ঝিনাইদহ শহরে মাদকের বিরুদ্ধে এক বড় ধরনের সাফল্য পেয়েছে RAB। আজ শনিবার, ২ মে দুপুরে শহরের ব্যস্ততম কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল এলাকায় একটি যাত্রীবাহী বাসে তল্লাশি চালিয়ে তারা বিপুল পরিমাণ ভয়ংকর মাদক ক্রিস্টাল মেথ বা আইস জব্দ করেছেন। উদ্ধার করা এই মাদকের বাজারমূল্য প্রায় সাড়ে ৭ কোটি টাকার ওপরে। এত বড় মাপের একটি মাদকের চালান উদ্ধারের খবরে এলাকার সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক চাঞ্চল্য ও বিস্ময়ের সৃষ্টি হয়েছে। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই বড় ঘটনার সাথে জড়িত কোনো অপরাধীকে তাৎক্ষণিকভাবে আটক করতে পারেননি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।
মাদক চোরাচালান ও বিস্তার রোধে বর্তমানে সারা দেশেই কঠোর নজরদারি বাড়িয়েছে প্রশাসন। এরই একটি নিয়মিত অংশ হিসেবে আজ শনিবার দুপুরে ঝিনাইদহ শহরের কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল সংলগ্ন যশোর রোডে একটি বিশেষ চেকপোস্ট বসান RAB-৬ এর ঝিনাইদহ ক্যাম্পের সদস্যরা। এই অভিযানে সরাসরি নেতৃত্ব দেন ক্যাম্পের চৌকস কমান্ডার স্কোয়াড্রন লিডার ইমামিম মুবিন সরকার। সেখানে তারা সন্দেহভাজন বিভিন্ন বাস, ট্রাক ও অন্যান্য যানবাহনে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে তল্লাশি চালাচ্ছিলেন। চেকপোস্টের কারণে রাস্তায় সাময়িক যানজট তৈরি হলেও সাধারণ যাত্রীরা এই অভিযানকে সাধুবাদ জানান।
তল্লাশির একপর্যায়ে সাতক্ষীরা জেলার সীমান্তবর্তী শ্যামনগর উপজেলা থেকে ছেড়ে আসা এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জগামী একটি লোকাল যাত্রীবাহী বাস চেকপোস্টে থামান RAB সদস্যরা। বাসের ভেতরে যাত্রীদের সিট, লাগেজ এবং মালামাল খুব সতর্কতার সাথে তল্লাশি করতে শুরু করেন তারা। হঠাৎ বাসের একেবারে পেছনের দিকে একটি সিটের নিচে পরিত্যক্ত অবস্থায় একটি সন্দেহজনক ব্যাগ দেখতে পান RAB সদস্যরা। বাসের কোনো যাত্রী বা চালকের সহকারী ওই ব্যাগের মালিকানা দাবি করেননি। সবার এই নীরবতা RAB সদস্যদের সন্দেহ আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
এরপর সবার সামনে ব্যাগটি খুললে তার ভেতরে অত্যন্ত ভয়ংকর ও দামি মাদক ক্রিস্টাল মেথের সন্ধান পান তারা। রাসায়নিক ভাষায় এই মাদককে মিথাইল অ্যামফিটামিন বলা হয়। মেশিনে ওজন করে দেখা যায়, সেখানে মোট ১ কেজি ৫১০ গ্রাম ক্রিস্টাল মেথ বা আইস রয়েছে। স্কোয়াড্রন লিডার ইমামিম মুবিন সরকার পরে গণমাধ্যম কর্মীদের নিশ্চিত করেন যে, উদ্ধার করা এই মাদকের আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৭ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। আন্তর্জাতিক মুদ্রার হিসাব অনুযায়ী এই বিপুল অর্থের পরিমাণ প্রায় ৬ লাখ ৮৬ হাজার ডলার ($৬৮৬,০০০) এর কাছাকাছি। এত দামি মাদক সাধারণত উচ্চবিত্ত সমাজে বেশি ব্যবহার হয়।
ব্যাগটি সম্পূর্ণ পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকায় এর আসল মালিক বা মূল মাদক পাচারকারীকে ঘটনাস্থল থেকে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি। RAB এর অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের ধারণা, চেকপোস্টে তল্লাশি শুরু হওয়ার বিষয়টি আগেই টের পেয়েছিল পাচারকারী। তাই সে কৌশলে ব্যাগটি বাসের ভেতরে রেখেই সবার অগোচরে ভিড়ের মধ্যে মিশে পালিয়ে যায়। বর্তমানে মাদক কারবারিরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে সাধারণ যাত্রীবাহী বাস ও পরিবহন মাধ্যমগুলোকে নিজেদের নিরাপদ বাহন হিসেবে ব্যবহার করছে। তারা সাধারণ যাত্রীর ছদ্মবেশ নিয়ে খুব সহজেই এক জেলা থেকে অন্য জেলায় মাদক পাচার করে।
চিকিৎসা বিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রচলিত ইয়াবা বা অন্যান্য মাদকের তুলনায় ক্রিস্টাল মেথ বা আইস প্রায় ১০০% বেশি ভয়ংকর এবং মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এই মাদকে একবার আসক্ত হলে তরুণ প্রজন্মের স্নায়ুতন্ত্র খুব দ্রুত পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়। দেশের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকা দিয়ে অত্যন্ত গোপনে এই দামি মাদক দেশে প্রবেশ করছে। চোরাকারবারিরা এই মাদক বিক্রি করে অনেক সময় ৩০০% থেকে ৫০০% পর্যন্ত অস্বাভাবিক মুনাফা লুটে নেয়। তাই এই পাচার চক্রের শেকড় উপড়ে ফেলা এখন সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বড় একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
RAB কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, উদ্ধার করা এই বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য নিয়ে বর্তমানে পরবর্তী আইনি কার্যক্রম জোরালোভাবে চলছে। জব্দ করা এই ক্রিস্টাল মেথ আনুষ্ঠানিকভাবে ঝিনাইদহ সদর থানায় হস্তান্তরের কাজ চলমান রয়েছে। পুলিশ এই ঘটনায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে একটি নিয়মিত মামলা দায়ের করবে। এরপর আসল অপরাধীদের খুঁজে বের করতে তারা গভীর তদন্ত চালিয়ে যাবে। এলাকার সচেতন নাগরিকরা দৃঢ়ভাবে আশা করছেন, প্রশাসন আগামী দিনেও এমন কঠোর অভিযান অব্যাহত রাখবে এবং সমাজ থেকে মাদকের এই ভয়াল বিষদাঁত চিরতরে ভেঙে দেবে।
















