এক কাপ কফির দীর্ঘ পথ এবং কৃষকের বঞ্চনার গল্প

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

সকালে ঘুম ভাঙার পর ধোঁয়া ওঠা এক কাপ গরম কফি আমাদের অনেকের দিনটি সতেজ করে দেয়। কিন্তু এই এক পেয়ালা কফির পেছনের গল্পটি বেশ দীর্ঘ ও চমকপ্রদ। আজ ১ অক্টোবর বিশ্বজুড়ে আন্তর্জাতিক কফি দিবস পালিত হচ্ছে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ২০২৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর গৃহীত ৮০/২৪৮ নম্বর প্রস্তাবের মাধ্যমে দিনটিকে স্বীকৃতি দেয়। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় আড়াই কোটি কৃষক পরিবার মিলে বৈশ্বিক কফির প্রায় ৮০% জোগান দেয়। এদের সিংহভাগই উন্নয়নশীল দেশের সাধারণ ক্ষুদ্র চাষি। কফি তাই শুধু একটি পানীয় নয়, বরং লাখ লাখ মানুষের জীবিকার চালিকাশক্তি।

গাছে কফির ফল দেখতে ঠিক লাল রঙের ছোট চেরির মতো, তাই একে কৃষকরা ‘কফি চেরি’ বলেন। সাধারণত প্রতিটি কফি ফলের ভেতর দুটি করে বীজ লুকানো থাকে। ফল পাকার পর গাছ থেকে তুলে ফলের বাইরের পাতলা চামড়া ও নরম শাঁস সাবধানে আলাদা করা হয়। এরপর বীজগুলোকে রোদে শুকিয়ে ওপরের শুকনো খোসা ছাড়িয়ে নেওয়া হয়। এই অবস্থায় বীজগুলোর রং থাকে হালকা সবুজাভ। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে একে ‘গ্রিন কফি’ বলা হয়। পোকা ধরা বা নষ্ট বীজ বাছাইয়ের পর কাঁচা কফিবিন আন্তর্জাতিক বাজারে পাঠানোর জন্য প্রস্তুত করা হয়।

দোকানে বা ক্যাফেতে আমরা যে কালচে-বাদামি চকচকে কফিবিন দেখি, গাছ থেকে তোলার সময় কিন্তু তা এমন থাকে না। কফি উৎপাদনকারী দেশগুলো যেমন ব্রাজিল, ভিয়েতনাম কিংবা কলম্বিয়া মূলত এই কাঁচা গ্রিন কফিই বিদেশে রপ্তানি করে। এরপর ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো আমদানিকারক দেশগুলো এই কাঁচা বীজ নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় ‘রোস্ট’ বা ভাজে। রোস্টিংয়ের ফলেই কফির পরিচিত তীব্র সুবাস ও অসাধারণ স্বাদ তৈরি হয়। পরে তা আস্ত দানা হিসেবে অথবা গুঁড়া করে দৃষ্টিনন্দন প্যাকেটে ভরে সুপারশপ কিংবা জনপ্রিয় কফিশপে পাঠানো হয়।

এক কাপ কফি তৈরিতে কেবল কৃষকের শ্রম নয়, জড়িয়ে থাকে অজস্র মানুষের হাত। কেউ হয়তো গভীর বনে বা পাহাড়ে গাছের পরিচর্যা করেছেন, কেউ রোদে পুড়ে ফল তুলেছেন। আবার কেউ তা শুকিয়েছেন, আন্তর্জাতিক জাহাজে তুলেছেন, কেউ রোস্ট করেছেন এবং সবশেষে ক্যাফেতে বসে কোনো বারিস্তা তা সুন্দর করে পরিবেশন করেছেন। পুরো এই সরবরাহ প্রক্রিয়াকে আন্তর্জাতিক কফি সংস্থা বা আইসিও কফির বৈশ্বিক ‘ভ্যালু চেইন’ বলে অভিহিত করে। এক দেশের মাটি থেকে শুরু হওয়া একখণ্ড বীজ এভাবে নানা হাত ঘুরে আরেক দেশের মানুষের টেবিলে পৌঁছায়।

বিদেশে কিংবা শহরের বিলাসবহুল ক্যাফেতে এক কাপ কফি কিনতে একজন ভোক্তা অনায়াসে ৪ থেকে ৫ $ ডলার ব্যয় করেন। অথচ এই বিপুল মূল্যের কতটুকু পৌঁছায় আসল কফিচাষির হাতে? বৈশ্বিক পরিসংখ্যান বলছে, এক কাপ কফির বিক্রিমূল্যের মাত্র ১০% বা তারও কম টাকা কাঁচা কফি উৎপাদনকারী কৃষকের পকেটে যায়। বাকি বিশাল অংশের মুনাফা চলে যায় বড় বড় রোস্টিং কোম্পানি, মধ্যস্বত্বভোগী ব্যবসায়ী ও ক্যাফের মালিকদের কোষাগারে। ফলে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে ফলন ফলিয়েও প্রকৃত উৎপাদকরা বছরের পর বছর বঞ্চিত ও দরিদ্রই থেকে যাচ্ছেন।

জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব, রাসায়নিক সারের চড়া দাম এবং আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যের ওঠানামার কারণে ক্ষুদ্র কফিচাষিরা সবসময়ই ১০০% চরম ঝুঁকিতে থাকেন। বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর সঙ্গে দর-কষাকষির কোনো ক্ষমতা এসব সাধারণ কৃষকদের থাকে না। তাই বাজারে কফির দাম যত বাড়ুক না কেন, প্রান্তিক খামারিদের ভাগ্যের কোনো স্থায়ী উন্নতি হয় না। অথচ পরিবারের সবাই মিলে ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত হাড়ভাঙা খাটুনি দিয়ে পুরো বিশ্বের কফির জোগান ঠিক রাখেন তাঁরাই। জাতিসংঘের কফি দিবসেও ভ্যালু চেইনের এই অসম আয়ের বিষয়টি উদ্বেগের সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে।

বিশ্বের এই কফিচাষিদের বঞ্চনার সঙ্গে আমরা খুব সহজেই বাংলাদেশের কৃষকদের জীবনের মিল খুঁজে পাই। আমাদের দেশের কৃষকরাও রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে ধান, পাট, আলু কিংবা মরিচ উৎপাদন করেন। কিন্তু ভোক্তা পর্যায়ে সেই আলু বা মরিচ যখন আকাশচুম্বী দামে বিক্রি হয়, তার সুফল গ্রামীণ কৃষক কখনোই পান না। আন্তর্জাতিক কফি দিবসে তাই শুধু এক চুমুক কফির আনন্দ উপভোগ নয়, একই সাথে বিশ্বের কোটি কোটি কফিচাষি এবং আমাদের দেশের মেহনতি কৃষকদের ন্যায্য অধিকার ও সঠিক মূল্য নিশ্চিত করার দাবি তোলা জরুরি।

সম্পর্কিত নিবন্ধ