ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের একদল অদম্য কিশোরী ইতিহাস গড়েছে। খেলার জন্য বিদ্যালয়ে কোনো নির্দিষ্ট মাঠ নেই, নেই পর্যাপ্ত আধুনিক সুযোগ-সুবিধা। তবু তীব্র ইচ্ছাশক্তি ও কঠোর অনুশীলনের জোরে আন্তঃস্কুল কাবাডি প্রতিযোগিতায় ‘গোলাপ অঞ্চল’-এ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে তারা। খুলনা ও বরিশাল বিভাগের সবকটি দলকে পেছনে ফেলে সেরা হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে ৬ নম্বর সারুটিয়া ইউনিয়নের কাতলা গাড়ি বালিকা বিদ্যালয়। এই অবিস্মরণীয় জয়ের পর এবার জাতীয় পর্যায়ের চূড়ান্ত আসরে লড়াই করতে দলটির কিশোরী খেলোয়াড়েরা এখন কুমিল্লার পথে। প্রত্যন্ত গ্রামের এই মেয়েদের দুর্দান্ত সাফল্যে গোটা ঝিনাইদহ জুড়ে বইছে আনন্দের বন্যা।
জাতীয় স্কুল ও মাদ্রাসা ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় অঞ্চলভিত্তিক কাঠামোয় খুলনা ও বরিশাল বিভাগ নিয়ে গঠিত হয়েছে ‘গোলাপ অঞ্চল’। এই দুই বিভাগের অন্তত ১৬টি জেলার সেরা দলগুলোর মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়। সব প্রতিপক্ষকে হারিয়ে দিয়ে কাতলা গাড়ি বালিকা বিদ্যালয়ের মেয়েরা ট্রফি নিজেদের করে নিয়েছে। ফাইনাল ম্যাচে তারা শুরু থেকেই প্রায় ৮০% সময় খেলার নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখে। শেষ পর্যন্ত বড় ব্যবধানে জয় নিয়ে তারা জাতীয় আসরের টিকিট কাটে। অথচ এই বিদ্যালয়ের নিজস্ব কোনো খেলার মাঠ নেই। সীমিত জায়গায় শিক্ষকেরা তাদের প্রতিদিন নিয়ম করে কৌশলগত প্রশিক্ষণ দিয়েছেন।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আনিসুর রহমান অত্যন্ত গর্ব ও উচ্ছ্বাসের সঙ্গে বলেন, আমাদের বিদ্যালয়ে কোনো বড় মাঠ নেই, এটি আমাদের দীর্ঘদিনের দুঃখ। কিন্তু আমরা কখনোই হার মানিনি। বিদ্যালয়ের পেছনের ছোট আঙিনায় আমরা বাচ্চাদের অল্প পরিসরে নিয়মিত ও সঠিক প্রশিক্ষণ দিয়েছি। আমাদের মেয়েরা ১০০% মনোযোগ দিয়ে ঘাম ঝরিয়েছে। সেই কঠোর পরিশ্রমের ফল আজ আমাদের নারী শিক্ষার্থীরা মাঠে দেখিয়ে দিয়েছে। খুলনা ও বরিশাল বিভাগকে পেছনে ফেলে তারা আজ গোলাপ অঞ্চলে চ্যাম্পিয়ন। এখন আমাদের মূল লক্ষ্য কুমিল্লার মাঠে জাতীয় পর্যায়ে সেরাদের সেরা হওয়া। আমরা কুমিল্লায় ঝিনাইদহ জেলার সুনাম উজ্জ্বল করতে চাই।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, কাতলা গাড়ি বালিকা বিদ্যালয়ের ছাত্রীদের এই অর্জন এলাকার মানুষের চোখ খুলে দিয়েছে। যেখানে শহরের অনেক বিদ্যালয়ে লাখ লাখ টাকার বাজেট ও আধুনিক জিমনেশিয়াম থাকে, সেখানে এই গ্রামীণ স্কুলের মেয়েরা প্রায় শূন্য থেকেই শুরু করেছে। আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে যেখানে খেলোয়াড়দের আধুনিক প্রশিক্ষণে হাজার হাজার $ (ডলার) ব্যয় করা হয়, সেখানে এই কিশোরীরা সাধারণ পরিবেশে কেবল মাটির সঙ্গে লড়াই করে এতদূর এসেছে। তাদের এই লড়াকু মনোভাব দেখে এলাকার অভিভাবকেরা এখন নিজেদের মেয়েদের খেলাধুলায় উৎসাহ দিচ্ছেন। গ্রামের মুরব্বিরা বলছেন, প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পেলে এই মেয়েরাই একদিন লাল-সবুজ পতাকা বিশ্বমঞ্চে নিয়ে যাবে।
দলের প্রধান খেলোয়াড়রা জানায়, কুমিল্লায় অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া জাতীয় আসর নিয়ে তারা কোনো প্রকার বাড়তি চাপ অনুভব করছে না। মাঠে নিজেদের সেরাটা দিতে তারা মানসিকভাবে ৯০% প্রস্তুত। দ্রুত রেইড দিয়ে পয়েন্ট আনা এবং শক্তিশালী ট্যাকল করে প্রতিপক্ষকে আটকে ফেলার নানা কৌশল তারা ইতিমধ্যে রপ্ত করেছে। বিদ্যালয়ের ক্রীড়া শিক্ষকেরা কুমিল্লা রওনা হওয়ার আগে দলের প্রত্যেকের শারীরিক ফিটনেস ও মানসিক শক্তির ওপর জোর দিয়েছেন। মেয়েদের চোখে-মুখে এখন শুধু একটিই স্বপ্ন, তারা জাতীয় মঞ্চে সেরা হয়ে তবেই ঘরে ফিরবে।
শিক্ষাবিদ ও স্থানীয় সমাজসেবকদের মতে, গ্রামীণ নারীদের এগিয়ে নিতে এমন অর্জন বিরাট প্রেরণা হিসেবে কাজ করবে। কাতলা গাড়ি বিদ্যালয়ের এই ঘটনাটি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল যে, বড় মাঠ না থাকলেও বড় স্বপ্ন দেখা যায়। তবে দীর্ঘমেয়াদে ভালো ফল পেতে হলে সরকারের উচিত বিদ্যালয়টিতে অন্তত ০১টি নিজস্ব খেলার মাঠের ব্যবস্থা করা। সেইসঙ্গে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে মেয়েদের জন্য নিয়মিত পুষ্টিকর খাবার ও বুট-জার্সির মতো প্রয়োজনীয় ক্রীড়া সামগ্রী দিতে হবে।
কুমিল্লার শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত স্টেডিয়াম কিংবা নির্ধারিত ভেন্যুতে শুরু হতে যাওয়া জাতীয় পর্যায়ের এই আসরে অংশ নিতে পুরো দলটি এখন পুরোপুরি মুখিয়ে আছে। শৈলকুপা উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ এই কিশোরীদের আন্তরিক শুভকামনা জানিয়েছেন। এলাকার মানুষ আশা করছেন, বরিশাল ও খুলনার সেরা হয়ে যেভাবে কাতলা গাড়ির মেয়েরা সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে, ঠিক সেভাবেই তারা জাতীয় মঞ্চেও বড় ধরনের চমক দেখাবে। তাদের এই অদম্য লড়াই প্রমাণ করে যে, সঠিক পরিচর্যা পেলে প্রত্যন্ত পল্লীর মেয়েরাও জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইতিহাস রচনা করতে সক্ষম।
















