ঝিনাইদহ জেলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এবং ব্যস্ত উপজেলা হলো শৈলকুপা। এখানকার বিপুল সংখ্যক সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং এলাকার সার্বিক উন্নয়নের গতি সচল রাখতে উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে মাসিক আইনশৃঙ্খলা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সোমবার (১১ মে) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে উপজেলা পরিষদ অডিটরিয়ামে এই সভার আয়োজন করা হয়। এলাকার শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য প্রতি মাসে আয়োজিত এই নিয়মিত সভাটি স্থানীয় প্রশাসন এবং সাধারণ নাগরিকদের কাছে বেশ তাৎপর্যপূর্ণ।
সভায় সভাপতিত্ব করেন শৈলকুপা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মাহফুজুর রহমান। তিনি সভার শুরুতেই এলাকার বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সবার সামনে বিস্তারিত আলোচনা করেন। ইউএনও তার বক্তব্যে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলেন, প্রশাসন সর্বদা সাধারণ জনগণের পাশে আছে এবং যেকোনো মূল্যে এলাকার পরিবেশ শান্ত রাখতে তারা সচেষ্ট। তবে তিনি মনে করিয়ে দেন, শুধু পুলিশ বা প্রশাসন দিয়ে একা ১০০ ভাগ অপরাধ দমন করা কখনো সম্ভব নয়। এলাকার সাধারণ মানুষ যদি নিজ নিজ জায়গা থেকে সচেতন হন এবং প্রশাসনকে সঠিক তথ্য দিয়ে সাহায্য করেন, তবে এলাকার অপরাধ অন্তত ৮০% কমিয়ে আনা সম্ভব। তিনি সভায় উপস্থিত সব সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তাদের অত্যন্ত সততা, স্বচ্ছতা ও নিষ্ঠার সাথে মানুষের সেবা করার কড়া নির্দেশ দেন।
এবারের সভায় আলোচনা পর্বে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে মাদক এবং অনলাইন জুয়ার ভয়াবহতার বিষয়টি। বর্তমান সময়ে স্মার্টফোনের মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশ মারাত্মকভাবে অনলাইন জুয়ায় আসক্ত হয়ে পড়ছে। সভায় বক্তারা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জানান, এই সর্বনাশা জুয়ার কারণে এলাকার যুবসমাজ দ্রুত ধ্বংসের মুখে পড়ছে। প্রতিদিন হাজার হাজার ডলার ($) বা লাখ লাখ টাকা অবৈধভাবে বিভিন্ন অ্যাপের মাধ্যমে বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। ফলে উপজেলার অনেক মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবার রাতারাতি আর্থিকভাবে নিঃস্ব হয়ে পথে বসছে। এছাড়া মাদকের টাকা জোগাড় করতে গিয়ে এলাকায় ছিঁচকে চুরির মতো অপরাধও বাড়ছে। তাই মাদক কারবারি এবং অনলাইন জুয়াড়িদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সভায় বিশেষ অনুরোধ জানানো হয়।
শৈলকুপা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হুমায়ুন কবির মোল্লা সভায় উপস্থিত থেকে পুলিশের বর্তমান কার্যক্রম এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। তিনি সবাইকে আশ্বস্ত করে বলেন, শৈলকুপায় যেকোনো ধরনের অপরাধ দমনে পুলিশ জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। বিশেষ করে চুরি, ছিনতাই ও মাদকের বিস্তার রোধে রাতের বেলা পুলিশের টহল আগের চেয়ে অন্তত ৫০% বাড়ানো হয়েছে। তিনি এলাকার জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতা ও সাংবাদিকদের কাছে অনুরোধ করেন, তারা যেন অপরাধী বা সন্দেহভাজন কারও বিষয়ে কোনো তথ্য পেলেই সাথে সাথে পুলিশকে খবর দেন। তথ্য প্রদানকারীর পরিচয় সম্পূর্ণ গোপন রাখা হবে বলেও তিনি নিশ্চয়তা দেন।
সভায় শুধু আইনশৃঙ্খলা নয়, উপজেলার বিভিন্ন দপ্তরের উন্নয়নমূলক কাজ এবং জনসেবা নিয়েও বিস্তারিত কথা হয়। সহকারী কমিশনার (ভূমি) দেবাশীষ অধিকারী সাধারণ মানুষের ভূমি সংক্রান্ত জটিল সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধানের আশ্বাস দেন। শৈলকুপা মূলত একটি কৃষিপ্রধান এলাকা, এখানকার অর্থনীতির একটি বড় অংশ কৃষির ওপর নির্ভরশীল। তাই উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আরিফুজ্জামান কৃষকদের জন্য সার ও বীজের সহজ প্রাপ্যতা নিয়ে কথা বলেন। এছাড়া মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার মো. বাকি বিল্লাহ এবং প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার বিশ্বজিৎ বিদ্যালয়গুলোর বর্তমান শিক্ষার মান এবং শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বাড়ানোর বিষয়ে নিজেদের মতামত তুলে ধরেন। উপজেলা সমাজসেবা অফিসার মুজিবুর রহমান ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তাও নিজ নিজ দপ্তরের জনকল্যাণমূলক কাজের অগ্রগতি সভায় উপস্থাপন করেন।
এলাকার শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষায় রাজনৈতিক দলগুলোর সামাজিক ভূমিকা অনেক বড়। সভায় উপস্থিত রাজনৈতিক দলের নেতারা প্রশাসনকে তাদের সব ধরনের সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দেন। উপজেলা বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি রাকিবুল হাসান (দিপু) এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর পৌর সেক্রেটারি মো. মাসুদুর রহমান সভায় বক্তব্য রাখেন। তারা অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বলেন, এলাকার শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষায় তাদের দলের সব স্তরের নেতাকর্মীরা প্রশাসনকে ১০০ ভাগ সহযোগিতা করবে। কোনো অপরাধী বা চাঁদাবাজ রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে কোনোভাবেই পার পাবে না বলে তারা সাফ জানিয়ে দেন।
সব মিলিয়ে প্রায় দুই ঘণ্টার বেশি সময় ধরে চলা এই সভাটি ছিল অত্যন্ত প্রাণবন্ত ও ফলপ্রসূ। সভার একেবারে শেষ পর্যায়ে এসে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উপস্থিত সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, আমরা সবাই মিলে যদি একটি সুন্দর সমন্বয়ের মাধ্যমে একযোগে কাজ করি, তবে খুব দ্রুত শৈলকুপাকে একটি মডেল ও শতভাগ নিরাপদ উপজেলা হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। পরিশেষে, দলমত নির্বিশেষে সবাইকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এলাকার সার্বিক উন্নয়নের জন্য কাজ করার শপথ নেওয়ার মাধ্যমে এই গুরুত্বপূর্ণ সভার সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।
















