নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলায় এক মর্মান্তিক ও শিউরে ওঠার মতো ঘটনা ঘটেছে। ঘরের আসবাবপত্র বা আলমারি যেখানে আমরা আমাদের মূল্যবান জিনিসপত্র রাখি, সেই নিরাপদ আশ্রয়েই লুকিয়ে ছিল মরণঘাতী বিষধর সাপ। আর সেই সাপের ছোবলেই প্রাণ হারিয়েছেন শাহানাজ আক্তার (২৫) নামের এক তরুণী গৃহবধূ। গত রবিবার দুপুরে উপজেলার মিরওয়ারিশপুর ইউনিয়নের মিরওয়ারিশপুর গ্রামের চাপরাশি বাড়িতে এই হৃদয়বিদারক ঘটনাটি ঘটে। দুই অবুঝ সন্তানকে রেখে শাহানাজের এই অকাল মৃত্যুতে পুরো এলাকায় শোকের মাতম চলছে। কারো যেন বিশ্বাসই হচ্ছে না যে, নিজের ঘরের আলমারির ভেতর থেকে এমন বিপদ নেমে আসতে পারে।
ঘটনাটি ঘটে রবিবার দুপুর ১২টার দিকে। প্রতিদিনের মতোই শাহানাজ আক্তার দুপুরের রান্নার কাজে ব্যস্ত ছিলেন। রান্নাঘরের প্রয়োজনীয় কিছু মসলাপাতি ও পেঁয়াজ তিনি ঘরের একটি আলমারিতে সংরক্ষণ করে রাখতেন। রান্নার প্রয়োজনে যখন তিনি আলমারিটি খুলে পেঁয়াজ বের করতে যান, তখন ভেতরে আগে থেকেই কুণ্ডলী পাকিয়ে থাকা একটি বিষধর সাপ তার হাতে প্রচণ্ড জোরে ছোবল দেয়। মুহূর্তের মধ্যে শাহানাজের চিৎকারে বাড়ির লোকজন ছুটে আসেন। সাপের কামড়ের জায়গায় বিষ ছড়িয়ে পড়ায় তিনি দ্রুত নেতিয়ে পড়তে শুরু করেন। গ্রামের সাধারণ মানুষ ও পরিবারের সদস্যরা প্রথমে কিছুটা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন এবং স্থানীয়ভাবে প্রাথমিক চিকিৎসার চেষ্টা করেন।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, শাহানাজের অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে থাকলে তাকে দুপুর আড়াইটার দিকে ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে জরুরি বিভাগে ভর্তি করার পর চিকিৎসকরা তাকে অ্যান্টি-ভেনম বা বিষ নিরোধক ইনজেকশনসহ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দিতে শুরু করেন। শাহানাজকে বাঁচাতে চিকিৎসকদের প্রচেষ্টা ছিল ১০০ শতাংশ। কিন্তু বিষ তার রক্তে এমনভাবে মিশে গিয়েছিল যে শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলো কাজ করা বন্ধ করে দিচ্ছিল। বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে হাসপাতালের বিছানায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই দুই সন্তানের জননী। মৃত্যুর খবরটি বাড়িতে পৌঁছামাত্রই কান্নার রোলে আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে ওঠে।
২৫০ শয্যাবিশিষ্ট নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. রাজীব আহমেদ চৌধুরী ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, শাহানাজ আক্তার যখন হাসপাতালে পৌঁছান, তখন তার শরীরে বিষের প্রতিক্রিয়া অনেক বেশি ছিল। চিকিৎসকরা তাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়েছেন। তবে গ্রামগঞ্জে সাপের কামড়ের ক্ষেত্রে দেখা যায়, প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ হাসপাতালে আসতে দেরি করে ফেলেন, যা মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়। শাহানাজের ক্ষেত্রেও কামড় দেওয়ার প্রায় আড়াই ঘণ্টা পর তাকে হাসপাতালে আনা হয়েছিল। চিকিৎসকদের মতে, সাপে কামড়ানোর প্রথম ১ ঘণ্টা বা গোল্ডেন আওয়ারের মধ্যে চিকিৎসা শুরু করা গেলে বেঁচে থাকার সম্ভাবনা ৯০ শতাংশের বেশি থাকে।
বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ৭,০০,০০০ মানুষ সাপের কামড়ের শিকার হন, যার মধ্যে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ায় সাপের কামড়ে মৃত্যুর হার অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং এই স্বাস্থ্য সংকটে প্রতি বছর কয়েক বিলিয়ন ডলারের (যেমন- প্রায় $১.২ বিলিয়ন) অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়। শাহানাজের মতো একজন গৃহবধূর মৃত্যু শুধু একটি জীবনের অবসান নয়, বরং দুটি শিশুর ভবিষ্যৎকে এক অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে। স্থানীয়রা জানান, শাহানাজের স্বামী জায়েদ হোসেন একজন পরিশ্রমী মানুষ এবং তাদের ছোট দুই সন্তানের ভরসাস্থল ছিলেন শাহানাজ। এখন সেই সন্তানদের দেখাশোনার জন্য কেউ রইল না।
বেগমগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান জানান, “ঘটনাটি লোকমুখে শুনেছি এবং হাসপাতাল থেকেও তথ্য পেয়েছি। তবে পরিবারের পক্ষ থেকে এখনও কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দেওয়া হয়নি। আমরা ঘটনাটির খোঁজখবর নিচ্ছি এবং প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করব।” পুলিশ ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা সাধারণ মানুষকে সচেতন করার জন্য বার্তা দিচ্ছেন যে, বর্ষা মৌসুমে বা বৃষ্টির দিনে গর্তে পানি ঢুকে যাওয়ায় সাপগুলো নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে লোকালয়ে এবং মানুষের শোবার ঘরে বা আসবাবপত্রের ভেতরে ঢুকে পড়ে।
বর্তমানে মিরওয়ারিশপুর গ্রামে এক থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। গ্রামের গৃহিণীরা এখন আলমারি বা অন্ধকার কোণে হাত দিতে ভয় পাচ্ছেন। স্থানীয় পরিবেশবাদীরা বলছেন, বাড়ির আশপাশে কার্বলিক এসিড রাখা বা ঝোপঝাড় পরিষ্কার রাখলে সাপের উপদ্রব অন্তত ৫০ শতাংশ কমানো সম্ভব। বিশেষ করে প্লাস্টিকের বস্তা বা কাপড়ের স্তূপের নিচে সাপ বেশি লুকিয়ে থাকে। শাহানাজের এই করুণ মৃত্যু যেন আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল যে, অসতর্কতা কীভাবে কেড়ে নিতে পারে অমূল্য প্রাণ।
সবশেষে শাহানাজ আক্তারের দাফন সম্পন্ন হয়েছে তার পারিবারিক কবরস্থানে। এলাকাবাসী ও ভুক্তভোগী পরিবারটি চায়, এমন মর্মান্তিক ঘটনার আর পুনরাবৃত্তি না হোক। প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগের উচিত জনসচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি উপজেলার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে পর্যাপ্ত অ্যান্টি-ভেনমের মজুদ নিশ্চিত করা। কারণ একটি সাপের কামড় শুধু একজনকে নয়, পুরো একটি পরিবারকে নিঃস্ব করে দেয়।














