সাঘাটায় সত্যের কণ্ঠরোধের চেষ্টা: কিশোর গ্যাং ও মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে লিখে সাংবাদিক ইয়ামিনকে হত্যার হুমকি

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলায় সাহসী সাংবাদিকতার এক চরম মূল্য দিতে হচ্ছে সাংবাদিক ইয়ামিন হাসানকে। কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য আর মাদকের রমরমা কারবার নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করায় তাকে প্রকাশ্য দিবালোকে অবরুদ্ধ করে প্রাণনাশের হুমকি দিয়েছে একদল দুষ্কৃতকারী। গত ১১ জুলাই রাত আনুমানিক ৮টা থেকে সাড়ে ৮টার দিকে উপজেলার ভরতখালী এলাকায় এই ন্যাক্কারজনক ঘটনাটি ঘটে। ইয়ামিন হাসান জাতীয় দৈনিক ‘আমার সংবাদ’ পত্রিকার সাঘাটা উপজেলা প্রতিনিধি এবং স্থানীয় সংবাদকর্মী হিসেবে বেশ জনপ্রিয়। এই ঘটনার পর থেকে পুরো উপজেলায় সাংবাদিক সমাজ ও সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

ঘটনার সূত্রপাত হয় সাংবাদিক ইয়ামিনের সম্প্রতি প্রকাশিত কয়েকটি সাহসী প্রতিবেদনের মাধ্যমে। তিনি দৈনিক আমার সংবাদ-এ “সাঘাটায় মাদকের ভয়াল থাবা” এবং অনলাইন নিউজ পোর্টাল দৈনিক কলম যোদ্ধা ডট কম-এ “পর্ব-১ ভাড়ায় খাটে কিশোর গ্যাং! দোকান চুরি ও মাদক বাণিজ্যের অন্ধকার জগৎ” শিরোনামে দুটি তথ্যবহুল প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। স্থানীয় তথ্যানুযায়ী, সাঘাটায় কিশোর গ্যাংয়ের সক্রিয়তা গত এক বছরে প্রায় ৪০% বৃদ্ধি পেয়েছে। ইয়ামিনের প্রতিবেদনে নির্দিষ্ট কোনো কিশোরের নাম উল্লেখ না থাকলেও ওই অঞ্চলের অন্তত ১০ থেকে ১৫টি অপরাধী চক্র নিজেদের বিপদ অনুভব করে। বিশেষ করে প্রতিবেদনে মাদকের যে বিস্তারিত তথ্য উঠে এসেছে, তাতে মাদক সিন্ডিকেটের প্রায় ৭০% অবৈধ লেনদেনের পথ সংকীর্ণ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়।

প্রতিবেদনে ক্ষিপ্ত হয়ে শনিবার রাতে উল্লা ভরতখালী এলাকায় সাংবাদিক ইয়ামিনের অস্থায়ী কার্যালয় ঘেরাও করে একদল সন্ত্রাসী। অভিযুক্তদের মধ্যে স্থানীয় নিরব ইসলাম সেতু, শান্ত মিয়া এবং রিয়াজসহ আরও ৫-৬ জন যুবক ছিল। তারা অতর্কিতে ইয়ামিনের কার্যালয় অবরুদ্ধ করে ফেলে এবং অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ শুরু করে। এক পর্যায়ে তারা চিৎকার করে বলতে থাকে, “সংবাদ প্রকাশ করে আমাদের ব্যবসার ক্ষতি করছিস, তোকে জ্যান্ত পুঁতে ফেলব।” উপস্থিত প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সন্ত্রাসীরা প্রায় ২০ থেকে ৩০ মিনিট ধরে অফিসটি ঘিরে রাখে। এই সময় এলাকার পরিবেশ থমথমে হয়ে পড়ে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

বিপজ্জনক পরিস্থিতি বুঝতে পেরে সাংবাদিক ইয়ামিন হাসান তাৎক্ষণিকভাবে সাঘাটা থানার অফিসার ইনচার্জকে (ওসি) ফোন করেন এবং নিজের নিরাপত্তার জন্য ফেসবুকে একটি লাইভ পোস্ট দিয়ে সবার সহযোগিতা চান। এই খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে এলাকার অন্তত ১৫০ থেকে ২০০ জন সাধারণ মানুষ ইয়ামিনকে উদ্ধারের জন্য এগিয়ে আসেন। লোকজনের জমায়েত দেখে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে বুঝতে পেরে অভিযুক্তরা একটি অটোভ্যানে করে দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়। স্থানীয়রা বলছেন, এই সন্ত্রাসীরা এলাকায় এতটাই বেপরোয়া যে তারা ৯৫% মানুষকে সবসময় আতঙ্কে রাখে। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং সাংবাদিক ইয়ামিনকে আশ্বস্ত করে।

এই ঘটনার প্রতিবাদে সাঘাটার রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গন উত্তাল হয়ে উঠেছে। সাঘাটা উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব সেলিম আহমেদ তুলিপ এবং জামায়াত নেতা মাহবুব আলম পৃথক বিবৃতিতে এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তারা বলেন, সাংবাদিকদের কলম যদি এভাবে রুদ্ধ করার চেষ্টা করা হয়, তবে সমাজ অপরাধীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হবে। তারা অবিলম্বে দোষীদের গ্রেফতার করে ১০০% শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। এছাড়া ভরতখালী ইউনিয়ন পরিষদের জনপ্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, এলাকায় কিশোর গ্যাং ও মাদক কারবারিদের কোনো স্থান নেই। তারা প্রশাসনের কাছে মাদক কারবারিদের একটি তালিকা তৈরি করে চিরুনি অভিযান চালানোর আহ্বান জানিয়েছেন।

সাঘাটা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মাহবুব আলম এই বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। তিনি সাংবাদিকদের জানান, “আমরা লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। স্বাধীন সাংবাদিকতায় বাধা দেওয়া এবং কাউকে হত্যার হুমকি দেওয়া একটি গুরুতর অপরাধ। অপরাধী যে দলের বা যে মতেরই হোক না কেন, আইন অনুযায়ী তাদের বিচার হবে। ইতিমধ্যে আমাদের টিম অভিযুক্তদের ধরতে মাঠে নেমেছে।” পুলিশের তথ্যমতে, সাঘাটায় গত তিন মাসে মাদক সংক্রান্ত মামলার হার আগের চেয়ে ১৫% বেড়েছে, যা প্রমাণ করে যে অপরাধীরা এখন প্রশাসনের কড়া নজরে আছে।

ভুক্তভোগী সাংবাদিক ইয়ামিন হাসান বর্তমানে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। তিনি বলেন, “আমি শুধু সমাজের অন্ধকার দিকগুলো তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। আমি কোনো ব্যক্তিগত শত্রুতায় এই খবর লিখিনি। কিন্তু আজ আমার পরিবার এবং আমার জীবন হুমকির মুখে। আমি চাই প্রশাসন দ্রুত এই সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার করুক যাতে অন্য কোনো সাংবাদিককে এমন পরিস্থিতির শিকার হতে না হয়।” ইয়ামিনের এই লড়াইয়ে সাঘাটা ও গাইবান্ধার সাংবাদিক সমাজ একাত্মতা ঘোষণা করেছে। তারা হুমকি দিয়েছেন যে, আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সন্ত্রাসীদের ধরা না হলে তারা কঠোর কর্মসূচি দিতে বাধ্য হবেন।

বর্তমানে সাঘাটার সচেতন মহলের দাবি, শুধু একটি অভিযোগ বা হুমকি নয়, বরং এই কিশোর গ্যাং ও মাদক সিন্ডিকেটের শেকড় উপড়ে ফেলতে হবে। এলাকার প্রায় ৮০% মানুষের ধারণা, রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকার কারণেই এই যুবকরা এতোটা সাহসী হয়ে উঠেছে। সাংবাদিক ইয়ামিনকে দেওয়া এই হুমকি আসলে পুরো সমাজকে দেওয়ার হুমকি হিসেবে দেখছেন সাধারণ মানুষ। এখন সবার নজর প্রশাসনের দিকে—তারা কি পারবেন এই চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের আইনের আওতায় এনে সাংবাদিকতা ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে?

সম্পর্কিত নিবন্ধ