খাগড়াছড়ির দীঘিনালায় পাহাড়ি ও বাঙালি তরুণ-তরুণীদের স্বাবলম্বী করতে তিন সপ্তাহব্যাপী বাস্তবমুখী কারিগরি প্রশিক্ষণ কোর্স শেষ হয়েছে। সফলভাবে কোর্স সম্পন্ন করায় ৩৬ জন শিক্ষার্থীর হাতে আনুষ্ঠানিক সনদপত্র তুলে দিয়েছে দীঘিনালা সেনা জোন। বৃহস্পতিবার সকালে দীঘিনালা সরকারি পলিটেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ মিলনায়তনে এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই শিক্ষার্থীদের হাতে সনদ তুলে দেওয়া হয়। প্রত্যন্ত পাহাড়ি জনপদে আধুনিক কারিগরি দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পেয়ে প্রশিক্ষণার্থীরা অত্যন্ত আনন্দ ও উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন।
দীঘিনালা জোনের উদ্যোগে এবং জোন কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. আল-আমিন এসইউপি, পিএসসির সার্বিক নির্দেশনায় এই ব্যতিক্রমী কোর্সের আয়োজন করা হয়। প্রশিক্ষণে মেকানিক্যাল ও ইলেকট্রিক্যাল এই দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে দীর্ঘ ২১ দিন প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। প্রতিদিনের বাস্তবভিত্তিক ক্লাসগুলোর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা বৈদ্যুতিক ওয়্যারিং, মোটর মেরামত এবং বিভিন্ন আধুনিক যন্ত্রাংশ পরিচালনার খুঁটিনাটি খুব সহজভাবে শিখেছেন। পাহাড়ি ও বাঙালি শিক্ষার্থীরা একসঙ্গে কাজ করায় এলাকায় সামাজিক সম্প্রীতিও বেশ জোরদার হয়েছে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে শিক্ষার্থীদের মাঝে সনদপত্র বিতরণ করেন দীঘিনালা জোনের অ্যাডজুটেন্ট ক্যাপ্টেন মো. জাহিদ হাসান জয়। এ সময় তিনি বলেন, শুধু পুঁথিগত বিদ্যা নিয়ে বসে থাকলে চলবে না, বর্তমান যুগে টিকে থাকতে হলে কারিগরি জ্ঞানের কোনো বিকল্প নেই। পাহাড়ি অঞ্চলের তরুণরা যেন নিজেরাই ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হতে পারে, সে লক্ষ্যেই সেনাবাহিনী এই সুযোগ তৈরি করেছে। তিনি নিশ্চিত করেন যে, সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে সেনাবাহিনীর এই বাস্তবমুখী ও কল্যাণমূলক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম আগামী দিনগুলোতেও নিয়মিতভাবে চালু থাকবে।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন দীঘিনালা সরকারি পলিটেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের কারিগরি শিক্ষক মো. রুবেল আহমেদ এবং দীঘিনালা কাঠ ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মো. শরিফুল ইসলাম। এছাড়া অনুষ্ঠানে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি, কাঠ ব্যবসায়ী সমিতির সদস্য মোহাম্মদ আনোয়ার এবং কর্মরত সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন। বক্তারা উল্লেখ করেন, বর্তমানে কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিতদের কর্মসংস্থানের হার সাধারণ শিক্ষার চেয়ে প্রায় ৭০% থেকে ৮০% বেশি। দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে পারলে স্থানীয় বেকারত্ব দ্রুত দূর করা সম্ভব হবে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কারিগরি কাজে পারদর্শী তরুণরা দেশে কাজের সুযোগ পাওয়ার পাশাপাশি বিদেশে গিয়েও প্রচুর আয় করতে পারেন। মধ্যপ্রাচ্য কিংবা ইউরোপের বিভিন্ন দেশে একজন দক্ষ টেকনিশিয়ান প্রতি মাসে গড়ে ৮০০ থেকে ১,০০০ ডলার ($) বা তারও বেশি আয় করেন। ফলে এ ধরনের তৃণমূল পর্যায়ের প্রশিক্ষণ তরুণদের বৈশ্বিক শ্রমবাজারে প্রবেশের বড় পথ খুলে দেয়। সেনাবাহিনী তরুণদের সম্পূর্ণ বিনামূল্যে এই প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ১০০% ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে বলে স্থানীয়রা মনে করছেন।
সনদ পেয়ে কয়েকজন পাহাড়ি ও বাঙালি শিক্ষার্থী জানান, এই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের আত্মবিশ্বাস অনেক বেড়ে গেছে। আগে যেখানে কাজের অভাবে অলস সময় কাটাতে হতো, এখন তারা নিজেরা ছোটখাটো সার্ভিসিংয়ের দোকান দিয়ে আয়ের পথ তৈরি করতে পারবেন। শিক্ষার্থীরা বলেন, এই সার্টিফিকেট তাদের চাকরি পাওয়ার পথ অনেক সহজ করবে। নিজেদের জীবনযাত্রার মান বদলানোর এমন সুযোগ করে দেওয়ার জন্য তারা দীঘিনালা সেনা জোন এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত সকল কর্মকর্তার প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানান।
পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি, সম্প্রীতি ও উন্নয়ন বজায় রাখতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে যাচ্ছে। দীঘিনালার এই উদ্যোগ প্রমাণ করে যে, অস্ত্র নয় বরং দক্ষতাই পারে পিছিয়ে পড়া জনপদের ভাগ্যোন্নয়ন ঘটাতে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, এ ধরনের কর্মমুখী উদ্যোগ পাহাড়ের তরুণদের অপরাধমূলক পথ থেকে ফিরিয়ে আলোর দিশা দেখাবে। পাহাড়ি ও বাঙালি তরুণেরা নিজেদের দক্ষ কারিগর হিসেবে গড়ে তুলে দেশকে অর্থনৈতিকভাবে আরও শক্তিশালী করবেন এমনটাই এখন এলাকার সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা।
















