ঝিনাইদহ জেলার শৈলকুপা উপজেলা একসময় গ্রাম্য দলাদলি ও তুচ্ছ ঘটনায় বড় ধরনের
মারামারির জন্য সারা দেশে পরিচিত ছিল। এমন একটি এলাকায় আইনশৃঙ্খলা
পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা পুলিশের জন্য সব সময়ই একটি বড় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু
সাম্প্রতিক সময়ে এখানকার পরিবেশে চমৎকার এক ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে।
জনগণের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অপরাধ দমনে অসামান্য অবদান রাখার
স্বীকৃতি হিসেবে ঝিনাইদহ জেলার শ্রেষ্ঠ অফিসার ইনচার্জ বা ওসি
নির্বাচিত হয়েছেন শৈলকুপা থানার ওসি মো. হুমায়ূন কবির মোল্লা।
মার্চ ২০২৬ মাসের সার্বিক কর্মতৎপরতা এবং জনসেবামূলক কাজের মূল্যায়নের
ভিত্তিতে তাকে এই সম্মানজনক পুরস্কার দেওয়া হয়।
গত বৃহস্পতিবার ঝিনাইদহ জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত মাসিক অপরাধ
পর্যালোচনা সভায় আনুষ্ঠানিকভাবে তাকে এই পুরস্কার তুলে দেন জেলার
পুলিশ সুপার। তিনি নিজের হাতে ওসি হুমায়ূন কবির মোল্লার হাতে শ্রেষ্ঠত্বের
দৃষ্টিনন্দন ক্রেস্ট ও সম্মাননা সনদ প্রদান করেন। অনুষ্ঠানে জেলার
অন্যান্য থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবং পুলিশের অনেক ঊর্ধ্বতন
সদস্য উপস্থিত ছিলেন। এমন একটি দারুণ স্বীকৃতি পাওয়ার পর পুরো শৈলকুপা
থানার পুলিশ সদস্যদের মাঝে কাজের প্রতি নতুন করে বিপুল উৎসাহ তৈরি হয়েছে।
তারা এখন আরও বেশি মনোযোগ দিয়ে সাধারণ মানুষের সেবা করতে চান। এই সাফল্য
অন্য থানার পুলিশ সদস্যদেরও ভালো কাজ করতে প্রেরণা জোগাবে।
জেলা পুলিশের কার্যালয় থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে জানা যায়, গত মার্চ মাসে
শৈলকুপা এলাকায় সব ধরনের অপরাধের মাত্রা প্রায় ৪০% পর্যন্ত কমে গেছে।
বিশেষ করে কিশোর গ্যাং, মাদক ব্যবসা, চুরি ও ডাকাতির মতো মারাত্মক ঘটনাগুলো
কঠোর হাতে দমন করেছে স্থানীয় থানা পুলিশ। গত এক মাসে শৈলকুপা পুলিশ বিভিন্ন
প্রত্যন্ত এলাকায় অভিযান চালিয়ে বেশ কিছু দেশীয় অস্ত্র ও ক্ষতিকর মাদক উদ্ধার
করেছে। উদ্ধার হওয়া এসব মাদকের বাজারমূল্য প্রায় ৫,০০০ ডলার ($৫,০০০)
বা ৫ লাখ টাকার ওপরে। অবৈধ ব্যবসার সাথে জড়িত অনেক শীর্ষ অপরাধীকে তারা সফলভাবে
আইনের আওতায় এনেছেন।
শুধু অপরাধীদের দমন করাই নয়, বরং সাধারণ মানুষের আস্থার জায়গা হিসেবে শৈলকুপা
থানাকে একটি জনবান্ধব রূপ দিয়েছেন ওসি হুমায়ূন কবির। আগে গ্রামের
সাধারণ মানুষ থানায় আসতে ভয় পেতেন। কিন্তু এখন তিনি পুলিশের সেবা
মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে বিভিন্ন এলাকায় নিয়মিত উঠান বৈঠক করছেন।
এসব বৈঠকে তিনি সরাসরি মানুষের সমস্যার কথা শোনেন এবং দ্রুত সমাধান বের করেন।
থানায় সাধারণ ডায়েরি বা মামলা করতে আসা মানুষ এখন কোনো আর্থিক হয়রানির শিকার হন
না। জরুরি সেবা ৯৯৯ থেকে কল পেলেও তারা দ্রুত সাড়া দেন। থানার সেবার মান আগের চেয়ে
অন্তত ৮০% উন্নত হয়েছে বলে স্থানীয় ভুক্তভোগী মানুষ মনে করেন।
এলাকার আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক থাকায় শৈলকুপার অর্থনীতিতেও দারুণ প্রভাব পড়েছে।
ব্যবসায়ীরা এখন চাঁদাবাজির ভয় ছাড়া গভীর রাত পর্যন্ত দোকান খোলা রাখতে
পারছেন। পরিবহন শ্রমিকরা রাতে নিরাপদে মহাসড়কে গাড়ি চালাচ্ছেন। কৃষকরাও
নিশ্চিন্তে মাঠে কাজ করতে পারছেন। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন,
আইনশৃঙ্খলা ভালো থাকলে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যে অন্তত ১৫% বেশি গতি আসে।
এলাকার মানুষ বলছেন, বর্তমান ওসির সাহসী ও নিরপেক্ষ ভূমিকার কারণে মাস্তান ও
চাঁদাবাজরা এখন কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। আগে সন্ধ্যা হলেই এলাকার রাস্তাঘাটে মানুষের
মনে যে অজানা আতঙ্ক কাজ করত, এখন তার সামান্য ছিটেফোঁটাও অবশিষ্ট নেই।
শ্রেষ্ঠ ওসির পুরস্কার পাওয়ার পর মো. হুমায়ূন কবির মোল্লা তার অনুভূতি প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, এই পুরস্কার শুধু তার একার অর্জন নয়, বরং এটি পুরো শৈলকুপা থানার
প্রতিটি পুলিশ সদস্যের দিনরাতের কঠোর পরিশ্রমের ফসল। তিনি এলাকার
সাধারণ মানুষের সহযোগিতার কথাও কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করেন। তিনি জানান,
শৈলকুপার সাধারণ মানুষ যদি সঠিক সময়ে পুলিশকে সঠিক তথ্য দিয়ে সাহস করে
সাহায্য না করতেন, তাহলে এত দ্রুত অপরাধীদের ধরা বা এলাকার অপরাধ দমন করা
কোনোভাবেই তাদের পক্ষে সম্ভব হতো না। তিনি ভবিষ্যতে আরও নিষ্ঠার সাথে কাজ করার
অঙ্গীকার করেন।
ওসি হুমায়ূন কবির মোল্লার এই অনন্য অর্জনে শৈলকুপার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ
দারুণ খুশি। স্থানীয় ব্যবসায়ী সমিতি, শিক্ষক, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও
সচেতন নাগরিকরা তাকে সরাসরি দেখা করে উষ্ণ অভিনন্দন জানিয়েছেন। আগামী
দিনগুলোতেও শৈলকুপার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এমন সুন্দর ও স্বাভাবিক
থাকবে বলে এলাকার সবাই আন্তরিকভাবে আশা করছেন। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, এমন
সৎ ও দক্ষ একজন পুলিশ কর্মকর্তার নেতৃত্বে শৈলকুপা থানা এলাকায় অপরাধের মাত্রা
অচিরেই শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে। এটি পুরো ঝিনাইদহ জেলার জন্যই একটি
দারুণ দৃষ্টান্ত।
















