রাজধানীর মিরপুর-১ নম্বরের মা ও শিশুস্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে মধ্যরাতে চালানো বর্বরোচিত হামলা, ভাঙচুর ও মালামাল লুটের ঘটনায় আরও তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। গতকাল শনিবার মিরপুরের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করে ডিবি পুলিশ। এ নিয়ে দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করা এই চাঞ্চল্যকর ঘটনায় গত ৯ দিনে মোট ১৯ জনকে আইনের আওতায় আনল পুলিশ। ডিবি মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার মোহাম্মদ রাকিব বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, হামলার সঙ্গে সরাসরি জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়ার পর আসামিরা আত্মগোপনে ছিল।
শনিবার গ্রেপ্তার হওয়া তিন ব্যক্তি হলেন রাকিব আহমেদ সোহেল (৪৬), সারোয়ার আলম পিয়াস (৩৫) এবং সাজ্জাদ হোসেন মিশু ওরফে মোল্লা (৩৬)। পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তারকৃতরা স্থানীয় রাজনীতিতে সক্রিয়। তাদের মধ্যে রাকিব আহমেদ শাহ আলী থানা যুবদলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক। সারোয়ার আলম ঢাকা মহানগর পশ্চিম ছাত্রদলের সহসভাপতি ছিলেন, তবে বিতর্কিত এই হামলার পর দল তাকে বহিষ্কার করে। আর সাজ্জাদ হোসেন মিশু শাহ আলী থানা ছাত্রদলের সাবেক কমিটির সদস্য এবং তথাকথিত জাতীয়তাবাদী সাইবার দলের ঢাকা জেলার সহসভাপতি হিসেবে পরিচয় দিতেন।
গত ২৪ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতে মিরপুরের এই সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে তাণ্ডব চালায় ২০০ জনের বেশি মুখোশধারী সন্ত্রাসী। তারা দেশি অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ভেতরে ঢুকে নিরাপত্তারক্ষীদের অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে ফেলে। এরপর স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ভেতরে থাকা মূল্যবান ওষুধ, শিশুদের জীবনরক্ষাকারী টিকা ও ভারী চিকিৎসা সরঞ্জাম লুটপাট করে। এমনকি আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা ও দাতা গোষ্ঠীর অর্থায়নে কেনা কয়েক হাজার $ (ডলার) মূল্যের আধুনিক যন্ত্রপাতিও রেহাই পায়নি। হামলার সময় বড় এক্সক্যাভেটর (ভেকু) এনে মা ও শিশু স্বাস্থ্যকেন্দ্রের প্রায় ৮০% ভবন গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। সবশেষে সন্ত্রাসীরা সেখানে ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’-এর ব্যানার টানিয়ে জায়গাটি দখলের অপচেষ্টা করে।
জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানে এমন হামলায় স্থানীয় বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের নাম জড়িয়ে পড়ায় রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। হামলায় জড়িতদের অনেকেই সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদের (মিষ্টি) অনুসারী হিসেবে পরিচিত। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ব্যাপক সমালোচনার মুখে গত বৃহস্পতিবার সংসদ সদস্যের পদ ছাড়েন ফেরদৌসী আহমেদ। এর আগের দিন বুধবার রাতে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে বিএনপি, ছাত্রদল, যুবদল ও শ্রমিক দলের ১৪ জন নেতাকে একযোগে বহিষ্কার করে দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব।
মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, গ্রেপ্তার ১৯ জনের মধ্যে পাঁচজনই বিএনপির বিভিন্ন স্তরের সাবেক ও বর্তমান নেতাকর্মী। এর আগে শাহ আলী থানা বিএনপির সদস্য সাইফুল ইসলাম খোকন (৪৮), ৮ নম্বর ওয়ার্ড শ্রমিক দলের সভাপতি মো. আলম (৫৩) এবং যুবদলের বহিষ্কৃত নেতা নূর আলমকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। পাশাপাশি হামলাকারী হিসেবে ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি’-র সাধারণ সম্পাদক শাহ আলম, অফিস সহকারী শাহাদাত এবং দুই সদস্য আতিকুর ও কামরুলকেও গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ভেকু বহনকারী ভারী গাড়ির চালক শহীদুল ইসলামকেও (৪০) আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করছে গোয়েন্দারা।
পুলিশ আরও প্রকাশ করেছে যে, ভাঙচুরের কাজে শাহ আলী মাজার এলাকার বেশ কয়েকজন ভাসমান তরুণকে ব্যবহার করা হয়েছিল। মাত্র ৫০০ থেকে ১,০০০ টাকার লোভে পড়ে তারা রাতের আঁধারে এ নারকীয় কর্মকাণ্ডে অংশ নেয়। পুলিশ এই সংঘবদ্ধ চক্রের মূল পরিকল্পনাকারী ও নির্দেশদাতাদের ১০০% নিশ্চিতভাবে শনাক্ত করেছে। তারা এখন পলাতক থাকলেও ডিবি তাদের গতিবিধি সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রেখেছে। তাদের আইনের মুখোমুখি করতে রাজধানীর সম্ভাব্য সব গোপন আস্তানায় সাঁড়াশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
বর্তমানে ক্ষতিগ্রস্ত রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ চলছে। সেখানে সাধারণ গর্ভবতী মা ও নবজাতকদের প্রায় ৭০% কম খরচে চিকিৎসা ও নিয়মিত টিকাদান সেবা দেওয়া হতো। হঠাৎ কেন্দ্রটি পুরোপুরি মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়ায় মিরপুরের হাজার হাজার নিম্নবিত্ত পরিবার এখন চরম বিপাকে পড়েছে। স্বাস্থ্যকর্মীরা জানান, ভবনটির মেরামতকাজ দ্রুত শেষ করতে বড় অঙ্কের অর্থ ও প্রচুর নতুন চিকিৎসা সরঞ্জাম প্রয়োজন। স্বাস্থ্যসেবা ফের সচল করতে তারা সরকারের সরাসরি হস্তক্ষেপ চান। একই সাথে এমন ন্যক্কারজনক ঘটনার সাথে জড়িত প্রত্যেকের কঠোর শাস্তি দাবি করেছেন স্থানীয় সাধারণ মানুষ।
















