গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার রাউৎকোনা গ্রামে ঘটে গেছে এক হৃদয়বিদারক ও অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর ঘটনা। একটি বহুতল বাড়ির নিচতলার ফ্ল্যাট থেকে এক নারী, তাঁর তিন অবুঝ সন্তান এবং ওই নারীর আপন ভাইয়ের রক্তাক্ত নিথর মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। এই নিষ্ঠুর ও অমানবিক হত্যাকাণ্ডের মূল অভিযুক্ত হিসেবে পুলিশের খাতায় নাম উঠেছে ওই নারীর স্বামী ফোরকান মিয়ার। ৪০ বছর বয়সী ফোরকান এই জঘন্য অপরাধ ঘটিয়ে বর্তমানে পলাতক রয়েছেন। আজ শনিবার সকালে ফোরকান নিজেই মোবাইল ফোনে কল করে নিজের স্বজনদের কাছে এই রোমহর্ষক খুনের কথা সরাসরি স্বীকার করেছেন।
পুলিশ ও স্থানীয় প্রতিবেশীদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, অভিযুক্ত ফোরকান মিয়ার আদি বাড়ি গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার মেরী গোপীনাথপুর গ্রামে। তাঁর বাবার নাম মো. আতিয়ার রহমান। ফোরকান পেশায় একজন প্রাইভেট কার চালক ছিলেন। গত প্রায় পাঁচ বছর ধরে তিনি সপরিবারে কাপাসিয়ার রাউৎকোনা গ্রামের মো. মনির হোসেনের বাড়ির নিচতলায় ভাড়ায় বসবাস করছিলেন। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডে প্রাণ হারিয়েছেন ফোরকানের স্ত্রী শারমিন আক্তার (৩০), তাঁদের তিন মেয়ে—মীম খানম (১৫), উম্মে হাবিবা (৮) ও ছোট্ট শিশু ফারিয়া (২)। সেই সঙ্গে প্রাণ গেছে শারমিনের আপন ভাই রসুল মিয়ার (২২)। রসুল গাজীপুর সদরের একটি কারখানায় চাকরি করতেন। ঘাতক ফোরকান সুকৌশলে নতুন একটি ভালো চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে শ্যালক রসুলকে গতকাল শুক্রবার ওই ভাড়া বাড়িতে ডেকে আনেন এবং রাতের আঁধারে সবাইকে নির্মমভাবে হত্যা করেন।
নিহত শারমিন আক্তারের ফুফু জেসমিন আক্তার ও ইভা আক্তার কান্নায় ভেঙে পড়ে সাংবাদিকদের কাছে ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরেন। ইভা আক্তার জানান, শনিবার সকালে ফোরকান হঠাৎ তাঁর নিজের ভাই মিশকাতকে ফোন করেন। ফোনে তিনি খুব স্বাভাবিক ও ঠান্ডা গলায় বলেন, “আমার সব শেষ হয়ে গেছে। সবাইকে মাইরা ফেলছি। আমারে আর তোরা পাবি না।” এই ভয়ংকর কথা শুনে স্বজনরা প্রচণ্ড আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। তাঁরা পাঁচ-ছয়জন মিলে তড়িঘড়ি করে কাপাসিয়ার ওই ভাড়া বাড়িতে ছুটে যান। সেখানে গিয়ে তাঁরা দেখতে পান, ভবনের কলাপসিবল গেট এবং নিচতলার কক্ষগুলোর দরজা পুরোপুরি খোলা অবস্থায় আছে। ঘরের ভেতরে পা রাখতেই তাঁদের চোখে পড়ে এক বীভৎস দৃশ্য। মেঝে এবং বিছানায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে আপনজনদের পাঁচটি নিথর দেহ। সাথে সাথে তাঁরা জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে ফোন করে পুলিশকে খবর দেন।
এই নির্মম খুনের পেছনের কারণ খুঁজতে গিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার দীর্ঘদিনের পারিবারিক কলহের কথা সামনে চলে এসেছে। স্বজনরা জানান, ফোরকান মিয়া আরেকটি বিয়ে করার জন্য অনেক দিন ধরেই মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন। তিনি তাঁর এই দ্বিতীয় বিয়ের ইচ্ছার কথা স্ত্রীকে পরিষ্কারভাবে জানিয়েছিলেন। কিন্তু স্ত্রী শারমিন কোনোভাবেই স্বামীর এই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারছিলেন না। এ নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে প্রায়ই তুমুল ঝগড়া হতো। মাস ছয়েক আগে ফোরকান তাঁর স্ত্রীকে প্রচণ্ড মারধর করেন। সেই সময় শারমিনের শরীরের বিভিন্ন জায়গা আঘাতের কারণে ফুলে যায়। পরে তাঁকে ঢাকার একটি হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা দেওয়া হয়। কিছুটা সুস্থ হয়ে শারমিন কিছুদিন বাবার বাড়িতে গিয়ে থাকেন। কিন্তু তিন সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে এবং যাওয়ার কোনো জায়গা না থাকায় তিনি আবারও স্বামীর কাছে ফিরে আসেন। তিনি ফোরকানকে বুঝিয়েছিলেন যে, তিনি সন্তানদের নিয়ে একসঙ্গেই থাকতে চান। কিন্তু ফোরকানের মনের ভেতর যে এমন ভয়ংকর খুনের পরিকল্পনা চলছিল, তা কেউ ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি।
তবে এই ঘটনার মোড় কিছুটা ঘুরিয়ে দেয় ঘরের ভেতর থেকে উদ্ধার হওয়া একটি রহস্যময় কাগজ। পুলিশ ফোরকানের ঘর তল্লাশি করে একটি অভিযোগের কপি পেয়েছে, যদিও সেখানে কারও কোনো স্বাক্ষর ছিল না। কাগজটি পড়ে জানা যায়, ফোরকান গত ৩ মে গোপালগঞ্জ সদর থানায় দেওয়ার উদ্দেশ্যে একটি লিখিত অভিযোগ তৈরি করেছিলেন। সেখানে তিনি তাঁর স্ত্রী, শ্বশুরসহ মোট ১১ জনের নাম উল্লেখ করেন। তাঁর অভিযোগ ছিল, শ্বশুর তাঁর স্ত্রীর মাধ্যমে কয়েক দফায় তাঁর কাছ থেকে ১০ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন, আন্তর্জাতিক মুদ্রার হিসাবে যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৮,৫০০$ (ডলার)। শুধু তাই নয়, ফোরকান ওই কাগজে দাবি করেন যে, তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে অন্য এক আত্মীয়ের বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক ছিল। এসবের প্রতিবাদ করায় শ্বশুরবাড়ির লোকজন তাঁকে হাত-পা বেঁধে অমানুষিক নির্যাতন করেছে।
ফোরকানের লেখা এই অভিযোগের সত্যতা নিয়ে শারমিনের পরিবার ১০০% দ্বিমত পোষণ করেছে। শারমিনের চাচা মো. উজ্জ্বল মিয়া বলেন, ফোরকান সম্প্রতি শ্বশুরবাড়িতে একেবারেই যায়নি। তাকে মারধর করার যে গল্প সে কাগজে সাজিয়েছে, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট। নিজেদের দোষ ঢাকতে এবং এমন একটি পরিকল্পিত খুনের ঘটনাকে আইনিভাবে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতেই ফোরকান হয়তো আগে থেকে এই ভুয়া অভিযোগপত্রটি লিখে রেখেছিল। পুলিশও এই অভিযোগপত্রের সত্যতা যাচাইয়ের কাজ শুরু করেছে।
বর্তমানে ঘটনাস্থলে কাপাসিয়া থানা পুলিশের পাশাপাশি পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) এবং পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) একাধিক দক্ষ দল কাজ করছে। গাজীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আসাদুজ্জামান জানান, প্রাথমিকভাবে এটিকে পারিবারিক কলহের জেরেই সংঘটিত হত্যাকাণ্ড বলে মনে হচ্ছে। ঘরের ভেতর ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সব ধরনের আলামত বিশেষজ্ঞ দল অত্যন্ত সতর্কতার সাথে সংগ্রহ করছে। ফোরকান সকালে ফোন করে খুনের দায় স্বীকার করেছেন, সেই তথ্যও পুলিশ গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখছে। পুলিশ এখন ঘটনার মোটিভ সম্পর্কে ১০০% নিশ্চিত হতে সব তথ্য যাচাই-বাছাই করছে এবং পলাতক ফোরকানকে দ্রুত আইনের আওতায় আনতে মোবাইল ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে জোর তল্লাশি চালাচ্ছে।
এক রাতেই একটি পুরো পরিবার এভাবে শেষ হয়ে যাওয়ায় কাপাসিয়া এলাকায় গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। মাত্র দুই বছরের ফুটফুটে শিশু ফারিয়া কিংবা পনেরো বছরের কিশোরী মীমের কী অপরাধ ছিল, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন সাধারণ মানুষ। এলাকাবাসীর একটাই দাবি, দ্রুত ফোরকানকে গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা হোক।
















