ঝিনাইদহের শৈলকুপায় কুমার নদের দেশীয় প্রজাতির মাছ ও জলজ সম্পদ রক্ষায় অবৈধ চায়না দুয়ারী জালের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সাঁড়াশি অভিযান চালিয়েছে উপজেলা প্রশাসন ও মৎস্য দপ্তর। মৎস্য সম্পদ সুরক্ষা ও সংরক্ষণ আইন বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে পরিচালিত এই বিশেষ অভিযানে নদী থেকে মোট ৭৭টি নিষিদ্ধ চায়না দুয়ারী জাল জব্দ করা হয়েছে। উদ্ধার হওয়া এসব জালের আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৪ লাখ টাকা, যা আন্তর্জাতিক মুদ্রায় প্রায় $৩,৪০০ ডলারের সমপরিমাণ। পরবর্তীতে জব্দ করা সব জাল কবিরপুর নতুন ব্রিজের কাছে জনসম্মুখে আগুনে পুড়িয়ে সম্পূর্ণ ভস্মীভূত করা হয়।
উপজেলা মৎস্য দপ্তরের বাস্তবায়নে পরিচালিত এই গুরুত্বপূর্ণ অভিযানে সরাসরি নেতৃত্ব দেন শৈলকুপা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. ইমরান হোসেন। অভিযানে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে ও জাল উদ্ধারে সক্রিয়ভাবে সহায়তা করেন শৈলকুপা থানার উপপরিদর্শক (এসআই) তরিকুল ইসলাম এবং পুলিশের একটি বিশেষ দল। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে যৌথ এই দল শৈলকুপা উপজেলার কুমার নদের দেবতলা ঘাট এবং দামুকদিয়া ঘাট এলাকায় আকস্মিক এই অভিযান পরিচালনা করে। প্রায় কয়েক কিলোমিটার নদীপথে দীর্ঘ সময় ধরে তল্লাশি চালিয়ে পানির নিচে বাঁশের খুঁটি দিয়ে পেতে রাখা বিপুল পরিমাণ ক্ষতিকর জাল উদ্ধার করেন তারা।
নদী তীরবর্তী সাধারণ জেলে ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, একশ্রেণির সুবিধাবাদী ও অসাধু মাছ শিকারি রাতের অন্ধকারে কুমার নদের বাঁকে বাঁকে এসব চায়না দুয়ারী জাল পেতে রাখত। এই জালের বুনন ও ফাঁস এতই সূক্ষ্ম যে, নদীর ছোট পোনা মাছ থেকে শুরু করে ডিমওয়ালা মা মাছ এমনকি শামুক, ঝিনুক ও ব্যাঙ পর্যন্ত এর থেকে রেহাই পায় না। মৎস্য গবেষকদের মতে, উন্মুক্ত জলাশয়ে এ ধরনের জাল ব্যবহার করলে নদীর জলজ বাস্তুতন্ত্রের প্রায় ১০০% ক্ষতি হয়। ফলে বিগত কয়েক বছরে কুমার নদে দেশীয় মাছের স্বাভাবিক প্রজনন প্রায় ৭০% থেকে ৮০% হ্রাস পেয়েছে।
অভিযান শেষে উদ্ধার করা ৭৭ পিস চায়না দুয়ারী জাল নদী থেকে তুলে গাড়িতে করে কবিরপুর নতুন ব্রিজের পাশে নিয়ে আসা হয়। সেখানে প্রশাসনের কর্মকর্তা, পুলিশ সদস্য এবং নদীর পাড়ে জড়ো হওয়া সাধারণ মানুষের সামনেই জালগুলোতে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। চোখের পলকেই আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায় লক্ষাধিক টাকার নিষিদ্ধ এই জাল। প্রকাশ্য দিবালোকে এভাবে ক্ষতিকর জাল পুড়িয়ে ধ্বংস করার পদক্ষেপ দেখে উপস্থিত সাধারণ মানুষ ও প্রান্তিক মৎস্যজীবীরা গভীর সন্তোষ প্রকাশ করেন।
উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. ইমরান হোসেন জানান, দেশীয় প্রজাতির মাছ আমাদের অমূল্য জাতীয় সম্পদ। চায়না দুয়ারী জাল নদী এবং প্রাকৃতিক জলাশয়ের জীববৈচিত্র্যের জন্য এক নীরব ঘাতক। দেশি মাছের বংশবৃদ্ধি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মৎস্য সংরক্ষণ আইনের কঠোর প্রয়োগ ছাড়া বিকল্প নেই। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, সরকার অবৈধ জাল নির্মূলে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। নদী থেকে এই সর্বনাশা জাল চিরতরে উচ্ছেদ না হওয়া পর্যন্ত মৎস্য দপ্তরের নিয়মিত ও আকস্মিক অভিযান অব্যাহত থাকবে এবং অপরাধীদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।
অভিযানে উপস্থিত এসআই তরিকুল ইসলাম বলেন, নদীর জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় পুলিশ বিভাগ মৎস্য দপ্তরকে মাঠপর্যায়ে সর্বাত্মক নিরাপত্তা সহযোগিতা দিচ্ছে। তিনি জেলেদের উদ্দেশে ক্ষতিকর জাল বর্জন করে সরকার নির্ধারিত নিয়মে বৈধ জাল ব্যবহারের পরামর্শ দেন। একই সাথে কোনো এলাকায় নিষিদ্ধ জালের কেনাবেচা বা ব্যবহার দেখলে সাথে সাথে থানা পুলিশ কিংবা মৎস্য কর্মকর্তাকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করতে সাধারণ মানুষের প্রতি অনুরোধ জানান।
শৈলকুপার সচেতন নাগরিকরা মনে করেন, কুমার নদ এই অঞ্চলের অর্থনীতি ও গ্রামীণ জীবনযাত্রার প্রধান চালিকাশক্তি। লোভী শিকারিদের লাগামহীন তৎপরতায় নদীটি প্রায় মাছশূন্য হয়ে পড়ছিল, যা স্থানীয়দের আমিষের জোগানে বড় সংকট তৈরি করছিল। প্রশাসনের এমন পদক্ষেপে কুমার নদে আবারও দেশি মাছের প্রাচুর্য ফিরবে বলে তারা আশাবাদী। নিয়মিত নজরদারি নিশ্চিত করা গেলে কুমার নদ খুব দ্রুতই তার হারানো প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে পাবে।
















