দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশে প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে প্রধান গন্তব্য ছিল ভারতের মুসৌরি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক পালাবদল, কূটনৈতিক টানাপোড়েন এবং ভিসা জটিলতায় ভারতে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে। এর বিকল্প হিসেবে প্রথমবারের মতো উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণে পাঠানো হয়েছে পাকিস্তানে। এই সিদ্ধান্ত দেশের প্রশাসন ও কূটনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
সরকারের নেতৃত্ব ও দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় বর্তমানে ১২ জন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা পাকিস্তানের লাহোরে অবস্থিত সিভিল সার্ভিস একাডেমিতে (সিএসএ) প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। এই প্রশিক্ষণটি গত ৪ মে শুরু হয়েছে এবং তা ২১ মে পর্যন্ত চলবে। সফরে অংশ নেওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে একজন অতিরিক্ত সচিব এবং বাকি ১১ জন যুগ্ম সচিব পদমর্যাদার। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, কর্মকর্তাদের যাতায়াত, থাকা-খাওয়া ও প্রশিক্ষণের সব ব্যয় পাকিস্তান সরকার বহন করছে। এতে বাংলাদেশ সরকারের কোনো আর্থিক সংশ্লেষ নেই। প্রশিক্ষণ শেষে দেশে ফেরার পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে অংশগ্রহণকারী কর্মকর্তাদের প্রতিবেদন জমা দিতে হবে।
এক দশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে ভারত ছিল প্রধান ভরসা। বিশেষ করে উত্তরাখণ্ড প্রদেশের মুসৌরিতে অবস্থিত লাল বাহাদুর শাস্ত্রী রাষ্ট্রীয় প্রশাসন একাডেমিতে নিয়মিতভাবে মধ্যম পর্যায়ের কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণে পাঠানো হতো। ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দিল্লিভিত্তিক ন্যাশনাল সেন্টার ফর গুড গভর্ন্যান্সের (এনসিজিজি) সঙ্গে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একটি সমঝোতা স্মারক সইয়ের মাধ্যমে এই কার্যক্রম শুরু হয়। এরপর ২০১৯ এবং সবশেষ ২০২৪ সালের ৩০ এপ্রিল দুই দেশের মধ্যে এ বিষয়ে চুক্তি নবায়ন করা হয়েছিল।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সূত্র মতে, ভারতে প্রশিক্ষণে গিয়ে কর্মকর্তারা মূলত ভারতের সরকারব্যবস্থা, স্থানীয় সরকারের পরিচালনা এবং রাস্তাঘাট নির্মাণের মতো বিষয়গুলো শিখতেন। এখন পর্যন্ত প্রায় তিন হাজার কর্মকর্তা ভারতে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন বলে একটি সূত্র জানিয়েছে। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ঢাকা ও দিল্লির মধ্যে কূটনৈতিক টানাপোড়েন দেখা দেয়। এরপর থেকে আর কোনো বাংলাদেশি কর্মকর্তাকে ভারতে প্রশিক্ষণে পাঠানো হয়নি।
পাকিস্তান সরকার এর আগেও বিভিন্ন সময় লাহোরের সিভিল সার্ভিস একাডেমিতে বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তাতে সাড়া দেওয়া হয়নি। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে तत्कालीन স্বরাষ্ট্রসচিব (বর্তমানে মন্ত্রিপরিষদ সচিব) নাসিমুল গনি পাকিস্তান সফরে গেলে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। পরবর্তী সময়ে বিএনপি সরকার গঠনের পর পাকিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে আমন্ত্রণপত্র পাঠায়, যার ভিত্তিতেই এই সফর অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
পাকিস্তান সফরে যাওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব সালমা সিদ্দিকা মাহতাব, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ মোস্তফা জামাল হায়দার এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কয়েকজন যুগ্ম সচিবসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ক্যারিয়ার প্ল্যানিং ও প্রশিক্ষণ অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম জানান, পাকিস্তানের আমন্ত্রণে কর্মকর্তাদের সেখানে পাঠানো হয়েছে, তবে এখনো দেশটির সঙ্গে আনুষ্ঠানিক কোনো চুক্তি হয়নি।
জনপ্রশাসন বিশ্লেষকেরা মনে করেন, দক্ষিণ এশিয়ার বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় পাকিস্তানে কর্মকর্তাদের পাঠানোর এই উদ্যোগ একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক বার্তা বহন করে। সরকারি কর্মকর্তাদের একক কোনো দেশে না পাঠিয়ে বিভিন্ন দেশে পাঠানোর পক্ষে মত দিয়েছেন তাঁরা। বিপিএটিসির সাবেক রেক্টর এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার বলেন, প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকা প্রয়োজন এবং প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা বিনিময়ের জন্য ভারত ও পাকিস্তান উভয় দেশেই কর্মকর্তাদের যাওয়া উচিত।
এদিকে, ঢাকা-দিল্লির সম্পর্ক পুনরায় জোড়া লাগার ইঙ্গিত হিসেবে ভারত সম্প্রতি নতুন করে বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের আমন্ত্রণ জানিয়েছে। তবে এবার শর্ত কিছুটা ভিন্ন, যেখানে বাংলাদেশের কর্মকর্তাদের বিশ্বের অন্যান্য দেশের কর্মকর্তাদের সঙ্গে প্রশিক্ষণে অংশ নিতে হবে।
















