ঝিনাইদহের শৈলকুপায় পুলিশের বিশেষ মাদকবিরোধী অভিযানে গ্রেপ্তার হওয়া দুই মাদকসেবীকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দিয়েছেন আদালত। ৩ অক্টোবর শৈলকুপা থানা পুলিশ দিন ও রাতব্যাপী এক সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করে। পুলিশ দ্রুত আসামিদের বিজ্ঞ আদালতে হাজির করলে বিচারক সাক্ষ্য-প্রমাণ ও পারিপার্শ্বিক বিষয় বিবেচনা করে তাদের এই দণ্ডাদেশ প্রদান করেন। আদালতের এই কঠোর আদেশে এলাকায় সাধারণ মানুষের মাঝে ব্যাপক স্বস্তি ফিরে এসেছে। শৈলকুপা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোঃ হুমায়ূন কবির মোল্লা ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, এলাকাকে মাদকমুক্ত করতে তাদের এ সাঁড়াশি অভিযান চালানো হয়েছে।
আদালতের নথি ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের মধ্যে প্রথমজন হলেন শৈলকুপা উপজেলার হাবিবপুর গ্রামের রাজু বিশ্বাসের ছেলে মোঃ সম্রাট বিশ্বাস (২৫)। বিজ্ঞ আদালত তাকে ০১ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেন এবং নগদ ২,০০০ টাকা জরিমানা করেন। জরিমানার এই টাকা অনাদায়ে তাকে অতিরিক্ত ২০ দিন কারাভোগ করতে হবে। অন্যদিকে সাজাপ্রাপ্ত দ্বিতীয় ব্যক্তি হলেন একই উপজেলার কবিরপুর গ্রামের মনোরঞ্জন দাসের ছেলে বিকাশ দাস (৩৮)। আদালত তাকেও ০১ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়ার পাশাপাশি ১,০০০ টাকা অর্থদণ্ড দেন। জরিমানার অর্থ অনাদায়ে তাকে আরও ১৫ দিনের কারাভোগের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
শৈলকুপা থানা পুলিশ জানায়, শনিবার সকাল থেকেই উপজেলার চিহ্নিত মাদক স্পট ও ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোতে দিন ও রাত্রিকালীন বিশেষ নজরদারি শুরু হয়। এসআই ও এএসআইদের নেতৃত্বে পুলিশের একাধিক টিম নিয়মিত টহল জোরদার করে। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পুলিশ খবর পায় যে, নির্জন স্থানে বসে কয়েকজন নিয়মিত মাদক সেবন করছে। এমন সংবাদের ওপর ভিত্তি করে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে হানা দেয় এবং হাতেনাতে সম্রাট ও বিকাশকে আটক করে। পরে তল্লাশি চালিয়ে তাদের কাছ থেকে মাদক সেবনের আলামত জব্দ করা হয়। গ্রেপ্তারের পর রাতেই তাদের থানায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় এবং পরদিন সকালে সরাসরি আদালতে পাঠানো হয়।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, হাবিবপুর ও কবিরপুরসহ আশপাশের গ্রামগুলোতে যুবসমাজের একাংশ মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়ায় সামাজিক পরিবেশ নষ্ট হচ্ছিল। মাদক কেনার টাকার জন্য প্রায়ই এলাকায় ছোটখাটো চুরি ও বিশৃঙ্খলার ঘটনা ঘটত। স্থানীয় মুরব্বিরা বলছেন, গ্রামীণ সমাজে অপরাধের প্রায় ২০% থেকে ৩০% মাদকের কারণে ঘটে থাকে। পুলিশ যেভাবে সক্রিয় হয়ে দিন ও রাতে অভিযান চালিয়ে মাদকসেবীদের আইনের আওতায় এনেছে, তাতে এলাকার সাধারণ মানুষ স্বস্তি প্রকাশ করেছেন। এমন কড়া পদক্ষেপ অব্যাহত থাকলে তরুণরা বিপথগামী হওয়া থেকে রক্ষা পাবে বলে স্থানীয়রা আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
মাদক বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক চোরাচালানের মাধ্যমে হাজার হাজার $ (মার্কিন ডলার) মূল্যের মাদক দেশের বিভিন্ন প্রান্তে প্রবেশ করে। সেই বিষাক্ত প্রভাব একপর্যায়ে গ্রামীণ তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে তরুণদের ভবিষ্যৎ ধ্বংস করে দিচ্ছে। পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, শৈলকুপা ও ঝিনাইদহের সীমান্তবর্তী পথগুলোতে কড়া নজরদারি থাকায় সম্প্রতি মাদকের অবৈধ সরবরাহ অন্তত ৩৫% কমেছে। তবে পুরো সমস্যা সমূলে দূর করতে নিয়মিত আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা প্রয়োজন। পরিবারের অভিভাবকদেরও তাদের সন্তানদের দৈনন্দিন চলাফেরার ওপর কড়া নজর রাখা উচিত।
শৈলকুপা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোঃ হুমায়ূন কবির মোল্লা বলেন, আমরা একটি নিরাপদ, অপরাধ ও মাদকমুক্ত শৈলকুপা উপজেলা গড়তে বদ্ধপরিকর। তরুণ প্রজন্মকে মাদকের হাত থেকে রক্ষা করতে না পারলে দেশের উন্নয়ন ব্যাহত হবে। মাদকের বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান ১০০% কঠোর। কোনো মাদকসেবী কিংবা মাদক বিক্রেতাকে শৈলকুপার মাটিতে ছাড় দেওয়া হবে না। তারা যত প্রভাবশালীই হোক না কেন, তথ্য পেলেই আমরা আইনের আওতায় নিয়ে আসব। তিনি আরও জানান, মাদকের কুফল সম্পর্কে গ্রামের মানুষদের সচেতন করতে পুলিশ বিভিন্ন সভা ও আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।
ওসি আরও স্পষ্ট করেন যে, শৈলকুপা থানা পুলিশের এ ধরনের বিশেষ দিন ও রাত্রিকালীন সাঁড়াশি অভিযান সামনের দিনগুলোতেও সমান গতিতে চলবে। অপরাধীদের অবস্থান শনাক্ত করতে পোশাকধারী পুলিশের পাশাপাশি সাদা পোশাকে গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার রাখা হয়েছে। মাদক বা কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের তথ্য জানা থাকলে নির্ভয়ে পুলিশকে জানানোর জন্য তিনি সাধারণ জনগণের প্রতি আহ্বান জানান। তথ্যদাতার পরিচয় সব সময় গোপন রাখা হবে বলেও পুলিশ প্রশাসন আশ্বস্ত করেছে।
















