বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের জীবন ও গ্রামীণ অর্থনীতি সরাসরি কৃষির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। তবে সময়ের সাথে সাথে আবহাওয়া ও জলবায়ু অনেক বদলে গেছে। এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সনাতন পদ্ধতিতে চাষাবাদ করে কৃষকদের জন্য ভালো লাভ ঘরে তোলা এখন বেশ কঠিন। কৃষকদের এই আর্থিক ক্ষতি থেকে বাঁচাতে এবং তাদের আধুনিক কৃষির দিকে নিয়ে যেতে বর্তমানে বিভিন্ন সংস্থা মাঠে কাজ করছে। এমনই একটি সময়োপযোগী ও চমৎকার উদ্যোগ হিসেবে ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুরে শিশুনিলয় ফাউন্ডেশন একটি কৃষক মাঠ দিবসের আয়োজন করে। বিশ্বব্যাংক এবং পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) সরাসরি এই আয়োজনে আর্থিক সহায়তা দেয়। রবিবার বিকেলে অনুষ্ঠিত এই আয়োজনে সাধারণ কৃষকরা ফল চাষের নতুন ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির সাথে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পান।
কোটচাঁদপুর উপজেলার বলুহর ইউনিয়নের রামচন্দ্রপুর গ্রামে এই কৃষক মাঠ দিবসের আসর বসে। শিশুনিলয় ফাউন্ডেশন বর্তমানে ওই এলাকায় ‘সাসটেইনেবল মাইক্রোএন্টারপ্রাইজ অ্যান্ড রেজিলিয়েন্ট ট্রান্সফরমেশন’ বা সংক্ষেপে স্মার্ট (SMART) নামের একটি প্রকল্প চালাচ্ছে। এই প্রকল্পের মূল কাজ হলো ছোট ছোট কৃষি উদ্যোক্তাদের পরিবেশবান্ধব উপায়ে বেশি লাভ করার বাস্তবসম্মত কৌশল শেখানো। রবিবারের এই অনুষ্ঠানে মূলত আরইসিপি (RECP) বা সম্পদ সাশ্রয়ী ও পরিচ্ছন্ন উৎপাদন কৌশল ব্যবহার করে কীভাবে মিশ্র ফলের চাষ করা যায়, তার একটি দারুণ প্রদর্শনী কৃষকদের সামনে তুলে ধরেন আয়োজকরা। এই আধুনিক কৌশল ব্যবহার করলে জমির উর্বরতা বাড়ে এবং কৃষকের উৎপাদন খরচ আগের তুলনায় অনেক কমে যায়।
আমাদের দেশের মাটি বিভিন্ন ধরনের দামি ফল চাষের জন্য খুব উপযোগী। এখন অনেক কৃষক ধান বা পাটের মতো প্রচলিত ফসলের বদলে নিজেদের জমিতে ড্রাগন, আঙুর, মাল্টা, পেয়ারা এবং কমলার মতো ফলের বাগান করছেন। একসময় এই দামি ফলগুলো বিদেশ থেকে আমদানি করতে আমাদের দেশকে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার ($) খরচ করতে হতো। কিন্তু এখন আমাদের স্থানীয় কৃষকরাই নিজেদের বাগানে এসব ফল ফলিয়ে দেশের চাহিদা মেটাচ্ছেন। রবিবারের এই মাঠ দিবসে এমন মোট ৫০ জন ফলচাষি ও কৃষি উদ্যোক্তা হাজির ছিলেন। তারা সবাই খুব আগ্রহ নিয়ে আধুনিক ফলের বাগানের যত্ন নেওয়ার নতুন নতুন পদ্ধতিগুলো দেখেন এবং সরাসরি বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে শেখেন।
অনুষ্ঠানে কৃষি দপ্তরের বেশ কয়েকজন অভিজ্ঞ কর্মকর্তা মাঠে উপস্থিত থেকে কৃষকদের হাতে-কলমে শিক্ষা দেন। কোটচাঁদপুর উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিসার টিপু সুলতান এবং উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা আনারুল হক কৃষকদের নানা দিকনির্দেশনা দেন। তাদের সাথে মাঠে আরও উপস্থিত ছিলেন স্মার্ট প্রকল্পের টেকনিক্যাল অফিসার ও কৃষিবিদ শাহিন আলম এবং সহকারী টেকনিক্যাল অফিসার তহিদুল ইসলাম। তারা শুধু প্যান্ডেলে বসে বক্তব্য দেননি, বরং সরাসরি ফলের বাগানে গিয়ে গাছের পাতা ও ডাল ধরে কৃষকদের বিভিন্ন ক্ষতিকর রোগবালাই চিনতে সাহায্য করেন।
বক্তারা অনুষ্ঠানে উত্তম কৃষি চর্চা বা গ্যাপ (GAP) এবং ইকোলজিক্যাল ফার্মিং নিয়ে খুব সহজ ভাষায় কথা বলেন। তারা কৃষকদের বোঝান যে, ফলের বাগানে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও বিষাক্ত কীটনাশক ছিটালে সাময়িক লাভ হলেও মাটির দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি হয় এবং ফলের গুণগত মান কমে যায়। এর বদলে কৃষকরা যদি আইপিএম (IPM) বা সমন্বিত বালাইদমন পদ্ধতি ব্যবহার করেন, তবে তারা বাগানের পরিচর্যা খরচ অন্তত ২০ থেকে ৩০ শতাংশ (%) অনায়াসে বাঁচাতে পারবেন। যেমন, বিষের বদলে সেক্স ফেরোমন ফাঁদ ব্যবহার করে খুব সহজেই ফলের ক্ষতিকর মাছি পোকা দমন করা সম্ভব। পাশাপাশি ড্রাগন গাছে পচন ধরলে বা মাল্টা গাছে ফাঙ্গাস আক্রমণ করলে কীভাবে প্রাকৃতিক উপায়ে তা ঠেকানো যায়, সেই কৌশলগুলোও তারা কৃষকদের শিখিয়ে দেন।
মাঠ দিবসে অংশ নেওয়া কৃষকরা নতুন এই পদ্ধতিগুলো সম্পর্কে জানতে পেরে বেশ উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। তারা জানান, আগে বাগানে সামান্য পোকা দেখলেই তারা বাজার থেকে কড়া দামের বিষ কিনে আনতেন। এতে তাদের অনেক টাকা নষ্ট হতো এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি থাকত। কিন্তু আজকের এই মাঠ দিবস থেকে তারা প্রাকৃতিক সম্পদের টেকসই ব্যবহার এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি সম্পর্কে খুব বাস্তবসম্মত একটি ধারণা পেয়েছেন। এখন থেকে তারা নিজেদের বাগানে রাসায়নিকের ব্যবহার কমিয়ে জৈব সার ও প্রাকৃতিক বালাইনাশকের ওপর বেশি জোর দেবেন বলে মত প্রকাশ করেন।
অনুষ্ঠানের একেবারে শেষ ভাগে কৃষকদের উৎসাহ বাড়াতে একটি সুন্দর পদক্ষেপ নেন আয়োজকরা। প্রশিক্ষণ থেকে পাওয়া জ্ঞান যারা ইতিমধ্যে নিজেদের বাগানে সফলভাবে কাজে লাগিয়েছেন, এমন ছয়জন আদর্শ ফলচাষি উদ্যোক্তাকে বাছাই করে পুরস্কৃত করা হয়। শিশুনিলয় ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে এই ছয়জন উদ্যোক্তার হাতে আরইসিপি বিষয়ক বিভিন্ন আধুনিক কৃষি উপকরণ তুলে দেওয়া হয়। ভালো কাজের স্বীকৃতি হিসেবে পাওয়া এই পুরস্কার এলাকার অন্য কৃষকদেরও আগামীতে পরিবেশবান্ধব উপায়ে মিশ্র ফল চাষে অনেক বেশি উৎসাহিত করবে।
















