দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি ও মৎস্য খাতে দারুণ সমৃদ্ধ একটি জেলা ঝিনাইদহ। এই জেলায় একটি পূর্ণাঙ্গ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি এখন সময়ের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয় মানুষ ও শিক্ষাবিদরা মনে করেন, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) অধীনে থাকা ঝিনাইদহ ভেটেরিনারি ক্যাম্পাসের অবকাঠামো কাজে লাগিয়ে খুব সহজেই এই স্বপ্ন পূরণ করা সম্ভব। এতে সরকারের বিশাল অঙ্কের টাকা বাঁচবে এবং অনেক কম সময়ে একটি চমৎকার বিশ্ববিদ্যালয় দাঁড়িয়ে যাবে।
ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর ও যশোর অঞ্চল আমাদের দেশের মোট কৃষি উৎপাদনের প্রায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ জোগান দেয়। এই বিশাল কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির কথা মাথায় রেখেই একসময় এখানে একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সাবেক সংসদ সদস্য মশিউর রহমান মূলত ঝিনাইদহ সরকারি ভেটেরিনারি কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যা পরে পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপ নেবে বলে সবাই আশা করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে নানা সংকটে পড়ে সেটি যবিপ্রবির একটি অনুষদ হয়ে যায়। সরকার যদি একেবারে নতুন জায়গায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় করতে চায়, তবে জমি অধিগ্রহণ ও নতুন ভবন তৈরিতে প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ মিলিয়ন ডলার বা হাজার কোটি টাকার ওপরে খরচ হবে। অথচ বিদ্যমান এই ক্যাম্পাসটি ব্যবহার করলে খরচের প্রায় ৮০ শতাংশই বেঁচে যাবে।
বর্তমান ঝিনাইদহ ভেটেরিনারি ক্যাম্পাসে গেলে যে কেউ অবাক হবেন। কারণ এখানে একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য দরকারি প্রায় সব আধুনিক সুবিধাই মজুত আছে। প্রশস্ত ক্লাসরুম, আধুনিক ল্যাবরেটরি, আন্তর্জাতিক মানের গবেষণাগার, শিক্ষার্থীদের থাকার আবাসন সুবিধা, ভেটেরিনারি হাসপাতাল, অডিটোরিয়াম এবং জিমনেশিয়াম আগে থেকেই প্রস্তুত। ব্যবহারিক শিক্ষার জন্য এখানে গরুর ডেইরি, ছাগল ও মুরগির খামার রয়েছে। ফিশারিজ বা মৎস্য বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের জন্য দরকারি পুকুরও আছে। চারপাশের একাধিক জেলার সাথে এখানকার যাতায়াত ব্যবস্থাও চমৎকার।
এলাকার সচেতন মানুষ এই বড় সুযোগ হাতছাড়া করতে চান না। ঝিনাইদহ শহরের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী হাদী উজ্জামান বলেন, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষিকে টেকসই করতে হলে এখানে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। এখানকার তৈরি অবকাঠামো সঠিকভাবে কাজে লাগালে খুব দ্রুত আমরা আন্তর্জাতিক মানের একটি প্রতিষ্ঠান পাব। ঝিনাইদহ কে.সি কলেজের সাবেক অধ্যাপক মহব্বত হোসেন টিপুও একই কথা জানান। তিনি জোর দিয়ে বলেন, নতুন কৃষি প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও কৃষকদের মাঠপর্যায়ের সমস্যাগুলো সমাধানে এই বিশ্ববিদ্যালয় সরাসরি কাজ করতে পারবে।
রাজনৈতিক নেতারাও সাধারণ মানুষের এই দাবির সাথে একমত হয়েছেন। ঝিনাইদহ-২ আসনের সংসদ সদস্য আলী আজম মোঃ আবুবকর বলেন, তিনি জাতীয় সংসদে এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিষয়টি বেশ গুরুত্বের সাথে তুলেছেন। সংশ্লিষ্ট সবার সাথে কথা বলে তিনি দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবেন। এদিকে কেউ কেউ দত্তনগর কৃষি ফার্মকে বিশ্ববিদ্যালয় বানানোর একটি প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা এই প্রস্তাব সরাসরি বাতিল করে দিয়েছেন। কারণ দত্তনগর দেশের অন্যতম প্রধান বীজ উৎপাদন কেন্দ্র। সেখানে বিশ্ববিদ্যালয় বানালে দেশের কৃষিজ উৎপাদনে বড় ধরনের ধাক্কা লাগবে। তাছাড়া সেখানে নাগরিক সুযোগ-সুবিধাও অনেক কম।
ঝিনাইদহ ক্যাম্পাসকে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করা হলে এই অঞ্চলের মানুষের ভাগ্য পুরোপুরি বদলে যাবে। আধুনিক কৃষি গবেষণার পাশাপাশি এখানে হাজার হাজার তরুণের নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে। সরকারের উচিত আর দেরি না করে দ্রুত এই বিষয়ে একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নেওয়া। সঠিক পদক্ষেপ নিলে এটি শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবেই থাকবে না, বরং পুরো দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠবে এবং দেশের কৃষিখাতকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।
















