ঝিনাইদহের শৈলকুপা পৌর এলাকায় এক বিশেষ মাদকবিরোধী অভিযান চালিয়ে ১০০ গ্রাম গাঁজাসহ দুই কারবারিকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। শুক্রবার (২ অক্টোবর ২০২৬) সন্ধ্যা পৌনে সাতটার দিকে পৌরসভার কবিরপুর গ্রামের একটি মুদি দোকানের সামনের পাকা রাস্তা থেকে তাদের আটক করা হয়। গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিরা হলেন শৈলকুপার হাবিবপুর গ্রামের রাজু বিশ্বাসের ছেলে মো. সম্রাট বিশ্বাস (২৫) এবং একই উপজেলার কবিরপুর গ্রামের মনোরঞ্জন দাসের ছেলে বিকাশ দাস (৩৮)। আটকের পর পুলিশ স্থানীয় লোকজনের উপস্থিতিতে তাদের দেহ তল্লাশি করে বিশেষ কৌশলে প্যান্টের পকেটে রাখা পলিথিনের প্যাকেট থেকে ৫০ গ্রাম করে মোট ১০০ গ্রাম গাঁজা উদ্ধার করে।
অভিযানের সত্যতা নিশ্চিত করে থানা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, শৈলকুপা থানা পুলিশের একটি দল নিয়মিত টহল ও নজরদারির অংশ হিসেবে পৌরসভা এলাকায় দায়িত্ব পালন করছিল। এ সময় তাদের কাছে নির্ভরযোগ্য গোপন খবর আসে যে কবিরপুর এলাকায় রাস্তার ওপর প্রকাশ্যে মাদক কেনাবেচার তোড়জোড় চলছে। এই সংবাদের ভিত্তিতে সন্ধ্যা ৬টা ৪৫ মিনিটের দিকে পুলিশের দল কবিরপুর গ্রামের গৌরি মণ্ডলের মুদি দোকানের সামনে পাকা রাস্তায় পৌঁছায়। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে দুই ব্যক্তি সেখান থেকে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করে। তবে চৌকস পুলিশ সদস্যরা চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলে তাদের জাপটে ধরেন। পরে নিরপেক্ষ সাক্ষীদের উপস্থিতিতে তল্লাশি চালিয়ে দুইজনের কাছ থেকে ৫০ গ্রাম করে দুটি প্যাকেটে মোট ১০০ গ্রাম গাঁজা উদ্ধার করা হয়।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আটক ব্যক্তিরা স্বীকার করেছে, তারা দীর্ঘদিন ধরে নিজ এলাকাসহ আশপাশের গ্রামগুলোতে নিয়মিত মাদক ব্যবসা চালিয়ে আসছিল। বিশেষ করে স্কুল-কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থী ও উঠতি বয়সী তরুণদের নিশানা বানিয়ে তারা এই গাঁজার ব্যবসা করত। উদ্ধার হওয়া এই মাদকের বর্তমান খুচরা বাজারমূল্য বেশ কয়েক হাজার টাকা। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে এর মূল্য প্রায় $৩৫ থেকে $৫০ ডলারের কাছাকাছি। চোরাকারবারিরা অত্যন্ত কম পুঁজিতে সীমান্ত এলাকা থেকে এসব মাদক কিনে আনে এবং গ্রামে গ্রামে ছোট ছোট পুরিয়া বানিয়ে প্রায় দ্বিগুণ বা তিনগুণ দামে বিক্রি করে দ্রুত অবৈধ অর্থ কামানোর চেষ্টা করছিল বলে তথ্য পাওয়া গেছে।
শৈলকুপাসহ ঝিনাইদহের বিভিন্ন অঞ্চলে সাম্প্রতিক সময়ে মাদকের বিস্তার সাধারণ মানুষের জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয় সমাজকর্মীদের হিসাবে, পাড়া-মহল্লায় ঘটা অপরাধের প্রায় ৭৫% থেকে ৮০% মূলত মাদকাসক্তির সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে জড়িত। মাদক কেনার টাকার জোগান দিতে গিয়ে অনেক কিশোর ও যুবক পরিবারে চরম অশান্তি সৃষ্টি করছে, এমনকি চুরি ও ছিনতাইয়ের মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর বিভিন্ন নির্জন সড়ক ও বাজারের অলিগলিতে মাদকসেবীদের আনাগোনা বেড়ে যায়। এই অবস্থায় পুলিশের এমন সময়োপযোগী পদক্ষেপে স্থানীয়দের মনে কিছুটা হলেও স্বস্তি ফিরেছে।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে শৈলকুপা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হুমায়ূন কবির মোল্লা গণমাধ্যমকর্মীদের বলেন, সমাজ থেকে মাদক পুরোপুরি দূর করতে এবং অপরাধমুক্ত ঝিনাইদহ গড়তে জেলা পুলিশ সর্বোচ্চ আন্তরিকতা দিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে শৈলকুপা থানা এলাকায় পুলিশের নজরদারি আগের তুলনায় অন্তত ৪০% বৃদ্ধি করা হয়েছে। তিনি আরও স্পষ্ট করে জানান, আটক দুই মাদক কারবারির বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় শৈলকুপা থানায় একটি নিয়মিত মামলা দায়ের করা হয়েছে। শনিবার সকালে তাদেরকে আদালতে পাঠানো হবে। মাদকের কারবারে যারাই জড়িত থাকুক, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে কবিরপুর ও হাবিবপুর এলাকায় মাদকবিরোধী এই সফল অভিযানের পর সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। স্থানীয় অভিভাবক ও বিশিষ্ট নাগরিকরা দাবি তুলেছেন, শুধু খুচরা বিক্রেতা নয়, বরং এর পেছনের গডফাদারদেরও দ্রুত চিহ্নিত করে আইনের মুখোমুখি করতে হবে। এলাকার তরুণ ও ১০০% যুবসমাজকে মাদকমুক্ত রাখতে পরিবারের নজরদারির পাশাপাশি সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার ওপরও তারা জোর দেন। শৈলকুপা থানা পুলিশ জানিয়েছে, মাদক নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত পৌরসভাসহ প্রতিটি ইউনিয়নে এই বিশেষ অভিযান দিনরাত সমানে চলবে এবং অপরাধীদের কোনো প্রকার ছাড় দেওয়া হবে না।
















