদায় করা যায়।

কোরবানি কার ওপর ওয়াজিব বা ফরজ?

ইসলাম সব মানুষের ওপর কোরবানি চাপিয়ে দেয়নি। কোরবানি শুধুমাত্র সেই ব্যক্তির ওপর ওয়াজিব, যার কোরবানি করার মতো আর্থিক সামর্থ্য রয়েছে। ইসলামি ফিকহ বা আইন অনুযায়ী, জিলহজ মাসের ১০, ১১ ও ১২ তারিখ সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়ের মধ্যে যদি কোনো স্বাধীন, প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ মস্তিষ্কের এবং মুকিম (যিনি মুসাফির বা ভ্রমণরত নন) মুসলিমের কাছে নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকে, তবে তার ওপর কোরবানি করা ওয়াজিব।

ADVERTISEMENT
3rd party Ad. Not an offer or recommendation by dailyalo.com.

এখানে ‘নিসাব পরিমাণ সম্পদ’ বলতে কী বোঝায় তা সহজভাবে বুঝতে হবে। কারও কাছে যদি নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র (যেমন থাকার ঘর, পরার কাপড়, ব্যবহারের আসবাবপত্র ও পেশাগত কাজের সরঞ্জাম) ছাড়া অতিরিক্ত এমন সম্পদ থাকে, যার মূল্য সাড়ে ৫২ তোলা রুপা বা সাড়ে ৭ তোলা স্বর্ণের মূল্যের সমান হয়, তবে ওই ব্যক্তিকে নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক ধরা হয়। এই সম্পদ নগদ টাকা, ব্যাংকে জমানো অর্থ, ব্যবসায়িক পণ্য, অতিরিক্ত জমি বা ফ্ল্যাট যেকোনো রূপেই থাকতে পারে। যদি ঈদের তিন দিন এই পরিমাণ সম্পদ কারও মালিকানায় থাকে, তবে তাকে অবশ্যই কোরবানি করতে হবে।

কোরবানির নির্ধারিত সময়সীমা

কোরবানি করার একটি নির্দিষ্ট সময় রয়েছে। ইচ্ছেমতো যেকোনো দিন পশু জবাই করলেই তা কোরবানি হিসেবে গণ্য হবে না। জিলহজ মাসের ১০ তারিখ পবিত্র ঈদুল আজহার নামাজ পড়ার পর থেকে শুরু করে ১২ই জিলহজ সূর্যাস্ত পর্যন্ত এই তিন দিন কোরবানি করার সময়। তবে এর মধ্যে প্রথম দিন, অর্থাৎ ১০ই জিলহজ কোরবানি করা সবচেয়ে বেশি উত্তম। কোনোভাবেই ঈদের নামাজ পড়ার আগে পশু জবাই করা যাবে না। যদি কেউ ঈদের নামাজের আগে পশু জবাই করে, তবে তা সাধারণ গোশত হিসেবে গণ্য হবে, কোরবানি আদায় হবে না।

কোরবানির পশু ও প্রাসঙ্গিক নিয়মাবলি

কোরবানি করার জন্য পশুর বয়স, ধরন এবং শারীরিক অবস্থার দিকে কড়া নজর রাখতে বলা হয়েছে। যেকোনো পশু দিয়ে কোরবানি করা যায় না।

কোন কোন পশু দিয়ে কোরবানি করা যায়?

ইসলামি শরীয়ত অনুযায়ী মূলত ছয়টি পশু দিয়ে কোরবানি করা যায় উট, গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা। এর বাইরে অন্য কোনো প্রাণী (যেমন- হরিণ বা মুরগি) দিয়ে কোরবানি করলে তা আদায় হবে না। ছাগল, ভেড়া ও দুম্বার ক্ষেত্রে একটি পশু দিয়ে কেবল একজন মানুষই কোরবানি করতে পারবেন। তবে উট, গরু এবং মহিষের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সাতজন ব্যক্তি একসাথে অংশীদার বা শরিকে কোরবানি করতে পারবেন।

পশুর বয়সের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট শর্ত রয়েছে। উট হলে তার বয়স কমপক্ষে পাঁচ বছর হতে হবে। গরু বা মহিষের বয়স কমপক্ষে দুই বছর হতে হবে। আর ছাগল, ভেড়া বা দুম্বার বয়স কমপক্ষে এক বছর হতে হবে। তবে ছয় মাসের ভেড়া বা দুম্বা যদি দেখতে এতই নাদুসনুদুস হয় যে তাকে এক বছরের পশুর মতো মনে হয়, তবে তা দিয়েও কোরবানি করা জায়েজ।

পশুর শারীরিক সুস্থতার শর্ত

কোরবানির পশু হতে হবে নিখুঁত এবং সুন্দর। যে পশুর চোখে দৃষ্টি নেই বা এক চোখ অন্ধ, যে পশু এতটাই খোঁড়া যে জবাই করার জায়গা পর্যন্ত হেঁটে যেতে পারে না, যে পশুর শিং একেবারে গোড়া থেকে ভেঙে গেছে, বা যে পশু অতিমাত্রায় দুর্বল ও হাড্ডিসার এমন পশু দিয়ে কোরবানি করা জায়েজ নয়। কোরবানির পশু কেনার সময় খুব ভালোভাবে দেখে নেওয়া উচিত যেন পশুটি সুস্থ ও সবল হয়। কারণ, আমরা মহান আল্লাহর দরবারে একটি জিনিস উপহার দিচ্ছি, আর উপহার সব সময় সুন্দর এবং নিখুঁত হওয়াই বাঞ্ছনীয়।

গোশত ও চামড়া বণ্টনের সঠিক পদ্ধতি

কোরবানি করার পর এর গোশত ও চামড়া কীভাবে ব্যবহার করা হবে, সে সম্পর্কে ইসলাম একটি অত্যন্ত সুন্দর ও সুষম বন্টন ব্যবস্থা আমাদের শিখিয়ে দিয়েছে, যার মাধ্যমে সমাজের সর্বস্তরে আনন্দ ছড়িয়ে পড়ে।

গোশত বণ্টনের মুস্তাহাব নিয়ম

কোরবানির গোশত বন্টনের ক্ষেত্রে ইসলামি স্কলাররা একটি উত্তম বা মুস্তাহাব নিয়ম বর্ণনা করেছেন। তা হলো—পুরো গোশতকে তিন ভাগে ভাগ করা। এক ভাগ নিজের পরিবারের জন্য রাখা, এক ভাগ আত্মীয়স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশীর জন্য উপহার হিসেবে দেওয়া এবং বাকি এক ভাগ সমাজের গরিব-অসহায় মানুষের মাঝে বিলিয়ে দেওয়া। এই নিয়মে গোশত বন্টন করা ওয়াজিব বা ফরজ নয়, তবে এটি একটি অত্যন্ত সুন্দর সুন্নাহ। এর মাধ্যমে সমাজের সেই সব মানুষও ঈদের দিন ভালো খাবার খাওয়ার সুযোগ পায়, যারা সারা বছর টাকার অভাবে গোশত কিনে খেতে পারে না। তবে পরিবারের সদস্য সংখ্যা যদি বেশি হয়, তবে পুরো গোশত নিজের পরিবারের জন্য রেখে দিলেও কোরবানি আদায় হয়ে যাবে।

কোরবানির চামড়া ও কসাইয়ের মজুরি

কোরবানির পশুর চামড়া কোরবানিদাতা নিজে ব্যবহার করতে পারবেন, যেমন চামড়া দিয়ে মাদুর বা ব্যাগ বানিয়ে ব্যবহার করা। কিন্তু যদি চামড়া বিক্রি করে টাকা পাওয়া যায়, তবে সেই টাকা কোনোভাবেই নিজে ব্যবহার করা যাবে না। চামড়া বিক্রির পুরো টাকা গরিব, এতিম ও দুস্থদের মাঝে দান করে দেওয়া ওয়াজিব। এছাড়া, যে কসাই বা ব্যক্তি পশু জবাই ও গোশত কাটার কাজ করবেন, তাকে তার কাজের পারিশ্রমিক হিসেবে কোরবানির গোশত, চামড়া বা পশুর অন্য কোনো অংশ দেওয়া সম্পূর্ণ হারাম। কসাইকে তার মজুরি আলাদাভাবে নগদ টাকায় পরিশোধ করতে হবে। তবে মজুরি পরিশোধের পর তাকে উপহার হিসেবে গোশত দেওয়া যাবে।

কোরবানির মূল শিক্ষা ও আমাদের বর্তমান বাস্তবতা

কোরবানি শুধু গোশত খাওয়া বা ফ্রিজ ভর্তি করার কোনো উৎসব নয়। কোরবানির মূল শিক্ষা হলো মনের ভেতরের অহংকার, লোভ, কৃপণতা ও হিংসার মতো পাশবিক প্রবৃত্তিগুলোকে জবাই করা। কিন্তু বড় দুঃখের বিষয় হলো, বর্তমানে আমাদের সমাজে কোরবানি একটি সামাজিক স্ট্যাটাস বা মর্যাদা দেখানোর প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়েছে। কে কত লাখ টাকা দিয়ে সবচেয়ে বড় গরু কিনেছে, কার গরুর ছবি ফেসবুকে বেশি ভাইরাল হলো—এসব নিয়েই আমরা মেতে উঠেছি। অনেক সময় অবৈধ পথে উপার্জিত কালো টাকা সাদা করার জন্যও বড় বড় পশু কোরবানি দেওয়া হয়।

আমাদের মনে রাখতে হবে, কোরআনের ঘোষণা অনুযায়ী আল্লাহর কাছে আমাদের পশুর রক্ত বা গোশত কিছুই পৌঁছায় না। আমাদের এই লোকদেখানো কোরবানি কি আল্লাহ কবুল করবেন? কখনোই না। কোরবানি হতে হবে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এবং সম্পূর্ণ হালাল উপার্জনের টাকা দিয়ে। একটি ছোট ছাগলও যদি কেউ সম্পূর্ণ হালাল টাকা দিয়ে খাঁটি নিয়তে কোরবানি করে, তবে আল্লাহর কাছে তা ওই কোটি টাকার লোকদেখানো গরুর চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান।

কোরবানি আমাদের সামাজিক সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ববোধ শেখায়। কোরবানির দিন ধনী-গরিবের ভেদাভেদ ভুলে সবাই মিলেমিশে এক কাতারে এসে দাঁড়ায়। আত্মীয়স্বজন এবং গরিব প্রতিবেশীর বাড়িতে গোশত পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমে পারস্পরিক ভালোবাসা বৃদ্ধি পায়। নিজের কষ্টার্জিত টাকা খরচ করে একটি পশুকে আল্লাহর নামে উৎসর্গ করার মাধ্যমে মানুষের ভেতরে থাকা কৃপণতা দূর হয় এবং ত্যাগের মানসিকতা গড়ে ওঠে।

উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, কোরআন ও হাদিসের আলোকে কোরবানির হুকুম অত্যন্ত স্পষ্ট ও সহজ। এটি মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভের এক অপূর্ব সুযোগ এবং মুসলিম উম্মাহর জন্য একটি পবিত্র ইবাদত। হযরত ইব্রাহিম (আ.) যেমন আল্লাহর নির্দেশে নিজের সবচেয়ে প্রিয় সন্তানকে কোরবানি দিতে প্রস্তুত ছিলেন, কোরবানির পশু জবাই করার সময় আমাদের মনেও ঠিক একই রকম সমর্পণ ও ত্যাগের অনুভূতি থাকতে হবে।

আমাদের আজকের সমাজে যেখানে স্বার্থপরতা, ভোগবিলাস এবং অহংকারের জয়জয়কার, সেখানে কোরবানির প্রকৃত শিক্ষা আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখায়। আমরা যখন ছুরি হাতে পশুর গলায় পোঁচ দিই, তখন যেন আমরা আমাদের মনের ভেতরে লুকিয়ে থাকা পশুত্ব, হিংসা, আর রিয়া বা লোকদেখানোর মানসিকতাকেও চিরতরে জবাই করতে পারি। আসুন, আমরা শুধু প্রথা পালনের জন্য কোরবানি না করে, আল্লাহর সন্তুষ্টি ও তাকওয়া অর্জনের উদ্দেশ্যে কোরবানি করি। আমাদের নিয়ত যদি খাঁটি হয় এবং উপার্জনে যদি কোনো হারাম বা অবৈধ খাদ না থাকে, তবেই আমাদের এই কোরবানি মহান রবের দরবারে কবুল হবে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে কোরবানির প্রকৃত হুকুম ও শিক্ষা বুঝে জীবন পরিচালনার তৌফিক দান করুন। আমিন।


সম্পর্কিত নিবন্ধ