ঝিনাইদহে পরিবেশ রক্ষায় শিক্ষার্থীদের ব্যতিক্রমী উদ্যোগ

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

বর্তমান বিশ্বে পরিবেশ দূষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তন সবচেয়ে বড় আতঙ্কের নাম। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি, অসময়ে বৃষ্টি, খরা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো সমস্যাগুলো আজ আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই ভয়াবহ পরিস্থিতির প্রভাব থেকে বাংলাদেশও মুক্ত নয়। আমাদের চারপাশের পরিবেশ আজ মানুষের নানা অবিবেচক ও স্বার্থপর কাজের কারণে চরম হুমকির মুখে। তবে এই হতাশার মাঝেও মাঝে মাঝে এমন কিছু আশার আলো দেখতে পাওয়া যায়, যা আমাদের নতুন করে স্বপ্ন দেখায়। এমনই এক দারুণ আশার আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে ঝিনাইদহ জেলার একদল তরুণ শিক্ষার্থী। পরিবেশ রক্ষার মতো কঠিন ও গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজে তারা শুধু বক্তৃতা বা আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং সরাসরি মাঠে নেমে কাজ শুরু করেছে। স্কুল ও কলেজের এই সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যতিক্রমী উদ্যোগগুলো আজ পুরো ঝিনাইদহ জেলায় এক বিশাল সচেতনতার ঢেউ তুলেছে, যা একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমাকে দারুণভাবে মুগ্ধ করেছে।

প্লাস্টিক দূষণ রোধে শিক্ষার্থীদের লড়াই

আমাদের পরিবেশের সবচেয়ে বড় শত্রু হলো প্লাস্টিক ও পলিথিন। রাস্তাঘাট, ড্রেন, বাজার বা খোলা মাঠ—সবখানেই যত্রতত্র পড়ে থাকতে দেখা যায় প্লাস্টিকের বোতল ও চিপসের প্যাকেট। এই পরিস্থিতি বদলাতে ঝিনাইদহের শিক্ষার্থীরা নিজেদের উদ্যোগে পরিচ্ছন্নতা অভিযান শুরু করেছে। ছুটির দিনগুলোতে তারা হাতে গ্লাভস পরে এবং ময়লার বস্তা নিয়ে দলবেঁধে শহরের বিভিন্ন রাস্তায় নেমে পড়ে। স্কুল-কলেজের ক্যাম্পাস থেকে শুরু করে শহরের গুরুত্বপূর্ণ মোড় এবং বাসস্ট্যান্ডের ময়লা তারা নিজ হাতে পরিষ্কার করে। তাদের এই নিঃস্বার্থ কাজ দেখে অনেক মানুষ এখন যত্রতত্র ময়লা ফেলতে লজ্জাবোধ করেন। তরুণদের এই কাজ প্রমাণ করে যে, বড় কোনো পরিবর্তনের জন্য শুধু সদিচ্ছাই যথেষ্ট।

ADVERTISEMENT
3rd party Ad. Not an offer or recommendation by hardwareanalytic.com.

বৃক্ষরোপণ ও সবুজায়নে নতুন চিন্তাধারা

গাছ লাগানো পরিবেশ রক্ষার অন্যতম প্রধান উপায়, এটা আমরা সবাই জানি। কিন্তু শিক্ষার্থীরা শুধু গাছ লাগিয়েই নিজেদের দায়িত্ব শেষ করছে না, তারা এই প্রক্রিয়ায় এনেছে নতুনত্ব। পরিত্যক্ত প্লাস্টিকের বোতল, পুরোনো টায়ার এবং ভাঙা বালতি সংগ্রহ করে তারা সেগুলোকে সুন্দর রঙের ছোঁয়ায় টবে পরিণত করছে। এরপর সেসব টবে ফুল, পাতাবাহার ও ওষুধি গাছ লাগিয়ে শহরের বিভিন্ন দেওয়ালে বা রাস্তার পাশে সাজিয়ে রাখছে। এছাড়া তারা ‘সিড বোম্ব’ বা বীজ বোমা তৈরি করে রাস্তার পাশের ফাঁকা জায়গাগুলোতে ফেলে রাখছে, যা বৃষ্টির পানি পেয়ে আপনাআপনি গাছে পরিণত হচ্ছে। গাছগুলোর নিয়মিত পরিচর্যা ও পানি দেওয়ার দায়িত্বও তারা নিজেরাই পালন করছে।

নবগঙ্গা নদী ও জলাশয় পরিচ্ছন্নতা অভিযান

ঝিনাইদহ শহরের বুক চিরে বয়ে যাওয়া নবগঙ্গা নদী একসময় এই শহরের প্রাণ ছিল। কিন্তু শহরবাসীর ফেলা ময়লা-আবর্জনা এবং অবৈধ দখলের কারণে নদীটি তার স্বাভাবিক জৌলুস হারাতে বসেছিল। এই নদীর প্রাণ ফেরাতে শিক্ষার্থীরা এক অভাবনীয় উদ্যোগ নিয়েছে। তারা দলবদ্ধভাবে নদীর পাড়ে পড়ে থাকা প্লাস্টিক ও অন্যান্য আবর্জনা পরিষ্কার করতে শুরু করেছে। পাশাপাশি নদীপাড়ের মানুষদের বুঝিয়ে বলছে যেন তারা সরাসরি নদীর পানিতে ময়লা না ফেলেন। শুধু নবগঙ্গা নদীই নয়, শহরের আশেপাশের পুকুর ও খালগুলো পরিষ্কার রাখতেও তারা কাজ করছে। শিক্ষার্থীদের এই প্রাণের টান দেখে অনেক স্থানীয় মানুষও এখন তাদের সাথে যুক্ত হচ্ছেন।

ADVERTISEMENT
3rd party Ad. Not an offer or recommendation by hardwareanalytic.com.

সাধারণ মানুষের মাঝে সচেতনতা তৈরি

পরিবেশ রক্ষার কাজটি শুধু কয়েকজনের পক্ষে করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন ব্যাপক জনসচেতনতা। শিক্ষার্থীদের এই দলটি জনসচেতনতা তৈরির কাজটি করছে খুব সহজ ও আনন্দদায়ক উপায়ে। তারা পরিবেশ রক্ষার গুরুত্ব নিয়ে রঙিন দেয়ালিকা তৈরি করছে, যেখানে গাছ কাটার ক্ষতিকর দিক এবং নদী দূষণের ফলাফল ছবি ও কথার মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে। এছাড়া শহরের জনবহুল এলাকায় দাঁড়িয়ে তারা পরিবেশ সচেতনতামূলক ছোট ছোট পথনাটক পরিবেশন করছে। সাধারণ গ্রামের মানুষ থেকে শুরু করে শহরের রিকশাচালক—সবাই তাদের এই নাটকের সাথে নিজেদের মেলাতে পারছেন। পলিথিনের ব্যবহার কমাতে তারা নিজেদের টিফিনের টাকা বাঁচিয়ে কাপড়ের ব্যাগ তৈরি করে সাধারণ ক্রেতাদের মাঝে বিনামূল্যে বিতরণ করছে।

বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় উদ্ভাবনী উদ্যোগ

শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে সহজ করতে শিক্ষার্থীরা আরও একটি দারুণ কাজ করেছে। তারা নিজ উদ্যোগে বাঁশ ও ফেলে দেওয়া জিনিসপত্র দিয়ে ডাস্টবিন তৈরি করে শহরের বিভিন্ন মোড়ে মোড়ে স্থাপন করেছে। এই ডাস্টবিনগুলোতে তারা পচনশীল এবং অপচনশীল বর্জ্য আলাদা করে ফেলার জন্য ভিন্ন ভিন্ন রঙের ব্যবস্থা রেখেছে। সাধারণ মানুষকে তারা বোঝাচ্ছে যে, পচনশীল বর্জ্য দিয়ে খুব সহজেই জৈব সার তৈরি করা সম্ভব এবং অপচনশীল বর্জ্যগুলো রিসাইকেল করা যায়। তাদের এই বিজ্ঞানসম্মত চিন্তাভাবনা সত্যি প্রশংসার দাবিদার।

বয়স্কদের জন্য শিক্ষণীয় দৃষ্টান্ত

আমার মতে, শিক্ষার্থীদের এই উদ্যোগগুলোর সবচেয়ে বড় সফলতা হলো সমাজের বয়স্ক ও সাধারণ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা। বয়সে ছোট হলেও এই ছেলেমেয়েরা তাদের কাজের মাধ্যমে বড়দের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে আমাদের দায়িত্ববোধ কেমন হওয়া উচিত। আগে যে মানুষটি নির্দ্বিধায় রাস্তার পাশে ময়লা ফেলতেন বা বিনা কারণে গাছ কাটতেন, আজ তিনি এই তরুণদের দেখে অন্তত একবার হলেও ভাবছেন। অভিভাবকরা এখন নিজেদের সন্তানদের নিয়ে গর্ববোধ করেন। এটি সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের জন্য একটি বিশাল শিক্ষণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ADVERTISEMENT
3rd party Ad. Not an offer or recommendation by dailyalo.com.

প্রশাসন ও আমাদের করণীয়

শিক্ষার্থীদের এই ছোট ছোট উদ্যোগগুলো নিঃসন্দেহে অসাধারণ, তবে শুধু তাদের একার পক্ষে পুরো জেলার পরিবেশ চিরস্থায়ীভাবে রক্ষা করা সম্ভব নয়। এই উদ্যোগকে আরও বড় পরিসরে ছড়িয়ে দিতে সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় প্রশাসনের সার্বিক সহযোগিতা একান্ত প্রয়োজন। পৌরসভা ও জেলা প্রশাসনের উচিত এই তরুণ স্বেচ্ছাসেবকদের উৎসাহ দিতে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম (যেমন গ্লাভস, মাস্ক, ডাস্টবিন) প্রদান করা এবং তাদের কাজের প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া। সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমাদেরও উচিত শুধু দূর থেকে প্রশংসা না করে, তাদের পাশে দাঁড়ানো এবং নিজেদের পরিবেশ পরিষ্কার রাখার দায়িত্ব নিজ কাঁধে তুলে নেওয়া।

উপসংহার

ঝিনাইদহে পরিবেশ রক্ষায় শিক্ষার্থীদের এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ আমাদের এক নতুন আশার বাণী শোনায়। তারা প্রমাণ করেছে যে, বয়স কম হলেও দেশের প্রতি ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ থাকলে যেকোনো অসাধ্য সাধন করা যায়। পরিবেশ কোনো একক ব্যক্তি বা সরকারের সম্পদ নয়, এটি আমাদের সবার বেঁচে থাকার একমাত্র আশ্রয়। তাই এই পরিবেশ বাঁচানোর লড়াইয়ে আমাদের সবাইকে একজোট হতে হবে। ঝিনাইদহের এই তরুণ শিক্ষার্থীরা আজ যে পথ দেখাচ্ছে, সেই পথে যদি আমরা সবাই একটু একটু করে হাঁটি, তবে আগামী প্রজন্মের জন্য একটি সুন্দর, সবুজ ও দূষণমুক্ত বাংলাদেশ রেখে যাওয়া মোটেও অসম্ভব কিছু নয়। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, এই শিক্ষার্থীদের হাতেই আমাদের দেশের সুন্দর ভবিষ্যৎ অত্যন্ত নিরাপদ।


ADVERTISEMENT
3rd party Ad. Not an offer or recommendation by dailyalo.com.

সম্পর্কিত নিবন্ধ