গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলায় এক বীভৎস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে, যা পুরো এলাকাকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। সামান্য পারিবারিক তুচ্ছ ঘটনা আর মাদকের মরণনেশা কীভাবে একটি আপন সম্পর্ককে খুনের নেশায় পরিণত করতে পারে, তার এক ভয়াবহ উদাহরণ তৈরি হলো কেতকিরহাট মাঝিপাড়া এলাকায়। নিজের আপন ভাতিজা গোলাম হোসেনের হাতে অত্যন্ত নির্মমভাবে প্রাণ হারিয়েছেন চাচা শাহ জালাল। রবিবার গভীর রাতে যখন পুরো গ্রাম নিস্তব্ধ ছিল, তখনই এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডটি ঘটানো হয়। অভিযুক্ত গোলাম হোসেন ঘটনার পর থেকেই পলাতক রয়েছে, তবে পুলিশ তাকে ধরার জন্য চিরুনি অভিযান শুরু করেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ফুলছড়ি উপজেলার কঞ্চিপাড়া ইউনিয়নের কেতকিরহাট মাঝিপাড়া এলাকায় এই ঘটনাটি ঘটে। অভিযুক্ত গোলাম হোসেন দীর্ঘদিন ধরে মাদকাসক্ত এবং উগ্র স্বভাবের ছিল। পরিবারের সদস্যরা জানান, গত শনিবার সে ঢাকা থেকে বাড়িতে ফিরে আসে। ঢাকা থেকে ফেরার মাত্র ২৪ ঘণ্টার মাথায় সে এমন এক কাণ্ড ঘটাবে, তা কেউ কল্পনাও করতে পারেনি। মূলত নিজের স্ত্রীর ওপর শারীরিক নির্যাতনের প্রতিবাদ করায় এবং মাদক নিয়ে শাসন করায় চাচার ওপর চরম ক্ষুব্ধ ছিল গোলাম। এই ক্ষোভ থেকেই সে হত্যার এক পরিকল্পিত নীল নকশা তৈরি করে।
হত্যাকাণ্ডটি ছিল অত্যন্ত সুপরিকল্পিত। রবিবার রাতে খুনি গোলাম হোসেন জানত যে, সে যদি আক্রমণ করে তবে প্রতিবেশীরা সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসতে পারে। তাই সে অত্যন্ত চতুরতার সাথে প্রতিবেশীদের অন্তত ৪ থেকে ৫টি ঘরের দরজা বাইরে থেকে আটকে দেয়। এর ফলে কেউ যেন ঘর থেকে বের হতে না পারে সেই ব্যবস্থা নিশ্চিত করে সে। রাত যখন প্রায় ২টা থেকে ৩টার মধ্যে, তখন সে সন্তর্পণে চাচা শাহ জালালের ঘরে প্রবেশ করে। শাহ জালাল তখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিলেন। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই গোলাম হোসেন একটি অত্যন্ত ধারালো ছুরি দিয়ে তার চাচার গলা কেটে ফেলে।
হত্যাকাণ্ডের সময় শাহ জালালের গোঙানির শব্দ শুনে তার স্ত্রী দ্রুত ঘুম থেকে জেগে ওঠেন। তিনি দেখেন রক্তাক্ত অবস্থায় বিছানায় তার স্বামী ছটফট করছেন এবং হাতে রক্তমাখা ছুরি নিয়ে গোলাম হোসেন ঘর থেকে দ্রুত পালিয়ে যাচ্ছে। স্ত্রীর চিৎকার শুনে গ্রামবাসী দরজা খোলার চেষ্টা করেন কিন্তু বাইরে থেকে আটকে থাকায় তাদের বের হতে সময় লাগে। পরে জানালার গ্রিল বা বিকল্প উপায়ে বাইরে এসে লোকজন শাহ জালালের নিথর দেহ উদ্ধার করেন। গলা প্রায় ৯০ শতাংশ কেটে ফেলায় ঘটনাস্থলেই শাহ জালালের মৃত্যু হয় বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।
নিহতের পরিবারের দাবি, গোলাম হোসেনের মাদকাসক্তি এই খুনের পেছনে অন্তত ৮০ শতাংশ দায়ী। এলাকায় মাদকের বিস্তার নিয়ে স্থানীয়রা বেশ উদ্বিগ্ন। তাদের মতে, গত এক বছরে এই এলাকায় মাদক সংক্রান্ত ছোটখাটো অপরাধ প্রায় ৬০ শতাংশ বেড়ে গেছে। শাহ জালাল একজন সাধারণ মানুষ ছিলেন যিনি সবসময় চাইতেন তার ভাতিজা যেন এই অন্ধকার পথ থেকে ফিরে আসে। কিন্তু ভাতিজার কাছে চাচার এই হিতোপদেশই কাল হয়ে দাঁড়াল। গোলাম হোসেন প্রায়ই তার স্ত্রীর ওপর অমানুষিক নির্যাতন করত এবং শাহ জালাল এর কঠোর প্রতিবাদ করেছিলেন। এই বিষয়টিই গোলামের মনে চরম জিঘাংসা তৈরি করে।
সোমবার সকালে ঘটনার খবর পেয়ে ফুলছড়ি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) দুরুল হুদা একদল পুলিশ নিয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। এর পাশাপাশি গাইবান্ধা থেকে সিআইডি-র একটি বিশেষজ্ঞ দল সেখানে পৌঁছে আলামত সংগ্রহ করে। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত একটি রক্তমাখা ধারালো ছুরি জব্দ করেছে। মরদেহটি ময়নাতদন্তের জন্য গাইবান্ধা জেলা সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। পুলিশের এই অভিযানে প্রায় ১০ থেকে ১৫ জন গ্রামবাসীর সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে, যারা ঘটনার আগে ও পরে গোলাম হোসেনের গতিবিধি লক্ষ্য করেছিলেন।
ওসি দুরুল হুদা সংবাদমাধ্যমকে জানান, “প্রাথমিক তদন্তে আমরা নিশ্চিত হয়েছি যে এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। পারিবারিক কলহ এবং মাদকের প্রভাব এই দুইয়ে মিলে এই অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। আমরা ইতিমধ্যে ২ থেকে ৩টি বিশেষ টিম গঠন করেছি অভিযুক্ত গোলাম হোসেনকে গ্রেফতার করার জন্য। অপরাধী যেখানেই লুকিয়ে থাকুক না কেন, আমরা তাকে আইনের আওতায় নিয়ে আসব।” তিনি আরও জানান, এই ঘটনায় একটি হত্যা মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে এবং তদন্ত প্রায় ১০০ শতাংশ নিঁখুতভাবে পরিচালনা করা হচ্ছে।
এদিকে, এই হত্যাকাণ্ডের পর থেকে কেতকিরহাট এলাকায় এক থমথমে পরিবেশ বিরাজ করছে। গ্রামবাসীর মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে কারণ গোলাম হোসেনের মতো মাদকাসক্ত ব্যক্তিরা সমাজে এক একটা জীবন্ত বোমার মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সদস্যরা এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে দোষীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করেছেন। তারা চান, দ্রুত বিচারের মাধ্যমে গোলাম হোসেনকে সর্বোচ্চ সাজা দেওয়া হোক যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো ভাতিজা তার চাচার ওপর এমন পৈশাচিক হামলা করার সাহস না পায়। নিহত শাহ জালালের পরিবারের কান্নায় এখন আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে, তারা এখন কেবল ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন।














