কালীগঞ্জে স্কুল শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিজ্ঞানচর্চার আগ্রহ বৃদ্ধি

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

ঝিনাইদহ জেলার একটি ঐতিহ্যবাহী ও বর্ধিষ্ণু উপজেলা হলো কালীগঞ্জ। এখানকার মানুষের জীবনযাত্রা সহজ, সরল এবং অনেকটা ঐতিহ্যনির্ভর। একটা সময় ছিল, যখন এই এলাকার স্কুলগুলোতে পড়াশোনা মানেই ছিল কেবল পাঠ্যবইয়ের পাতা মুখস্থ করা এবং পরীক্ষায় ভালো ফলাফল বা জিপিএ-৫ পাওয়ার এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা। বিজ্ঞান বিষয়টি শিক্ষার্থীদের কাছে ছিল এক ভয়ের নাম। কঠিন সব সূত্র আর সমীকরণ মুখস্থ করতে গিয়ে অনেকেই বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলত। কিন্তু অত্যন্ত আনন্দের বিষয় হলো, কালীগঞ্জের শিক্ষাব্যবস্থায় এখন পরিবর্তনের এক নতুন হাওয়া বইতে শুরু করেছে। এখানকার স্কুলপড়ুয়া ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের মধ্যে বিজ্ঞানচর্চা এবং নতুন কিছু আবিষ্কারের প্রতি এক অভাবনীয় আগ্রহ তৈরি হয়েছে। এই পরিবর্তন আমাদের ভবিষ্যতের জন্য এক বিশাল সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিচ্ছে।

মুখস্থ বিদ্যার বদলে হাতে-কলমে শেখার আনন্দ

আগে বিজ্ঞান শিক্ষা ছিল অনেকটা তাত্ত্বিক বা বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ। ল্যাবরেটরি বা পরীক্ষাগারের অভাব এবং যন্ত্রপাতির অপ্রতুলতার কারণে শিক্ষার্থীরা হাতে-কলমে কিছু শেখার সুযোগ খুব একটা পেত না। কিন্তু এখন পরিস্থিতি পাল্টাতে শুরু করেছে। কালীগঞ্জের শিক্ষার্থীরা এখন আর শুধু বই পড়ে বিজ্ঞান শিখতে রাজি নয়। তারা এখন নিজেদের হাতে ছোট ছোট প্রজেক্ট তৈরি করছে। ব্যাটারি, তার, ছোট মোটর আর এলইডি লাইট দিয়ে তারা নিজের মতো করে বিভিন্ন জিনিস বানাচ্ছে। বইয়ের পাতায় পড়া বিজ্ঞানের নানা সূত্র যখন তারা বাস্তবে কাজ করতে দেখে, তখন তাদের চোখেমুখে যে আনন্দের ঝিলিক দেখা যায়, তা সত্যিই অতুলনীয়। এই হাতে-কলমে শেখার আনন্দই তাদের বিজ্ঞানের প্রতি আরও বেশি কৌতূহলী করে তুলছে।

ADVERTISEMENT
3rd party Ad. Not an offer or recommendation by hardwareanalytic.com.

বিজ্ঞান মেলা ও বিজ্ঞান ক্লাবের প্রসার

শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞানচর্চায় উৎসাহিত করার ক্ষেত্রে কালীগঞ্জে আয়োজিত বিজ্ঞান মেলাগুলো জাদুর মতো কাজ করছে। উপজেলা পর্যায়ে এবং বিভিন্ন স্কুলে এখন নিয়মিত বিজ্ঞান মেলা ও অলিম্পিয়াডের আয়োজন করা হচ্ছে। এসব মেলায় ক্ষুদে বিজ্ঞানীরা তাদের উদ্ভাবিত নানা চমকপ্রদ প্রজেক্ট প্রদর্শন করছে। কেউ বানাচ্ছে পরিবেশবান্ধব স্মার্ট কৃষি মডেল, কেউবা তৈরি করছে সৌরবিদ্যুৎ চালিত গাড়ি বা স্বয়ংক্রিয় সেচ ব্যবস্থা। নিজেদের তৈরি করা প্রজেক্ট যখন তারা সবার সামনে গর্বের সাথে উপস্থাপন করে এবং পুরস্কার জেতে, তখন তাদের আত্মবিশ্বাস বহুগুণ বেড়ে যায়। এছাড়া অনেক স্কুলেই এখন বিজ্ঞান ক্লাব গড়ে উঠেছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা নিয়মিত বিজ্ঞান বিষয়ক আড্ডা ও বিতর্কে অংশ নিচ্ছে।

শিক্ষকদের আন্তরিকতা ও দিকনির্দেশনা

যেকোনো ভালো পরিবর্তনের পেছনে একজন দক্ষ কারিগরের হাত থাকে। কালীগঞ্জের স্কুলগুলোতে বিজ্ঞানচর্চার এই নীরব বিপ্লবের পেছনে এখানকার বিজ্ঞান শিক্ষকদের অবদান সবচেয়ে বেশি। নতুন প্রজন্মের অনেক তরুণ শিক্ষক এখন পেশায় যুক্ত হয়েছেন, যারা গতানুগতিক ধারার বাইরে গিয়ে পড়াতে ভালোবাসেন। তারা শ্রেণিকক্ষে বিজ্ঞানকে খুব সহজ ও আনন্দদায়ক গল্পের মতো করে উপস্থাপন করছেন। কোনো শিক্ষার্থী যদি নতুন কিছু বানাতে গিয়ে ব্যর্থও হয়, শিক্ষকরা তাকে বকা না দিয়ে বরং ভুলগুলো শুধরে দিচ্ছেন এবং নতুন করে চেষ্টা করার সাহস জোগাচ্ছেন। শিক্ষকদের এই আন্তরিকতা ও বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণের কারণেই বিজ্ঞান আজ শিক্ষার্থীদের কাছে আর কোনো আতঙ্কের বিষয় নয়।

ADVERTISEMENT
3rd party Ad. Not an offer or recommendation by hardwareanalytic.com.

ইন্টারনেট ও প্রযুক্তির ইতিবাচক ব্যবহার

ডিজিটাল যুগে এসে স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা কালীগঞ্জের শিক্ষার্থীদের জন্য এক বিশাল আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। আগে কোনো কিছু জানার জন্য শুধু পাঠ্যবই বা শিক্ষকদের ওপর নির্ভর করতে হতো। কিন্তু এখন শিক্ষার্থীরা ইউটিউব বা বিভিন্ন শিক্ষামূলক ওয়েবসাইটের মাধ্যমে ঘরে বসেই বিশ্বের নামিদামি বিজ্ঞানীদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা দেখতে পারছে। ইন্টারনেটের মাধ্যমে তারা সহজেই জেনে নিচ্ছে কীভাবে ফেলে দেওয়া প্লাস্টিকের বোতল বা কার্ডবোর্ড দিয়ে বিজ্ঞানের মজার মজার প্রজেক্ট তৈরি করা যায়। ইন্টারনেটের এই ইতিবাচক ব্যবহারের কারণে গ্রামের একজন সাধারণ শিক্ষার্থীও আজ আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সাথে নিজেকে যুক্ত করতে সক্ষম হচ্ছে।

অভিভাবকদের চিন্তাধারায় পরিবর্তন

একসময় আমাদের সমাজের অনেক অভিভাবক মনে করতেন যে, পড়াশোনা ছাড়া অন্য কোনো কাজে সময় নষ্ট করা মানেই ক্যারিয়ার ধ্বংস হওয়া। তারা সন্তানদের শুধু ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার বানানোর স্বপ্ন দেখতেন এবং সেজন্য বইয়ের পোকা হতে বাধ্য করতেন। তবে কালীগঞ্জের বর্তমান অভিভাবকদের মানসিকতায় অনেক ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। তারা এখন বুঝতে শিখছেন যে, শুধু জিপিএ-৫ পাওয়াই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হতে পারে না। তাই তারা সন্তানদের সৃজনশীলতাকে প্রশ্রয় দিচ্ছেন। সন্তানের আবদার মেটাতে তারা এখন দামি খেলনার বদলে ছোট ছোট সায়েন্স কিট বা বিজ্ঞানের সরঞ্জাম কিনে দিচ্ছেন। পরিবারের এই সমর্থন শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞানচর্চায় আরও বেশি অনুপ্রাণিত করছে।

বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ ও আমাদের করণীয়

কালীগঞ্জে বিজ্ঞানচর্চার এই জাগরণ অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক হলেও, এর পথে এখনো কিছু বাধা রয়ে গেছে। উপজেলার অনেক প্রত্যন্ত গ্রামের স্কুলে এখনো উন্নত মানের বিজ্ঞানাগার বা পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতি নেই। অনেক সময় আর্থিক সংকটের কারণে মেধাবী শিক্ষার্থীরা তাদের উদ্ভাবনী প্রজেক্টের কাজ শেষ করতে পারে না। এই সমস্যাগুলো সমাধানে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, বিত্তবান মানুষ এবং সরকারকে আরও বেশি আন্তরিক হতে হবে। প্রতিটি স্কুলে বিজ্ঞানাগার সমৃদ্ধ করতে হবে। শিক্ষার্থীদের নতুন নতুন আবিষ্কারের জন্য আর্থিক অনুদান বা বৃত্তির ব্যবস্থা করতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, একটুখানি সহযোগিতা পেলেই এই ক্ষুদে বিজ্ঞানীরা হয়তো একদিন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের মুখ উজ্জ্বল করবে।

ADVERTISEMENT
3rd party Ad. Not an offer or recommendation by dailyalo.com.

উপসংহার

কালীগঞ্জে স্কুল শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিজ্ঞানচর্চার এই নতুন আগ্রহ ও উদ্দীপনা নিঃসন্দেহে একটি বিজ্ঞানমনস্ক ও আধুনিক সমাজ গঠনের পূর্বশর্ত। অন্ধবিশ্বাস আর কুসংস্কারের দেয়াল ভেঙে এই শিক্ষার্থীরা যেভাবে যুক্তিনির্ভর এবং বিজ্ঞানভিত্তিক চিন্তাধারায় নিজেদের গড়ে তুলছে, তা আমাদের জন্য অত্যন্ত গর্বের একটি বিষয়। মুখস্থ বিদ্যার শেকল ছিঁড়ে তারা আজ স্বপ্ন দেখছে নতুন কিছু সৃষ্টির। এই স্বপ্নবাজ শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানো আমাদের সবার নৈতিক দায়িত্ব। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, শিক্ষকদের নিরলস চেষ্টা এবং সমাজের সবার উৎসাহ পেলে কালীগঞ্জের এই ক্ষুদে বিজ্ঞানীরাই হয়তো আগামী দিনে বাংলাদেশের প্রযুক্তি ও গবেষণার ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দেবে। বিজ্ঞানচর্চার এই আলো এভাবেই কালীগঞ্জের প্রতিটি ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়ুক এটাই আমাদের একান্ত প্রত্যাশা।



সম্পর্কিত নিবন্ধ