ঝিনাইদহের ঐতিহ্যবাহী মেলা ঘিরে মানুষের ব্যাপক উৎসাহ

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

মেলা মানেই আনন্দ, মেলা মানেই উৎসব আর কোলাহল। বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সাথে মেলা শব্দটি খুব গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উর্বর ও শান্ত জেলা ঝিনাইদহও এর ব্যতিক্রম নয়। নদী-নালা, খাল-বিল আর সবুজে ঘেরা এই জনপদে বছর জুড়েই নানা পার্বণ ও উৎসব লেগেই থাকে। তবে ঝিনাইদহের ঐতিহ্যবাহী মেলাগুলোর আবেদন যেন অন্য সব কিছুর চেয়ে একটু আলাদা। বৈশাখী মেলা, পৌষ মেলা, চড়ক পূজা কিংবা লালন স্মরণোৎসব ঘিরে আয়োজিত মেলায় এই এলাকার মানুষের যে বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস দেখা যায়, তা সত্যিই চোখে পড়ার মতো। আধুনিকতার এই যুগেও মেলার দিনগুলোতে শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধ—সব বয়সী মানুষের পদচারণায় মুখরিত হয়ে ওঠে মেলার প্রাঙ্গণ। ঝিনাইদহের এই মেলাগুলো শুধু কেনাকাটা বা ঘোরাঘুরির জায়গা নয়, বরং এটি মানুষের শেকড়ের টান আর গ্রামীণ সম্প্রীতির এক অনন্য উদাহরণ।

গ্রামীণ সংস্কৃতির এক মিলনমেলা

মেলা হলো মানুষের সাথে মানুষের প্রাণের মিলনের জায়গা। ঝিনাইদহের এই মেলাগুলোতে প্রতিদিনের যান্ত্রিক ও ব্যস্ত জীবনের বাইরে এসে গ্রামের মানুষ এক জায়গায় মিলিত হন। দীর্ঘদিন পর আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ও পরিচিত মানুষদের সাথে দেখা হওয়ার একটি চমৎকার সুযোগ তৈরি হয় মেলার মাধ্যমে। হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান—সব ধর্মের মানুষ নিজেদের মধ্যে ভেদাভেদ ভুলে এক কাতারে শামিল হন এই উৎসবের আনন্দে। এই অসাম্প্রদায়িক চেতনাই আমাদের গ্রামীণ সংস্কৃতির মূল সৌন্দর্য। মেলার মাঠে যখন দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এসে জড়ো হয়, তখন পুরো এলাকা যেন এক টুকরো উৎসবের নগরীতে পরিণত হয়। মেলার কোলাহল আর মানুষের হাসিমুখ গ্রামীণ জীবনকে এক নতুন প্রাণশক্তি এনে দেয়।

ADVERTISEMENT
3rd party Ad. Not an offer or recommendation by hardwareanalytic.com.

কুটির শিল্প ও মৃৎশিল্পের প্রদর্শনী

মেলার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো হস্তশিল্প বা কুটির শিল্পের নানা জিনিসপত্র। ঝিনাইদহের মেলাগুলোতে মাটির তৈরি হাঁড়ি-পাতিল, পুতুল, মাটির ব্যাংক, ফুলদানি থেকে শুরু করে বাঁশ ও বেতের তৈরি নানা ধরনের শৌখিন জিনিসপত্রের পসরা সাজিয়ে বসেন দোকানিরা। আধুনিক প্লাস্টিক আর অ্যালুমিনিয়ামের ভিড়ে মাটির জিনিসপত্রের কদর যখন কমতে বসেছে, ঠিক তখন এই মেলাগুলো মৃৎশিল্পীদের জন্য এক বিশাল আশীর্বাদ হয়ে আসে। গ্রামের সাধারণ কারিগররা তাদের নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় তৈরি করা এসব পণ্য সরাসরি ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করে আর্থিকভাবে লাভবান হন। পাশাপাশি, শহরের মানুষও এসব ঐতিহ্যবাহী জিনিস কিনে বাড়ির শোভা বাড়ান, যার ফলে আমাদের হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্য নতুন করে প্রাণ ফিরে পায়।

নাগরদোলা ও বিনোদনের নানা আয়োজন

মেলা মানেই শিশুদের কাছে এক রঙিন ও জাদুকরী পৃথিবী। আর এই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো নাগরদোলা। কাঠের তৈরি বিশাল সেই নাগরদোলায় চড়ার জন্য শিশু-কিশোরদের যে আনন্দ আর হুড়োহুড়ি দেখা যায়, তা সত্যিই ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। নাগরদোলার পাশাপাশি মেলায় থাকে চরকি, পুতুল নাচ, সার্কাস এবং বায়োস্কোপের মতো আয়োজন। যদিও আজকাল ইন্টারনেটের যুগে বায়োস্কোপ বা পুতুল নাচের দেখা খুব একটা পাওয়া যায় না, তবুও ঝিনাইদহের মেলাগুলোতে আয়োজকরা চেষ্টা করেন পুরোনো এই বিনোদনগুলোকে টিকিয়ে রাখতে। শিশুদের পাশাপাশি বড়রাও মেলায় এসে ক্ষণিকের জন্য ফিরে যান তাদের শৈশবের সেই সোনালি ও বাঁধনহারা দিনগুলোতে।

ADVERTISEMENT
3rd party Ad. Not an offer or recommendation by hardwareanalytic.com.

মুখরোচক গ্রামীণ খাবার ও মিষ্টির পসরা

মেলার মাঠে ঢুকলেই ম ম করে ভাজা-পোড়া আর মিষ্টির সুবাস। ঝিনাইদহের মেলায় খাবারের দোকানগুলোতে সবসময় উপচে পড়া ভিড় থাকে। গরম গরম জিলাপি, রসগোল্লা, মুরালি, বাতাসা, কদমা, খাজা আর নিমকি ছাড়া যেন মেলা একেবারেই অসম্পূর্ণ। এছাড়া চটপটি, ফুচকা, হাওয়াই মিঠাই এবং ঝালমুড়ির দোকানে কিশোর-কিশোরীদের আড্ডা জমে ওঠে দারুণভাবে। বিশেষ করে মেলার বড় বড় জিলাপি বা কদমা কিনে বাড়ির বয়োজ্যেষ্ঠ ও শিশুদের জন্য নিয়ে যাওয়া এখানকার মানুষের একটা অলিখিত নিয়ম। গ্রামের সাধারণ মানুষ, যারা সারা বছর খুব একটা ভিন্ন ধরনের খাবার খাওয়ার সুযোগ পান না, তাদের জন্য মেলার এই খাবারগুলো এক অন্যরকম তৃপ্তি ও আনন্দের উৎস।

ডিজিটাল যুগেও ঐতিহ্যের অমলিন আবেদন

আমরা এখন বাস করছি স্মার্টফোন আর ইন্টারনেটের এক গতির যুগে। মানুষের বিনোদনের ধরন পাল্টে গেছে; চাইলেই হাতের মুঠোয় গোটা বিশ্বকে দেখা যায়। অনেকেই হয়তো ভাবেন, এই ডিজিটাল যুগে এসে মানুষ কি আর আগের মতো ধুলোমাখা মেলায় যায়? কিন্তু ঝিনাইদহের এই ঐতিহ্যবাহী মেলার চিত্র দেখলে সেই ধারণা পুরোপুরি পাল্টে যাবে। এখনো মেলার দিনগুলোতে ফেসবুক বা ইউটিউব ছেড়ে মানুষ ছুটে যায় মেলার মাঠে। কারণ, মেলায় যে মাটির গন্ধ আছে, যে মানুষের কোলাহল আর প্রাণের স্পন্দন আছে—তা কোনো ডিজিটাল স্ক্রিনে পাওয়া সম্ভব নয়। এই মেলাগুলো বারবার প্রমাণ করে যে, প্রযুক্তির যতই প্রসার ঘটুক না কেন, বাঙালির রক্তের সাথে মিশে থাকা ঐতিহ্য কখনো মুছে যাওয়ার নয়।

গ্রামীণ অর্থনীতিতে মেলার ইতিবাচক প্রভাব

শুধু বিনোদন বা ঘোরাঘুরি নয়, এই মেলাগুলোর একটি বিশাল অর্থনৈতিক গুরুত্বও রয়েছে। ঝিনাইদহের মেলাগুলোতে কয়েকশ ছোট-বড় দোকান বসে। গ্রামের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, কারিগর এবং কৃষকরা তাদের উৎপাদিত পণ্য এখানে নিয়ে আসেন। অনেক নারী উদ্যোক্তাও এখন ঘরে তৈরি নকশীকাঁথা, শীতের পিঠা, হাতের কাজের পোশাক বা খাবারের দোকান নিয়ে মেলায় অংশগ্রহণ করেন। মেলার এই কয়েকটা দিনের বেচাকেনা দিয়ে অনেক সাধারণ পরিবারের সারা মাসের খরচ, এমনকি ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার টাকাও জোগাড় হয়ে যায়। তাই বলা যায়, এই মেলাগুলো স্থানীয় গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের স্বাবলম্বী করতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

ADVERTISEMENT
3rd party Ad. Not an offer or recommendation by dailyalo.com.

উপসংহার

ঝিনাইদহের ঐতিহ্যবাহী মেলাগুলো শুধু এক বা দুই দিনের কোনো সাধারণ আনন্দ-উৎসব নয়, এটি আমাদের শেকড় ও সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। দৈনন্দিন জীবনের ক্লান্তি ও একঘেয়েমি দূর করে মানুষের মনে নতুন করে বাঁচার প্রেরণা জোগায় এই মেলা। তবে একটু দুঃখের বিষয় হলো, সঠিক পৃষ্ঠপোষকতার অভাব এবং কখনো কখনো খোলা বড় মাঠের অভাবে অনেক মেলাই এখন আগের সেই জৌলুস হারাতে বসেছে। আমাদের গ্রামীণ ঐতিহ্যকে বাঁচাতে হলে এই মেলাগুলোকে টিকিয়ে রাখা অত্যন্ত জরুরি। স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি এবং সমাজের বিত্তবান মানুষদের উচিত মেলার আয়োজনে সব ধরনের সার্বিক সহযোগিতা করা। মেলার মাঠে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ও সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে ঝিনাইদহের এই ঐতিহ্যবাহী মেলাগুলো যুগ যুগ ধরে মানুষের মনে এভাবেই আনন্দের আলো ছড়িয়ে যাবে এবং আমাদের সংস্কৃতি সগৌরবে টিকে থাকবে।



সম্পর্কিত নিবন্ধ