ঝিনাইদহ জেলার অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ উপজেলা হলো কালীগঞ্জ। একটা সময় ছিল যখন এই কালীগঞ্জের গ্রামগুলোতে সন্ধ্যা নামলেই চারদিক ঘুটঘুটে অন্ধকারে ঢেকে যেত। মানুষের জীবনযাত্রা যেন সন্ধ্যার পর থমকে দাঁড়াত। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে আজ সেই দৃশ্য পুরোপুরি বদলে গেছে। সরকারের আন্তরিক চেষ্টায় কালীগঞ্জের প্রতিটি গ্রামে গ্রামে এখন পৌঁছে গেছে বিদ্যুৎ। বিদ্যুতের এই আলো শুধু যে গ্রামের রাস্তাঘাট বা ঘরবাড়ি আলোকিত করেছে তা নয়, বরং মানুষের জীবনমানেরও এক অভাবনীয় উন্নতি ঘটিয়েছে। অন্ধকার দূরে ঠেলে আলোর পথে হাঁটা এই গ্রামগুলোর প্রতিটি মানুষের চোখেমুখে আজ স্বস্তির ছাপ। কালীগঞ্জের গ্রামে গ্রামে বিদ্যুতায়নের কারণে কীভাবে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা সহজ ও উন্নত হয়েছে, তা আজ আর কোনো গল্প নয়, বরং এক সুন্দর বাস্তবতা।
সন্ধ্যার পর পাল্টে যাওয়া গ্রামীণ চিত্র
আগে গ্রামে সন্ধ্যা হলেই হারিকেন বা কুপির আলো জ্বলত। কেরোসিন তেলের ধোঁয়ায় মানুষের দম বন্ধ হওয়ার উপক্রম হতো। রাত আটটা বাজতে না বাজতেই পুরো গ্রাম যেন গভীর ঘুমে তলিয়ে যেত। কিন্তু আজ বিদ্যুতের কারণে সন্ধ্যার পর গ্রামের চিত্র একেবারেই পাল্টে গেছে। গ্রামের বাজারগুলোতে এখন আর সন্ধ্যার পর সুনসান নীরবতা থাকে না। রাত ১০টা বা ১১টা পর্যন্ত দোকানপাট খোলা থাকে। চায়ের দোকানে বসে মানুষজন টিভিতে খবর বা নাটক দেখেন। রাস্তার মোড়ে মোড়ে জ্বলছে বৈদ্যুতিক বাতি। এতে করে গ্রামের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিরও অনেক উন্নতি হয়েছে। অন্ধকারে চুরি-ডাকাতির যে ভয় আগে মানুষের মনে কাজ করত, তা এখন অনেকটাই কমে গেছে। মানুষ এখন অনেক রাত পর্যন্ত নিরাপদে চলাফেরা করতে পারেন।
কৃষিকাজে আধুনিকতার ছোঁয়া ও সেচ সুবিধা
কালীগঞ্জ এলাকার মানুষের আয়ের প্রধান উৎস হলো কৃষিকাজ। আগে জমিতে সেচ দেওয়ার জন্য কৃষকদের ডিজেলচালিত শ্যালো মেশিনের ওপর নির্ভর করতে হতো, যা ছিল অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। কিন্তু গ্রামে বিদ্যুৎ আসার পর সেচ ব্যবস্থায় এক যুগান্তকারী পরিবর্তন এসেছে। কৃষকরা এখন বৈদ্যুতিক সেচ পাম্প বা মোটর ব্যবহার করে খুব অল্প খরচে এবং সহজে জমিতে পানি দিতে পারছেন। এতে করে ফসল উৎপাদনের খরচ অনেক কমে এসেছে এবং কৃষকের লাভের পরিমাণ বেড়েছে। শুধু সেচ নয়, ধান মাড়াই করা, ফসল কাটা বা সংরক্ষণের জন্য নানা ধরনের বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির ব্যবহারও কৃষকদের হাড়ভাঙা খাটুনি অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছে।
ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের ব্যাপক প্রসার
বিদ্যুৎ সুবিধা গ্রামে পৌঁছানোর ফলে কালীগঞ্জের অর্থনীতিতে এক নতুন গতির সঞ্চার হয়েছে। গ্রামে গ্রামে গড়ে উঠেছে ছোট ছোট চালের কল, কাঠের মিল, মুরগির খামার এবং নানা ধরনের কুটির শিল্প। আগে যেসব কাজ হাতের সাহায্যে করতে অনেক সময় ও শ্রম লাগত, এখন বৈদ্যুতিক মেশিনের সাহায্যে তা খুব দ্রুত করা যাচ্ছে। অনেক তরুণ বেকার না থেকে নিজ এলাকায় ছোটখাটো ওয়ার্কশপ বা ফটোকপি ও কম্পিউটার কম্পোজের দোকান দিয়ে বসেছেন। নারীরা সেলাই মেশিন চালিয়ে পোশাক তৈরি করছেন। বিদ্যুতের কারণে এই ক্ষুদ্র ব্যবসাগুলোর প্রসার ঘটায় গ্রামের বহু মানুষের নতুন করে কর্মসংস্থান হয়েছে, যা দারিদ্র্য দূর করতে দারুণভাবে সাহায্য করছে।
শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় নতুন গতি
বিদ্যুতায়নের সবচেয়ে বড় এবং ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে গ্রামের শিক্ষার্থীদের ওপর। আমরা যারা একটু বয়স্ক, তারা জানি হারিকেন বা কুপির মিটমিটে আলোতে পড়াশোনা করা কতটা কষ্টের ছিল। চোখের সমস্যা থেকে শুরু করে কেরোসিনের ধোঁয়ায় শ্বাসকষ্ট—সব মিলিয়ে পড়াশোনার পরিবেশ ছিল বেশ প্রতিকূল। কিন্তু এখন গ্রামের ছেলেমেয়েরা উজ্জ্বল এলইডি বাতির আলোতে শান্তিতে পড়াশোনা করতে পারছে। গরমের দিনে মাথার ওপর ঘুরছে বৈদ্যুতিক পাখা। এছাড়া বিদ্যুতের কারণে গ্রামের অনেক বাড়িতে এখন ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট ও ওয়াইফাই সুবিধা পৌঁছে গেছে। ফলে শিক্ষার্থীরা ঘরে বসেই শহরের ভালো শিক্ষকদের অনলাইন ক্লাস করতে পারছে এবং দেশ-বিদেশের নতুন নতুন তথ্য জানতে পারছে।
স্বাস্থ্যসেবা ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় উন্নতি
গ্রামের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতেও বিদ্যুৎ এক বিশাল ভূমিকা পালন করছে। আগে গ্রামের ক্লিনিক বা ফার্মেসিগুলোতে জীবনরক্ষাকারী অনেক ওষুধ বা টিকা সংরক্ষণ করা যেত না, কারণ ফ্রিজ চালানোর মতো বিদ্যুৎ ছিল না। কিন্তু এখন প্রায় প্রতিটি স্থানীয় ফার্মেসি বা উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ফ্রিজ রয়েছে, যেখানে প্রয়োজনীয় ওষুধ ও ইনজেকশন নিরাপদে রাখা যাচ্ছে। এছাড়া যোগাযোগ ব্যবস্থায় এসেছে অভাবনীয় পরিবর্তন। ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক বা ভ্যানগুলো এখন গ্রামের মেঠো পথে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। এগুলো বিদ্যুতের সাহায্যে চার্জ দেওয়া হয়। ফলে খুব কম ভাড়ায় গ্রামের মানুষ এখন এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাতায়াত করতে পারছেন।
নারীদের ক্ষমতায়ন ও দৈনন্দিন জীবনে স্বস্তি
বিদ্যুতায়নের ফলে গ্রামের নারীদের দৈনন্দিন জীবন কতটা সহজ হয়েছে, তা নিজ চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। আগে গ্রামের মা-বোনদের চুলায় রান্না করতে গিয়ে ধোঁয়ায় অনেক কষ্ট সহ্য করতে হতো। এখন অনেক বাড়িতেই রাইস কুকার, ব্লেন্ডার বা বৈদ্যুতিক চুলার ব্যবহার শুরু হয়েছে। সারাদিনের হাড়ভাঙা খাটুনির পর রাতে একটু ফ্যানের বাতাসে শান্তিতে ঘুমাতে পারছেন তারা। এছাড়া অনেক নারী দিনের কাজের শেষে রাতে টিভিতে বিভিন্ন শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান দেখে সচেতন হচ্ছেন। ঘরে বসে অনলাইনে হাতের কাজ বা সেলাই শিখে অনেকেই এখন বাড়তি আয় করছেন। এই স্বস্তি আর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা গ্রামীণ নারীদের আরও আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, কালীগঞ্জের গ্রামে গ্রামে বিদ্যুতের আলো আজ শুধু অন্ধকারই দূর করেনি, বরং মানুষের ভাগ্যের আকাশ থেকে হতাশার মেঘও সরিয়ে দিয়েছে। বিদ্যুৎ আজ আর কোনো বিলাসিতার বস্তু নয়, বরং এটি সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকা ও এগিয়ে যাওয়ার একটি প্রধান হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। গ্রামের যে মানুষটি একসময় সন্ধ্যার পর ঘরে বন্দি থাকতেন, তিনি আজ রাত জেগে নিজের ব্যবসার হিসাব মেলাচ্ছেন। তবে এই উন্নতির ধারাকে ধরে রাখতে হলে আমাদের বিদ্যুৎ ব্যবহারে আরও সাশ্রয়ী ও সচেতন হতে হবে। অপ্রয়োজনে ফ্যান বা বাতি জ্বালিয়ে রাখা থেকে বিরত থাকতে হবে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ থাকবে, গ্রামে যেন লোডশেডিংয়ের মাত্রা সহনশীল পর্যায়ে থাকে এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত হয়। কালীগঞ্জের গ্রামের মানুষের এই আলোকিত হাসি ও স্বস্তি এভাবেই যুগ যুগ ধরে টিকে থাকুক, এটাই আমাদের সবার একান্ত প্রত্যাশা।
















