হরমুজ প্রণালি বন্ধ: বাংলাদেশসহ একাধিক দেশে এলএনজি সরবরাহ পেছাল কাতার

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাতের জেরে হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ নিয়ে বড় ধরনের বিপাকে পড়েছে কাতারএনার্জি। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কোম্পানিটি ‘ফোর্স মেজার’ বা অপ্রত্যাশিত সংকটের নোটিশের মেয়াদ আবারও বাড়িয়ে দিয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়তে যাচ্ছে এশিয়ার দেশ বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের পাশাপাশি ইউরোপের দেশগুলোর ওপর। সোমবার আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও বাণিজ্য সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থা না কাটায় কাতার থেকে নির্ধারিত সময়ে তরল গ্যাস পাওয়া যাবে না।

বাণিজ্যিক সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মতো গুরুত্বপূর্ণ এশীয় ক্রেতাদের জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, সরবরাহ স্থগিতের মেয়াদ আগামী নভেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হলো। অন্যদিকে ইউরোপে কাতারের অন্যতম প্রধান গ্রাহক ইতালির জ্বালানি কোম্পানি এডিসন জানিয়েছে, তারা অন্তত আগামী ডিসেম্বরের শুরুর দিক পর্যন্ত কাতার থেকে কোনো এলএনজি চালান পাবে না। গত এপ্রিল মাসে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই হরমুজ প্রণালি দিয়ে সাধারণ বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। সেই সময় থেকেই ধাপে ধাপে নোটিশ দিয়ে গ্যাস সরবরাহ আটকে রাখছে কাতার।

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান এই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক ধাক্কা লেগেছে কাতারের ওপর। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক হিসাবে জানা যায়, চলতি বছরের আগস্টের শেষ নাগাদ কাতারের এলএনজি রপ্তানি রেকর্ড ৯৬% কমে গেছে। ডেটা ইন্টেলিজেন্স প্রতিষ্ঠান আইসিআইএস-এর তথ্য অনুযায়ী, গত বছর একই সময়ে কাতার যেখানে আন্তর্জাতিক বাজারে ৫০৯টি এলএনজি কার্গো পাঠিয়েছিল, সেখানে চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত তারা মোটে ১৮টি চালান পাঠাতে সক্ষম হয়েছে। উপসাগরীয় প্রতিবেশী কয়েকটি দেশ গোপনে তেল খালাস করতে পারলেও বিশালাকার এলএনজি ট্যাংকারগুলোর ক্ষেত্রে এমন বিকল্প পথ ব্যবহার করা কাতারএনার্জির পক্ষে সম্ভব হয়নি।

ইতালির এডিসন কোম্পানি জানিয়েছে, কাতারএনার্জি নতুন করে আরও ৬টি এলএনজি কার্গো বাতিল করেছে। সব মিলিয়ে কোম্পানিটির না পাওয়া চালানের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৫টিতে। চুক্তি অনুযায়ী কাতার থেকে বছরে ৬৪০ কোটি ঘনমিটার গ্যাস পাওয়ার কথা ছিল এডিসনের, যা পুরো ইতালির মোট বার্ষিক ব্যবহারের প্রায় ১০% মেটায়। ২০০৯ সালে শুরু হওয়া ২৫ বছর মেয়াদি এই দীর্ঘস্থায়ী চুক্তিতে এমন বড় ব্যাঘাত ঘটায় এডিসন বাধ্য হয়ে মার্কিন সরবরাহকারীদের দ্বারস্থ হয়েছে। ঘাটতি সামাল দিতে তারা এ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র থেকে ২৩টি এলএনজি চালান বিকল্প হিসেবে সংগ্রহ করেছে।

বিশ্বজুড়ে আর কয়েক দিনের মধ্যেই শুরু হতে যাচ্ছে শীতকালীন মৌসুম। এমন সময়ে কাতারি গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকা বৈশ্বিক বাজারে এক বিশাল সংকট তৈরি করেছে। ইউরোপের দেশগুলো তাদের মজুতাগার পূর্ণ করতে এখন মরিয়া হয়ে উঠেছে। ইতালি তাদের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের বিষয়ে কিছুটা আশাবাদী হলেও জার্মানি সহ একাধিক ইউরোপীয় দেশ দ্রুত বিকল্প উৎস খুঁজছে। এই পরিস্থিতি সীমিত এলএনজি পাওয়ার জন্য ইউরোপ এবং এশিয়ার মধ্যে এক তীব্র প্রতিযোগিতার জন্ম দেবে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাসের দাম হু হু করে বাড়বে এবং জ্বালানি কিনতে গিয়ে অতিরিক্ত শত শত কোটি $ (ডলার) ব্যয় করতে হবে আমদানিকারকদের।

কাতারের এমন সিদ্ধান্তে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতেও বড় ধরনের বিপর্যয়ের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ নিজস্ব উৎপাদন ঘাটতি মেটাতে দীর্ঘদিন ধরে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে কাতারের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। নভেম্বর পর্যন্ত এই সরবরাহ বন্ধ থাকলে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সার কারখানায় গ্যাসের তীব্র সংকট দেখা দিতে পারে। একই সাথে দেশের তৈরি পোশাক খাতসহ প্রধান প্রধান শিল্পকারখানায় উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যহত হবে। এই ঘাটতি সামলাতে সরকারকে আন্তর্জাতিক খোলা বাজার বা স্পট মার্কেট থেকে বাড়তি দামে ডলার খরচ করে গ্যাস কিনতে হবে, যা রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়াবে।

জ্বালানি বিশ্লেষকরা মনে করছেন, হরমুজ প্রণালির সামরিক সংকট দ্রুত না কাটলে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর সামগ্রিক অর্থনৈতিক ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। একদিকে ইউরোপে শীতকালে গ্যাসের বাড়তি অভ্যন্তরীণ চাহিদা, অন্যদিকে বিশ্বের অন্যতম প্রধান সরবরাহকারী কাতারের রফতানি স্থবির হয়ে পড়া উভয় সংকট মিলে গোটা জ্বালানি বাজারকে চরম অস্থির করে তুলছে। অবিলম্বে কোনো কার্যকর কূটনৈতিক সমাধানের মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত না হলে, আমাদের দেশের সাধারণ মানুষকে দীর্ঘমেয়াদি গ্যাস সংকট, বাড়তি মূল্যস্ফীতি এবং চরম লোডশেডিংয়ের নির্মম ধাক্কা সামলাতে হতে পারে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ