ভূরাজনৈতিক নানা সংঘাত আর বাণিজ্যযুদ্ধ সামলে ২০২৫ সালে বৈশ্বিক অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছিল। কিন্তু চলতি ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর অর্থনীতির গতিপথ সম্পূর্ণ বদলে গেছে। এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেল ও অন্যান্য পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে ভেঙে পড়েছে, যা নতুন করে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) তাদের ২০২৬ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে এই আশঙ্কার কথা জানিয়েছে। ‘নেভিগেটিং আ প্রিকারিয়াস ওয়ার্ল্ড’ শিরোনামের এই প্রতিবেদনে সংস্থাটি স্পষ্ট বলেছে, সংঘাতের কারণে একদিকে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি কমছে, অন্যদিকে বিশ্ববাজারে লাফিয়ে বাড়ছে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় ও মূল্যস্ফীতি।
প্রতিবেদনে আইএমএফ বিশেষভাবে উল্লেখ করেছে, চলমান যুদ্ধের সরাসরি আঘাতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল সরবরাহের ক্ষেত্রে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিপর্যয় ঘটেছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) তথ্যের বরাতে আইএমএফ জানায়, জ্বালানি তেলের এই তীব্র ঘাটতি শুধু তেলের বাজারে সীমাবদ্ধ নেই, এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব খাদ্যশস্য ও সারসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সব ধরনের পণ্যের আন্তর্জাতিক পরিবহন খরচের ওপর পড়ছে। সংঘাতপূর্ণ অঞ্চল পেরিয়ে এখন এই অর্থনৈতিক ধাক্কা উন্নয়নশীল দেশগুলোসহ সারা বিশ্বের সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ওপর ছড়িয়ে পড়েছে।
আইএমএফের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্ববাণিজ্যে প্রায় ৫% প্রবৃদ্ধি হয়েছিল, যার মূল চালিকাশক্তি ছিল আধুনিক প্রযুক্তিপণ্য। তবে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় চলতি বছরে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গতি অনেক কমে আসার জোরালো আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। চলমান সংকট সামাল দিতে বিভিন্ন দেশ এখন কোনো একক উৎসের ওপর নির্ভর না করে নিজেদের আমদানি ও রপ্তানির বাজার বহুমুখী করছে। অর্থনীতিবিদদের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বাণিজ্যে অতিরিক্ত ভারসাম্যহীনতা থাকলে যেকোনো দেশের অর্থনীতি হঠাৎ করে বড় ধরনের অস্থিতিশীলতায় পড়তে পারে। তাই আন্তর্জাতিক ঝুঁকি এড়াতে দেশগুলো এখন অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়ানো এবং সরবরাহব্যবস্থায় বৈচিত্র্য আনার জোর চেষ্টা চালাচ্ছে।
যুদ্ধ আর সংকটের এমন ঘনঘটার মধ্যেও বিশ্ব অর্থনীতিতে আশার আলো দেখাচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি। আইএমএফ জানাচ্ছে, ২০২৫ সালে প্রযুক্তি খাতে বড় অঙ্কের বিনিয়োগের কারণে কেবল যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতেই প্রবৃদ্ধির সঙ্গে প্রায় ০.৫% পয়েন্ট অতিরিক্ত যোগ হয়েছিল। সংস্থাটি পূর্বাভাস দিয়েছে, ২০২৬ সালে বিশ্বজুড়ে বেসরকারি খাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে গবেষণা ও প্রযুক্তির প্রসারে মোট বিনিয়োগ ২ ট্রিলিয়ন বা প্রায় $২,০০০,০০০,০০০,০০০ (দুই লাখ কোটি ডলার) ছাড়িয়ে যাবে। বড় বড় প্রযুক্তি কোম্পানি এই খাতে যেভাবে বিপুল অর্থ ঢালছে, তাতে বিশ্বজুড়ে উৎপাদনশীলতা বহুগুণ বেড়ে যেতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই দ্রুত অগ্রগতির পেছনেও কিছু মারাত্মক ঝুঁকি দেখছে আইএমএফ। সংস্থাটি সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যাপক হারে চালু হলে অনেক সাধারণ মানুষ কাজ হারাতে পারেন এবং মজুরির ওপর বড় ধরনের নেতিবাচক চাপ তৈরি হতে পারে। এর পাশাপাশি এআই খাতে বিনিয়োগ করা বিপুল অর্থ থেকে যদি কোম্পানিগুলো দ্রুত আশানুরূপ মুনাফা তুলতে ব্যর্থ হয়, তবে আন্তর্জাতিক শেয়ারবাজারে চরম ধস নামতে পারে। এর ফলে প্রযুক্তি খাতে সম্পদের দাম কমে গিয়ে লাখ লাখ কর্মী ছাঁটাইয়ের মুখে পড়ার গভীর ঝুঁকি রয়েছে, যা পুরো আর্থিক খাতকে কাঁপিয়ে দিতে পারে।
অর্থনীতির সামগ্রিক ভবিষ্যৎ নিয়ে আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা বলেন, একের পর এক বৈশ্বিক ধাক্কা সামলে বিশ্ব অর্থনীতি টিকে থাকার চেষ্টা করছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিকে আগের চেয়ে অনেক বেশি অনিশ্চিত করে তুলেছে। জর্জিয়েভার মতে, বিশ্ব অর্থনীতিতে এখন মূলত দুটি সম্পূর্ণ বিপরীত শক্তি কাজ করছে। একদিকে রয়েছে যুদ্ধের সংকট এবং জ্বালানি সরবরাহের নজিরবিহীন ধস, অন্যদিকে কাজ করছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও আধুনিক প্রযুক্তির বিপুল সম্ভাবনা। সামনে বিশ্ব কোন পথে এগোবে, তা মূলত নির্ভর করবে এই যুদ্ধ কত দিন চলে, হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থা কীভাবে কাটে এবং এআই খাত কতটা কার্যকরভাবে অর্থনীতিতে অবদান রাখে তার ওপর।















