ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার এক পরিচিত মুখ মোসাঃ ছালমা বেগম, যাকে সবাই এক নামে ‘বাউল ছালমা’ বলে চেনেন। তার জীবন যেন এক জীবন্ত মহাকাব্য। যে বয়সে মানুষের নিজের পায়ে দাঁড়ানোই দায় হয়ে পড়ে, সেই সময় থেকেই তিনি সংগীত আর সমাজসেবাকে পাথেয় করে পথ চলছেন। দীর্ঘ ২৭ বছরের এই পথচলায় তিনি শুধু গানই গাননি, সুরের মূর্ছনায় গেয়েছেন অবহেলিত মানুষের জয়গান। চরম অভাব-অনটন আর সামাজিক প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে তিনি আজ ঝালকাঠি তো বটেই, সারা দেশের নারী জাগরণের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তবে সাফল্যের এই চূড়ায় পৌঁছানো তার জন্য মোটেই সহজ ছিল না; শতভাগ পরিশ্রম আর হার না মানা মানসিকতা তাকে আজ এই অবস্থানে নিয়ে এসেছে।
একটি হতদরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়া ছালমার শৈশব কেটেছে চরম অনিশ্চয়তায়। অভাবের কারণে যেখানে তিন বেলা ঠিকমতো খাবার জুটত না, সেখানে সংগীতচর্চা ছিল এক বিলাসিতা। কিন্তু মনের জোর আর অদম্য ইচ্ছাশক্তির কাছে দারিদ্র্য হার মেনেছে। স্কুলজীবন থেকেই তিনি মানুষের দুঃখ-কষ্ট দেখে বিচলিত হতেন। সেই থেকেই শুরু হয় তার সমাজসেবার ব্রত। আজ থেকে প্রায় ২৭ বছর আগে যখন তিনি প্রথম সংগীতশিল্পী হিসেবে মঞ্চে দাঁড়ান, তখন থেকেই তার লক্ষ্য ছিল শিল্পের মাধ্যমে সমাজকে পরিবর্তন করা। দীর্ঘ এই সময়ে তিনি অসংখ্য মানুষের সান্নিধ্যে এসেছেন, দেখেছেন ক্ষমতার উত্থান আর পতন। কিন্তু ছালমা বেগম কখনো পথ হারাননি। তিনি বিশ্বাস করেন, মানুষের আসল পরিচয় তার কর্মে, ক্ষমতায় নয়।
বর্তমানে ছালমা বেগম শুধু একজন গায়িকাই নন, তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) ও বেতারের একজন নিয়মিত সংগীতশিল্পী। তার মেধা ও সমাজ উন্নয়নের অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি সরকারিভাবে ‘বিভাগীয় শ্রেষ্ঠ জয়িতা’ হিসেবে প্রথম স্থান এবং জাতীয় পর্যায়ে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছেন। এছাড়া তিনি ‘ছালমা যুব সংস্থা ও শিল্পীগোষ্ঠী’র প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি। শুধু সাংস্কৃতিক অঙ্গন নয়, স্থানীয় রাজনীতিতেও তিনি তার প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। তিনি রাজাপুরের সাবেক নারী ইউপি সদস্য ছিলেন এবং ‘বাংলাদেশ মেম্বার কল্যাণ অ্যাসোসিয়েশন’-এর কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া স্থানীয় সংবাদকর্মীদের প্রিয় প্রতিষ্ঠান ‘রাজাপুর সাংবাদিক ক্লাব’-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্যসহ একাধিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ পদে রয়েছেন তিনি।
তবে ছালমা বেগমের এই সাফল্য যখন আকাশচুম্বী, ঠিক তখনই কিছু স্বার্থান্বেষী মহল তার এই অর্জনকে বিতর্কিত করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়া বা রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিদের সঙ্গে তোলা ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে তাকে নানা নেতিবাচক ট্যাগ দেওয়ার চেষ্টা চলছে। এ বিষয়ে ছালমা বেগম বেশ স্পষ্টবাদী। তিনি জানান, সংগঠনের প্রয়োজনে এবং সামাজিক কাজের তাগিদে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা তার দায়িত্বেরই একটি অংশ। এটি কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থের জন্য নয়, বরং সমাজের ১০০ শতাংশ উন্নয়ন আর মানুষের কল্যাণের জন্য করা হয়। কিছু নেটিজেন তার পাশে দাঁড়ালেও একটি বিশেষ মহল মিথ্যে তথ্য ছড়িয়ে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে।
এই অপপ্রচারের প্রতিক্রিয়ায় বাউল ছালমা বলেন, “একটি স্থিরচিত্র কখনো ২৭ বছরের দীর্ঘ সংগ্রাম আর আত্মত্যাগের ইতিহাসকে মুছে দিতে পারে না। আমি যখন দারিদ্র্যের সঙ্গে যুদ্ধ করেছি, যখন সামাজিক নিপীড়নের মধ্য দিয়ে পথ চলেছি, তখন তো এই তথাকথিত সমালোচকদের কাউকে আমার পাশে দেখিনি। আমি জানি মানুষের কান্না কেমন হয়, কারণ আমি নিজেও অভাবের মধ্য দিয়ে বড় হয়েছি।” তিনি আরও বলেন যে, যারা আজ ফেসবুক বা জনসভায় বসে তাকে নিয়ে কটু কথা বলছেন, তারা আসলে নিজেদের সুবিধাবাদ আড়াল করতেই এমনটি করছেন। সাধারণ মানুষ জানে ছালমা বেগম কে এবং সমাজের জন্য তিনি কতটা নিবেদিত।
ছালমার জীবনে অর্জিত প্রতিটি সম্মান তার নিজের ঘামে ভেজা কষ্টের ফসল। তিনি রাজাপুরের সাংবাদিক ক্লাব ও বিভিন্ন মানবিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থেকে মানুষের বিপদে সাহায্য করেছেন। স্থানীয়রা জানান, করোনাকালীন সময়ে কিংবা বন্যার মতো দুর্যোগে ছালমা বেগম তার সামর্থ্যের ১০০ শতাংশ দিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। দারিদ্র্য যে মানুষকে দয়া করতে শেখায় না, বরং মানুষের পাশে দাঁড়ানোর শক্তি যোগায় ছালমা বেগম তার অন্যতম প্রমাণ। তার কর্মকাণ্ডে এলাকার অসহায় ও গরিব মানুষগুলো যে ভরসা পায়, তা কোনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নেতিবাচক পোস্ট দিয়ে নষ্ট করা সম্ভব নয়।
ইতিহাসের পাতায় সবসময় লড়াই করা মানুষেরাই জয়ী হয়। বাউল ছালমার জীবনদর্শনও অনেকটা তেমনই। তিনি বিশ্বাস করেন, সময় সবসময় সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করে। সত্যের পথে থেকে ২৭ বছর ধরে যে সম্মান তিনি অর্জন করেছেন, তা কোনো ক্ষণিকের অপপ্রচারে ধূলিসাৎ হবে না। তার মতে, সংগ্রাম, সততা আর মানবিকতার কালি দিয়ে লেখা ইতিহাস কখনো মোছা যায় না। মানুষের ভালোবাসা আর আস্থাই তার জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ। তিনি আজ যে ‘বাউল ছালমা’ হয়ে উঠেছেন, তার পেছনে রয়েছে হাজারো মানুষের দোয়া ও শ্রদ্ধা।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে ছালমা বেগম জানান, জীবনের বাকি সময়টুকু তিনি এভাবেই মানবসেবায় উৎসর্গ করতে চান। সামাজিক প্রতিবন্ধকতা কিংবা মিথ্যে অপবাদ তাকে থামিয়ে দিতে পারবে না। রাজাপুরের মাটি ও মানুষের সঙ্গে তার নাড়ির টান। সংগীতের সুর আর সেবার ব্রত এই দুইকে সাথী করেই তিনি সামনের দিনগুলোতে আরও বড় পরিসরে কাজ করার স্বপ্ন দেখেন। ঝালকাঠির প্রতিটি প্রান্তে মাদক ও অপরাধমুক্ত সমাজ গড়তে তিনি কাজ করে যাবেন। বাউল ছালমার এই সাহসী পদযাত্রা উপজেলার হাজারো নারীর জন্য এক বিশাল অনুপ্রেরণা।














