টানা দুই দশকেরও বেশি সময় অবস্থানের পর ইরাক থেকে নিজেদের সব সেনা পুরোপুরি প্রত্যাহার করে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। গতকাল মঙ্গলবার মধ্যপ্রাচ্যের দেশটি ছেড়েছেন সেখানে অবস্থান করা শেষ মার্কিন সেনাসদস্যরা। নির্ধারিত সময়ের এক দিন আগেই ইরাক প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশটির মাটিতে এখন আর কোনো বিদেশি সেনা নেই। এর মধ্য দিয়ে ইরাক এক নতুন যুগে পা রাখল বলে দাবি করেছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জাইদি। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, এখন থেকে নিজেদের ১০০% সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা নিজেদের হাতেই রক্ষা করবে বাগদাদ।
২০০৩ সালে গণবিধ্বংসী অস্ত্রের খোঁজে ইরাকে আগ্রাসন চালায় মার্কিন বাহিনী। ক্ষমতাচ্যুত হন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন, যাকে ২০০৬ সালের ডিসেম্বরে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়। ওই যুদ্ধের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের খরচ হয় প্রায় ৮০০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি ($৮০০ বিলিয়ন)। ২০০৭ সালে ইরাকে মোতায়েন করা মার্কিন সেনার সংখ্যা ১ লাখ ৭০ হাজার ছাড়িয়ে গিয়েছিল। ২০১১ সালে বারাক ওবামা সেনা প্রত্যাহার শুরু করলেও ২০১৪ সালে জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটের (আইএস) উত্থান ঠেকাতে আবারও সেখানে সেনা পাঠাতে হয়। পরবর্তীতে ২০২৪ সালে জো বাইডেনের প্রশাসন ইরাক থেকে অবশিষ্ট প্রায় ২,৫০০ সেনা পুরোপুরি প্রত্যাহারের রূপরেখা চূড়ান্ত করে।
গত বছরের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যেই মূল ভূখণ্ডের প্রায় ৮০% মার্কিন সেনা নিজ দেশে ফিরে যান। শুধু আধা স্বায়ত্তশাসিত কুর্দি অঞ্চলে শেষ ভরসা হিসেবে কিছু সেনাসদস্য মোতায়েন ছিলেন। বুধবারের মধ্যে তাঁদেরও ইরাক ছাড়ার সময়সীমা বাঁধা ছিল। তবে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই নির্ধারিত সময়ের ২৪ ঘণ্টা আগেই বিদায় নেন তাঁরা। ইরাকের প্রতিরক্ষা মুখপাত্র নিশ্চিত করেছেন, এখন দেশের সামরিক ঘাঁটি ও ক্যাম্পগুলোর নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি ইরাকি বাহিনীর হাতে রয়েছে।
মার্কিন বাহিনীর এই বিদায়ে ইরাকিদের মনে যেমন স্বস্তি ফিরেছে, তেমনি তৈরি হয়েছে নতুন এক ভীতি। সাধারণ ইরাকিদের একটি বড় অংশ বিদেশি সেনামুক্ত স্বাধীন দেশের স্বপ্ন দেখলেও নিরাপত্তা নিয়ে সংশয় কাটছে না অনেকের। ফালুজার উপজাতীয় নেতা আবদুল রহমান আল-জোবাইর স্পষ্ট ভাষায় সতর্ক করে বলেন, ইরাকি বাহিনী এখনো একা পুরো দেশের পূর্ণ নিরাপত্তা সামলাতে প্রস্তুত নয়। তাঁর মতে, মার্কিন সেনারা চলে যাওয়ায় যে বড় নিরাপত্তা শূন্যতা তৈরি হলো, তা সামাল দেওয়া সহজ হবে না। এতে আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে উগ্রবাদী নানা পক্ষ।
অন্যদিকে মার্কিন বাহিনীর বিদায়ে সবচেয়ে বেশি উল্লাস প্রকাশ করছে ইরাকে সক্রিয় ইরানপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো। তেহরান–সমর্থিত ইসলামিক রেজিস্ট্যান্সের কমান্ডার আবু মোজতাবা আল-ইয়াসিরি এই ঘটনাকে দখলদারদের বিরুদ্ধে এক ‘ঐতিহাসিক জয়’ হিসেবে ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেন, এর মধ্য দিয়ে ইরাকের ইতিহাসের এক কালো অধ্যায়ের সমাপ্তি হলো। তবে বিশ্লেষকদের বড় শঙ্কা এখানেই। কারণ ইরাকে মার্কিন সেনাদের অনুপস্থিতি তেহরানের জন্য বড় এক সুযোগের দরজা খুলে দিল। ইরানঘনিষ্ঠ মিলিশিয়ারা এখন ইরাকের প্রশাসনিক ও সামরিক পরিসরে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করতে পারে।
সাম্প্রতিক সময়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের টানাপোড়েনের বলি হয়েছে খোদ ইরাক। চলমান সংঘাতে যে ১৮ জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন, তাঁদের মধ্যে প্রায় ৪০% বা ৭ জনই ইরাকের মাটিতে প্রাণ হারান। চলতি মাসেই ইরাক থেকে ড্রোন হামলা চালিয়ে সৌদি আরবের একটি গুরুত্বপূর্ণ তেলের পাইপলাইনে আঘাত করা হয়। এসব হামলায় সরাসরি ভূমিকা ছিল স্থানীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর। ফলে মার্কিন ছাতা সরে যাওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে ক্ষমতার ভারসাম্য এখন সরাসরি ইরানের দিকে হেলে পড়ার বড় আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ইরাকি নিরাপত্তা বিশ্লেষক জাসিম আল-বাহাদলি মনে করেন, কৌশলগতভাবে এই বিদায়ে সবচেয়ে লাভবান হলো তেহরান। বহু বছর ধরে মার্কিন বাহিনী ইরাকে ইরানের একচেটিয়া প্রভাব আটকে রাখার ঢাল হিসেবে কাজ করেছে। সেই ভারসাম্য এখন পুরোপুরি ভেঙে পড়ল। রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, হাজার হাজার সাধারণ মানুষের প্রাণহানি এবং বিলিয়ন ডলার খরচের পর ইরাক এখন দাঁড়িয়ে আছে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে। একদিকে সম্পূর্ণ সার্বভৌম রাষ্ট্র গড়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ মিলিশিয়া ও আঞ্চলিক পরাশক্তিগুলোর টানাটানি এই দুইয়ের দোলাচলেই নির্ধারণ হবে ইরাকের ভবিষ্যৎ।















