পুঠিয়ায় বিদ্যালয়ে তালা দিয়ে মাঠে কলাগাছ লাগালেন দাতা সদস্য: পুত্রবধূর চাকরির দাবিতে তুলকালাম

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলায় পুত্রবধূকে চাকরি না দেওয়া এবং নাম পরিবর্তনের অভিযোগ তুলে একটি বিদ্যালয়ের মাঠে কলাগাছ লাগিয়েছেন ব্যবস্থাপনা কমিটির সাবেক এক দাতা সদস্য। শুধু কলাগাছ রোপণ করেই তিনি ক্ষান্ত হননি, শিক্ষকদের কার্যালয়ে নতুন তালা ঝুলিয়ে দিয়েছেন এবং বাঁশের বেড়া দিয়ে বন্ধ করে দিয়েছেন বিদ্যালয়ের প্রধান ফটক। শনিবার (সাপ্তাহিক ছুটির দিন) দুপুরে উপজেলার ভালুকগাছি মুক্তিযোদ্ধা স্কুলে এই ঘটনা ঘটে। তবে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক স্পষ্ট জানিয়েছেন, ওই দাতা সদস্যের দুই পুত্রবধূকেই চাকরি দেওয়া হয়েছিল, তবুও তিনি অযৌক্তিক কারণে এ কাণ্ড ঘটিয়েছেন।

বিদ্যালয় প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ২০১৫ সালে ‘মুক্তিযোদ্ধা টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ’ নামে প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু হয়। প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত চালুর পরিকল্পনা থাকলেও অনুমোদন মেলে কেবল প্রাথমিকে। পরে দেশের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষিতে রাজশাহী শিক্ষা বোর্ড প্রতিষ্ঠানটির নাম পরিবর্তনের নির্দেশ দেয়। তখন ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় সর্বসম্মতিক্রমে নাম রাখা হয় ‘ভালুকগাছি মুক্তিযোদ্ধা স্কুল’। বিস্ময়কর বিষয় হলো, কমিটির রেজুলেশনে দেখা যায় সাবেক দাতা সদস্য আজাদ আলী নিজেই এই নতুন নামের প্রস্তাব দিয়েছিলেন।

প্রতিষ্ঠানটি ২০২৪ সালের ১১ ডিসেম্বর অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদানের আনুষ্ঠানিক অনুমতি পায়, যদিও এখনো তা এমপিওভুক্ত হয়নি। বর্তমানে সেখানে প্রাথমিক শাখার পাশাপাশি ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণিতে নিয়মিত পাঠদান চলছে। স্থানীয় এক দোকানি জানান, আজাদ আলীর করা মামলার কারণে শিক্ষার্থীর সংখ্যা আগের চেয়ে প্রায় ৫০% কমে গেছে। তবুও শিক্ষকেরা কষ্ট করে পাঠদান চালিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু শনিবার হঠাৎ বাঁশের বেড়া দেওয়ায় সাধারণ মানুষ এমনকি বিদ্যালয়ের নলকূপ থেকেও খাবার পানি সংগ্রহ করতে পারছেন না। এতে আশপাশের বাসিন্দাদের প্রায় ৮০% চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন।

এদিকে অভিযুক্ত দাতা সদস্য আজাদ আলীর দাবি, তিনি টেকনিক্যাল কলেজ করার জন্য জমি দান করেছিলেন। শর্ত ছিল সেখানে তাঁর ছেলে ও ছেলের বউকে চাকরি দিতে হবে। কিন্তু কর্তৃপক্ষ টেকনিক্যাল কলেজ করতে পারেনি এবং তাঁর বর্তমান ছেলের বউকেও কোনো চাকরি দেয়নি। নিজের দাবির প্রতি শতভাগ অনড় থেকে তিনি বলেন, প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করায় তিনি কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে দিয়েছেন এবং মাঠে কলাগাছ রোপণ করেছেন।

আজাদ আলীর অভিযোগ পুরোপুরি নাকচ করে প্রধান শিক্ষক সেলিম রেজা জানান, আজাদ আলী প্রথমে ৩০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে নিঃশর্ত জমি দানের অঙ্গীকার করেছিলেন। কিন্তু স্থাপনা ওঠার পর জমি রেজিস্ট্রির সময় তিনি ছেলেকে ভোকেশনাল শাখায় এবং পুত্রবধূকে কলেজ শাখায় চাকরির দাবি তোলেন। কমিটি বাধ্য হয়ে তাতে রাজি হয়। কলেজ শাখা চালু হতে দেরি হওয়ায় তাঁর প্রথম পুত্রবধূকে প্রাথমিকে সহকারী শিক্ষক করা হয়। দুর্ভাগ্যবশত ২০২২ সালে তিনি মারা যান। এরপর ছেলে আবার বিয়ে করলে আজাদ আলী দ্বিতীয় স্ত্রীর জন্যও কেরানি পদের চাকরি দাবি করেন। কমিটি রেজুলেশন করে সেই দাবিও মেনে নেয়। অথচ এসবের পরও তিনি ২০২৫ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর আদালতে মিথ্যা মামলা ঠুকে দেন।

বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ও ভালুকগাছি ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. তৌহিদুল ইসলাম বলেন, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এক দিনে দাঁড়ায় না। আজাদ আলীর অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। গত মাসের ১০ তারিখে রাজশাহী শিক্ষা বোর্ড নতুন কমিটির অনুমোদন দিয়েছে এবং শিক্ষাকার্যক্রম পুরোদমে সচল রয়েছে। এলাকার সচেতন মানুষ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলছেন, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো যেখানে বাংলাদেশে শিক্ষার প্রসারে হাজার হাজার $ (মার্কিন ডলার) ব্যয় করছে, সেখানে নিছক পারিবারিক স্বার্থে গ্রামীণ একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়া কোনোভাবেই মানা যায় না।

এ বিষয়ে পুঠিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) লিয়াকত সালমান জানান, বিষয়টি তাঁর নজরে এসেছে। তিনি বর্তমানে দাপ্তরিক কাজে ঢাকায় অবস্থান করছেন। তবে তিনি দৃঢ়ভাবে বলেন, পেছনে যে ঘটনাই থাকুক না কেন, শিক্ষার্থী থাকলে কোনো ব্যক্তি স্কুল বন্ধ করতে পারবেন না। রবিবার পুঠিয়ায় ফিরেই তিনি প্রশাসনের পক্ষ থেকে তালা ও বেড়া অপসারণ করে বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনবেন। তিনি স্পষ্ট করেন, কোনো অবস্থাতেই কোমলমতি শিশুদের লেখাপড়া ব্যাহত করতে দেওয়া হবে না এবং দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ