রবার্তো বাজ্জো: এক বিষণ্ন নায়কের গল্প, পেনাল্টি মিসের স্মৃতি ও অন্ধকার থেকে ফেরা

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

‘রবার্তো বাজ্জো’ নামটি শুনলেই ফুটবলপ্রেমীদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে নীল জার্সি গায়ে এক বিষণ্ন মুখ। রোজ বোলের দুপুরে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকা এক ট্র্যাজিক হিরো। ১৯৯৪ বিশ্বকাপের সেই ফাইনাল, ব্রাজিলের বিপক্ষে সেই পেনাল্টি মিস ইতালিয়ানদের কাছে যা এক চিরস্থায়ী দুঃস্বপ্ন। তিন দশক পেরিয়ে গেলেও সেই বলটা যেন আজও আকাশে ভাসছে, আর বাজ্জো আজও সেই ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছেন।

দীর্ঘ তিন দশক পর আবারও সেই ক্ষতের ওপর জমে থাকা ধুলো ঝাড়লেন বাজ্জো। সম্প্রতি তাঁর নতুন বই ‘লাইট ইন দ্য ডার্কনেস’-এর প্রকাশনা উপলক্ষে ইতালির সংবাদমাধ্যম ‘কোরেইরে দেল্লা সেরা’কে একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার দিয়েছেন এই কিংবদন্তি। সেখানে উঠে এসেছে সেই অভিশপ্ত পেনাল্টি, চোটের সঙ্গে মরণপণ লড়াই আর তাঁর আধ্যাত্মিক জীবনের গল্প।

সাক্ষাৎকারের শুরুতেই বাজ্জো অবলীলায় স্বীকার করলেন, সেই মুহূর্তটি আজও তাঁর ঘুমের মধ্যে হানা দেয়। বাজ্জো বলেন, ‘পুরো ইতালির মানুষের কাছে নিজেকে অপরাধী মনে করেছিলাম। মনে হয়েছিল কোথাও অদৃশ্য হয়ে যাই। এটা ছিল ভীষণ লজ্জার, এমন এক ঘটনা যা সারা জীবনের জন্য স্থায়ী হয়ে গেছে।’

বছরের পর বছর পার হলেও সেই বলটা যেন এখনো কোথাও ঝুলে আছে। বাজ্জোর ভাষায়, ‘কখনো কখনো হুট করে ঘুম ভেঙে যায়, মনে হয় আমি গোল করেছি…তারপর আবার বাস্তবে ফিরে আসি।’ মাঝরাতে ঘুম ভেঙে বাজ্জো হয়তো আজও সেই ক্রসবারটাকেই খুঁজে বেড়ান। এমনকি তিনি এও স্বীকার করেছেন যে, সেই মিসের পর তাঁর মনে হয়েছিল, ‘আমার হাতে যদি একটা ছুরি থাকত, তবে আমি নিজেকে আঘাত করতাম’।

তবে বাজ্জোর ক্যারিয়ার শুধু এক পেনাল্টি মিসের গল্প নয়, এটি এক অবিশ্বাস্য লড়াইয়ের গল্প। যে লড়াইটা ছিল নিজের শরীরের সঙ্গে। ১৯৮৫ সালে ফিওরেন্তিনায় যোগ দেওয়ার পরই তাঁর হাঁটুতে মারাত্মক চোট লাগে। চিকিৎসকেরা বলেছিলেন তিনি হয়তো আর কখনো ফুটবল খেলতে পারবেন না। পরিবারের পুরোনো ফোর্ড গাড়িতে চড়ে ১২ ঘণ্টার সেই যাত্রার কথা মনে করে বাজ্জো বলেন, ‘যাত্রাজুড়ে শুধু একটাই ভয় ছিল আমি কি আর কখনো ফুটবল খেলতে পারব?’

অস্ত্রোপচারের পরের অভিজ্ঞতা ছিল আরও ভয়াবহ। তখনকার চিকিৎসাব্যবস্থা আজকের মতো এত আধুনিক ছিল না। টিবিয়ায় ছিদ্র করে দেওয়া হয়েছিল ২০০টি সেলাই! অস্ত্রোপচারের পর যখন জ্ঞান ফিরল, যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যাচ্ছিলেন এই কিংবদন্তি। বাজ্জো শোনালেন সেই হাহাকারের গল্প, ‘অ্যানেসথেশিয়ার ঘোর কাটতেই যন্ত্রণায় চিৎকার করছিলাম। ব্যথানাশকও নিতে পারছিলাম না। আমি মাকে বলেছিলাম তুমি যদি আমাকে ভালোবাসো, তবে আমাকে মেরে ফেলো।’

কিন্তু সেই যন্ত্রণাই তাঁকে মানুষ হিসেবে ইস্পাত–কঠিন করে তুলেছিল। ইনজুরির কারণে খেলতে না পারায় ক্লাবের বেতনের চেক পর্যন্ত নিতে চাননি তিনি। আত্মমর্যাদাই ছিল তাঁর কাছে বড় ব্যাপার। ফিওরেন্তিনাও তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছিল, চিকিৎসার সব খরচ বহন করেছিল।

এই যে বারবার ভেঙে পড়েও আবার উঠে দাঁড়ানো, এর রসদ বাজ্জো পেয়েছেন তাঁর আধ্যাত্মিক বিশ্বাস থেকে। বৌদ্ধধর্মের দর্শন তাঁকে নতুনভাবে চিনতে শিখিয়েছে। বাজ্জো বিশ্বাস করেন, মানুষের ভেতরেই লুকানো থাকে এক অসীম শক্তি। তিনি বলেন, ‘বৌদ্ধধর্মই ছিল আমার আশ্রয়। সবচেয়ে কঠিন সময়ে এটা আমাকে শক্তি দিয়েছে, আর কখনো হার না মানার সাহস জুগিয়েছে।’

সম্পর্কিত নিবন্ধ