বর্তমান বিশ্বে পরিবেশ দূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তন একটি মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। আমাদের চারপাশের প্রকৃতি আজ মানুষের নানা অবিবেচক কাজের কারণে হুমকির মুখে। বাংলাদেশের অন্যান্য জেলার মতো ঝিনাইদহতেও এর প্রভাব বেশ স্পষ্ট। অতিরিক্ত গরম, অসময়ে বৃষ্টি বা টানা খরা—এসবই পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ফল। তবে এই কঠিন পরিস্থিতিতে আশার আলো হয়ে দাঁড়িয়েছে ঝিনাইদহের একদল তরুণ শিক্ষার্থী। তারা কেবল পাঠ্যবইয়ের জ্ঞানেই নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখেনি, বরং পরিবেশ রক্ষার মতো কঠিন কাজে সরাসরি মাঠে নেমেছে। প্রশাসন বা বয়স্করা যখন শুধু আলোচনা বা সেমিনারে ব্যস্ত, তখন এই স্কুল-কলেজ পড়ুয়া ছেলেমেয়েরা সম্পূর্ণ নিজেদের উদ্যোগে পরিবেশ রক্ষায় বেশ কিছু ব্যতিক্রমী কাজ শুরু করেছে। তাদের এই ছোট ছোট উদ্যোগ আজ পুরো জেলাজুড়ে এক বিশাল সচেতনতার ঢেউ তুলেছে, যা আমাদের সবার জন্যই এক দারুণ অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।
প্লাস্টিক দূষণ রোধে পরিচ্ছন্নতা অভিযান
প্লাস্টিক বা পলিথিন আমাদের পরিবেশের সবচেয়ে বড় শত্রু। শহরের আনাচে-কানাচে, ড্রেনে বা রাস্তার পাশে যত্রতত্র প্লাস্টিকের বোতল ও চিপসের প্যাকেট পড়ে থাকতে দেখা যায়। এই সমস্যা সমাধানে ঝিনাইদহের শিক্ষার্থীরা শুরু করেছে ‘ক্লিন ক্যাম্পাস’ ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান। ছুটির দিনগুলোতে তারা দলবেঁধে ঝাড়ু, বস্তা আর গ্লাভস হাতে নেমে পড়ে রাস্তায়। শুধু নিজেদের স্কুল বা কলেজ প্রাঙ্গণ নয়, শহরের গুরুত্বপূর্ণ মোড়, বাসস্ট্যান্ড ও বাজারের রাস্তাও তারা পরিষ্কার করছে। মজার বিষয় হলো, তাদের এই কাজ দেখে অনেক সাধারণ পথচারীও লজ্জিত হয়ে রাস্তায় ময়লা ফেলা বন্ধ করছেন। তরুণদের এই নিঃস্বার্থ কাজ মানুষের মনে পরিচ্ছন্নতার প্রতি নতুন করে এক শ্রদ্ধাবোধ তৈরি করছে।
পরিত্যক্ত প্লাস্টিক বোতলে বৃক্ষরোপণ
শিক্ষার্থীদের আরেকটি চমকপ্রদ উদ্যোগ হলো পরিত্যক্ত জিনিসপত্র কাজে লাগিয়ে গাছ লাগানো। তারা রাস্তা বা ডাস্টবিন থেকে কুড়িয়ে পাওয়া প্লাস্টিকের বোতল, পুরোনো টায়ার এবং ভাঙা বালতি সংগ্রহ করে। এরপর সেগুলো সুন্দর করে রং করে তার মধ্যে মাটি দিয়ে বিভিন্ন ধরনের ফুল, পাতাবাহার ও ওষুধি গাছ লাগাচ্ছে। এই গাছগুলো তারা স্কুল-কলেজের বারান্দায়, রাস্তার পাশের দেওয়ালে এবং নিজেদের বাড়ির ছাদে সাজিয়ে রাখছে। এর ফলে একদিকে যেমন প্লাস্টিকের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে পরিবেশ রক্ষা পাচ্ছে, অন্যদিকে শহরের সৌন্দর্যও বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে। এটি রিসাইক্লিং বা পুনর্ব্যবহারের একটি চমৎকার ও বাস্তব উদাহরণ, যা খুব সহজেই যে কেউ অনুসরণ করতে পারে।
জনসচেতনতা তৈরিতে দেয়ালিকা ও পথনাটকের ব্যবহার
মানুষকে সচেতন করা খুব একটা সহজ কাজ নয়। তবে ঝিনাইদহের শিক্ষার্থীরা এই কঠিন কাজটি করছে খুব আনন্দদায়ক উপায়ে। তারা পরিবেশ রক্ষার গুরুত্ব নিয়ে বিভিন্ন দেওয়ালে রঙিন দেয়ালিকা তৈরি করছে, যেখানে গাছ কাটার ক্ষতিকর দিক এবং নদী দূষণের ফলাফল ছবি ও কথার মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে। এছাড়া তারা শহরের বিভিন্ন জনবহুল এলাকায় দাঁড়িয়ে পরিবেশ সচেতনতামূলক পথনাটক পরিবেশন করছে। খুব সাধারণ ও সহজ ভাষায় রচিত এই নাটকগুলো সাধারণ মানুষকে গভীরভাবে নাড়া দিচ্ছে। গ্রামের কৃষক থেকে শুরু করে শহরের রিকশাচালক—সবাই তাদের এই বার্তার সাথে সহজেই নিজেদের যুক্ত করতে পারছেন এবং পরিবেশ নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করেছেন।
পলিথিন বর্জনে কাপড়ের ব্যাগ বিতরণ কর্মসূচি
বাজারে গেলে দেখা যায় পলিথিন ব্যাগের অবাধ ব্যবহার। আইন থাকলেও এর প্রয়োগ খুব একটা দেখা যায় না। এই জায়গাটিতে শিক্ষার্থীরা এক নতুন চিন্তার প্রতিফলন ঘটিয়েছে। তারা নিজেদের জমানো টিফিনের টাকা দিয়ে কাপড় বা পাটের ব্যাগ তৈরি করে সাধারণ মানুষের মাঝে বিনামূল্যে বিতরণ করছে। বাজারে আসা ক্রেতাদের তারা খুব বিনয়ের সাথে বুঝিয়ে বলছে, কেন পলিথিন ব্যবহার করা উচিত নয় এবং কেন কাপড়ের ব্যাগ পরিবেশের জন্য ভালো। অনেক শিক্ষার্থী আবার নিজেদের মা-দাদিদের পুরোনো কাপড় দিয়ে সুন্দর সুন্দর ব্যাগ সেলাই করে দোকানে দোকানে দিয়ে আসছে। তাদের এই মিষ্টি ব্যবহারের কাছে হার মেনে অনেকেই এখন পলিথিন ব্যবহার অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছেন।
নবগঙ্গা নদী ও স্থানীয় জলাশয় পরিচ্ছন্ন রাখা
ঝিনাইদহ শহরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নবগঙ্গা নদী একসময় এই শহরের প্রাণ ছিল। কিন্তু মানুষের ফেলা ময়লা-আবর্জনা আর শহরের বর্জ্যের কারণে নদীটি তার স্বাভাবিক সৌন্দর্য হারাতে বসেছিল। এই নদীর প্রাণ ফেরাতে শিক্ষার্থীরা বেশ কয়েকবার নদী পরিষ্কার করার উদ্যোগ নিয়েছে। তারা নদীর পাড়ে পড়ে থাকা প্লাস্টিক ও অন্যান্য আবর্জনা পরিষ্কার করে এবং নদীপাড়ের মানুষদের সচেতন করে, যেন তারা সরাসরি নদীর পানিতে ময়লা না ফেলেন। শুধু নদী নয়, স্থানীয় পুকুর ও খালগুলো পরিষ্কার রাখতেও তারা কাজ করছে। তাদের এই উদ্যোগে এখন স্থানীয় অনেক সামাজিক সংগঠনও স্বতঃস্ফূর্তভাবে যুক্ত হয়েছে।
বয়স্কদের মাঝে পরিবেশ নিয়ে নতুন চিন্তার বিকাশ
শিক্ষার্থীদের এই উদ্যোগগুলোর সবচেয়ে বড় সফলতা হলো, তারা সমাজের বয়স্ক ও সাধারণ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আনতে পেরেছে। আগে যে মানুষটি নির্দ্বিধায় রাস্তার পাশে ময়লা ফেলতেন বা বিনা কারণে গাছ কেটে ফেলতেন, আজ তিনি এই ছোট ছেলেমেয়েদের কাজ দেখে অন্তত একবার হলেও ভাবছেন। অভিভাবকরা এখন নিজেদের সন্তানদের নিয়ে গর্ববোধ করেন। পরিবারের ভেতরেও এখন পরিবেশ নিয়ে আলোচনা হয়। শিক্ষার্থীরা চোখে আঙুল দিয়ে প্রমাণ করে দিয়েছে যে, ভালো কাজের জন্য বয়সের বা ক্ষমতার কোনো প্রয়োজন নেই, শুধু সদিচ্ছা আর কাজ করার মানসিকতাই যথেষ্ট।
সরকারি ও স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তার প্রয়োজন
শিক্ষার্থীদের এই উদ্যোগগুলো নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়, তবে শুধু তাদের একার পক্ষে পুরো জেলার পরিবেশ চিরস্থায়ীভাবে রক্ষা করা সম্ভব নয়। তাদের এই কাজকে আরও বড় পরিসরে ছড়িয়ে দিতে সরকারি এবং স্থানীয় প্রশাসনের সার্বিক সহযোগিতা একান্ত প্রয়োজন। প্রশাসন চাইলে এসব শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ পুরস্কার বা সম্মাননার ব্যবস্থা করতে পারে, যাতে তারা আরও বেশি উৎসাহিত হয়। এছাড়া পৌরসভার উচিত এই তরুণদের সাথে সমন্বয় করে শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে আরও আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত করা। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এই ছোট ছোট উদ্যোগগুলোই একদিন জাতীয় পর্যায়ে বড় পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে।
উপসংহার
ঝিনাইদহে পরিবেশ রক্ষায় শিক্ষার্থীদের এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ আমাদের এক নতুন আশার বাণী শোনায়। তারা আমাদের দেখিয়ে দিচ্ছে যে, আমরা চাইলে আমাদের চারপাশের পৃথিবীটাকে কতটা সুন্দর করে সাজাতে পারি। পরিবেশ কোনো একক ব্যক্তি বা সরকারের সম্পদ নয়, এটি আমাদের সবার বেঁচে থাকার একমাত্র আশ্রয়। তাই এই পরিবেশ রক্ষার দায়িত্বও আমাদের সবার। ঝিনাইদহের এই তরুণ শিক্ষার্থীরা আজ যে পথ দেখাচ্ছে, সেই পথে যদি আমরা সবাই একটু একটু করে হাঁটি, তবে আগামী প্রজন্মের জন্য একটি সুন্দর, সবুজ ও দূষণমুক্ত পৃথিবী রেখে যাওয়া মোটেও অসম্ভব কিছু নয়। আসুন, আমরা শুধু এই শিক্ষার্থীদের প্রশংসা করেই নিজেদের দায়িত্ব শেষ না করি, বরং তাদের পাশে দাঁড়িয়ে পরিবেশ রক্ষায় নিজেরাও সক্রিয় ভূমিকা পালন করি।
















