হামলার শিকার হলে ভয়ংকর যুদ্ধের প্রস্তুতি রয়েছে ইরানের: আরাগচি

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে চলমান তীব্র সংকটের অবসান ঘটিয়ে শান্তি ফিরিয়ে আনতে চায় ইরান। তবে দেশটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে, নিজেদের ওপর নতুন করে বিদেশি হামলা হলে তারা হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না। আগ্রাসনের কঠোর জবাব দিতে তেহরানের সামরিক বাহিনী এখন ১০০% প্রস্তুত। সোমবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনের ফাঁকে কাতারের মধ্যস্থতায় নতুন করে পরোক্ষ আলোচনার ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও ইঙ্গিত দিয়েছেন, খুব শিগগিরই দুই পক্ষের মধ্যে নতুন আলোচনা শুরু হতে পারে।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনবিসি নিউজকে বলেন, তেহরান যেমন সম্মানের সাথে আলোচনার টেবিলে বসতে রাজি, তেমনি প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা করতেও পিছপা হবে না। তিনি কড়া হুঁশিয়ারি দেন, সংঘাত যদি সবকিছু ছারখার করে দেওয়ার মতো মহাযুদ্ধে রূপ নেয়, ইরান সেই লড়াইয়ে প্রস্তুত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি লেখেন, প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান কোনো যুদ্ধের ঢাকঢোল পেটাতে নিউইয়র্কে আসেননি, বরং শান্তির বার্তা নিয়ে এসেছিলেন। তবে দেশের সুরক্ষায় তারা কোনো আপস করবেন না।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সুযোগ নিয়ে গত সপ্তাহে কাতারের কূটনীতিকদের মাধ্যমে ওয়াশিংটনের কাছে একটি বিস্তারিত প্রস্তাব পাঠায় তেহরান। ওই প্রস্তাবে ইরান নির্দিষ্ট কিছু শর্ত মেনে নেওয়ার বিপরীতে আগামী ৭ দিনের মধ্যে কৌশলগতভাবে অতি গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করে দেওয়ার অঙ্গীকার করে। কিন্তু গত শনিবার হোয়াইট হাউসে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যেই সেই প্রস্তাব সরাসরি নাকচ করে দেন। ট্রাম্প তখন দাবি করেন, ইরান যুদ্ধে শোচনীয়ভাবে হেরে যাচ্ছে বলেই হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার চুক্তি করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। ট্রাম্পের এমন একতরফা প্রত্যাখ্যানের পর কূটনৈতিক উদ্যোগটি ব্যর্থ হওয়ার চরম আশঙ্কা দেখা দেয়।

তবে এই কঠোর বক্তব্যের ঠিক পরদিনই নিজের সুর নাটকীয়ভাবে বদলে ফেলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসকে ফোনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, চলতি সপ্তাহেই মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে নতুন করে আলোচনা শুরু হতে পারে। কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের সমীকরণ মাথায় রেখেই ট্রাম্প হয়তো এমন কৌশল নিচ্ছেন। সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত রিচার্ড স্মিয়েরারও মনে করেন, মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতির প্রভাবের কারণে ট্রাম্প বিষয়টি নিয়ে দোটানায় আছেন। এদিকে ইরানের বার্তা সংস্থা আইএসএনএ নিশ্চিত করেছে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচির নেতৃত্বে ইরানি প্রতিনিধিদল সোমবার নিউইয়র্কে কাতারের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সর্বশেষ প্রস্তাব ও সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে জরুরি বৈঠকে বসেছে।

অবশ্য ওয়াশিংটনের সাথে সরাসরি কোনো মুখোমুখি আলোচনায় ইরান অংশ নেবে না বলে তাদের সংবাদ সংস্থা তাসনিম স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে। এছাড়া জাতিসংঘে দায়িত্ব পালন শেষে ইরানি প্রতিনিধিদলটি মঙ্গলবারই তেহরানে ফিরে যাওয়ার কথা রয়েছে। অন্যদিকে উপসাগরীয় অঞ্চলের পানিসীমা নিয়েও দুই দেশের মধ্যে নতুন করে বাগযুদ্ধ শুরু হয়েছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা আলী খামেনি এক বিশেষ বার্তায় দাবি করেন, তাদের নৌবাহিনীর বীরত্বপূর্ণ তৎপরতার মুখে ‘শত্রু জাহাজগুলো’ উপকূলীয় জলসীমা ছেড়ে আরব সাগরের দিকে পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে। ইরান খুব শিগগিরই তাদের আরও দূরে তাড়িয়ে দেবে বলেও তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।

ইরানের এই দাবির তীব্র বিরোধিতা করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)। এক্সে দেওয়া এক আনুষ্ঠানিক বার্তায় সেন্টকম জানায়, হরমুজ প্রণালির ওপর তেহরানের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের দাবি পুরোপুরি ভিত্তিহীন। মার্কিন সামরিক বাহিনীর দাবি, গত কয়েক মাসে ওই আন্তর্জাতিক জলপথ দিয়ে নির্বিঘ্নে ১০০ কোটির বেশি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল বিশ্ববাজারে পরিবাহিত হয়েছে, যার আর্থিক মূল্য শত শত কোটি $ (ডলার)। এই বিপুল পরিমাণ জ্বালানি বাণিজ্য অব্যাহত থাকা প্রমাণ করে যে, এই প্রণালির ওপর ইরানের একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার দাবিটি সত্য নয়।

এদিকে সামরিক উত্তেজনার মধ্যেই ইংল্যান্ডের রয়্যাল এয়ারফোর্স ফেয়ারফোর্ড ঘাঁটির কাছে ঘটে যাওয়া এক বোমা আতঙ্কের ঘটনায় নিজেদের নাম জড়ানোর চেষ্টাকে কড়া ভাষায় প্রত্যাখ্যান করেছে ইরান। যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিমান নামার এই গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটির কাছে তিনটি সন্দেহভাজন গাড়িসহ ২৩ থেকে ২৫ বছর বয়সী ৫ জন ব্রিটিশ নাগরিককে গ্রেপ্তার করে স্থানীয় পুলিশ। ব্রিটিশ আদালত তাঁদের জামিন দিলেও কিছু পশ্চিমা প্রচারমাধ্যমে তেহরানকে দায়ী করার চেষ্টা চলে। লন্ডনে অবস্থিত ইরানি দূতাবাস এ ধরনের অভিযোগকে মিথ্যা ও উসকানিমূলক আখ্যা দিয়েছে। সব মিলিয়ে আলোচনার টেবিল কিংবা যুদ্ধের ময়দান উভয় পথেই নিজেদের কঠোর অবস্থান জানান দিয়ে বিশ্বরাজনীতিতে সতর্ক পদক্ষেপে এগিয়ে চলেছে তেহরান।

সম্পর্কিত নিবন্ধ