ট্রাম্পের ঘোষণায় ইরানে হামলা স্থগিত: মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি চুক্তির অপেক্ষায় বিশ্ব

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email
Donald-Trump

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এবং চরম অস্থিরতার অবসান ঘটাতে অবশেষে একটি বড় আশার আলো দেখা যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে চলমান রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ বন্ধের চুক্তিতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ চূড়ান্ত সম্মতি দিয়েছে। এই চুক্তির খসড়া অনুমোদন পাওয়ার পর তিনি ইরানে বড় ধরনের সামরিক হামলার যে পরিকল্পনা করেছিলেন, তা পুরোপুরি বাতিল করেছেন। বৃহস্পতিবার রাতেই ইরানে এই ধ্বংসাত্মক হামলা চালানোর কথা ছিল। ট্রাম্পের এমন আকস্মিক ঘোষণায় বিশ্বজুড়ে মানুষ কিছুটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলছে। কারণ, এই যুদ্ধের ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম একলাফে প্রায় ৩০% বেড়ে গিয়েছিল। প্রতিদিন বিশ্ব অর্থনীতিতে কয়েক বিলিয়ন ডলার ($) লোকসান হচ্ছিল।

বৃহস্পতিবার নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে একটি দীর্ঘ পোস্ট দেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। সেখানে তিনি বিস্তারিতভাবে বলেন, চুক্তির চূড়ান্ত বিষয়গুলো এবং এর খুঁটিনাটি সব পক্ষই মেনে নিয়েছে। এই ‘সব পক্ষ’ বলতে তিনি চুক্তির সঙ্গে জড়িত যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, তুরস্ক, পাকিস্তান, বাহরাইন, কুয়েত, জর্ডান ও মিসরের কথা উল্লেখ করেন। এই শান্তি আলোচনায় পাকিস্তানের মধ্যস্থতা বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে বলে জানা গেছে। দক্ষিণ এশিয়ার একটি দেশ হিসেবে পাকিস্তানের এমন উদ্যোগ বাংলাদেশসহ পুরো অঞ্চলের জন্যই একটি দারুণ খবর। কারণ মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি মানেই পুরো এশিয়ার জন্য বিশাল স্বস্তি।

হোয়াইট হাউসে গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প এই চুক্তি সই হওয়ার স্থান ও সময় সম্পর্কে ধারণা দেন। তিনি বলেন, চলতি সপ্তাহের ছুটির দিনগুলোতে ইউরোপের কোনো একটি দেশে এই ঐতিহাসিক চুক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে সই হবে। তবে তিনি নিজে এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন না। তার বদলে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স দেশের হয়ে সেখানে প্রতিনিধিত্ব করবেন। ট্রাম্প জোরালোভাবে বলেন, এই চুক্তি সই হওয়ার পরপরই দীর্ঘ দিন ধরে বন্ধ থাকা হরমুজ প্রণালি সব ধরনের বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে। বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় ২০% এই একটি মাত্র প্রণালি দিয়ে পরিবহন হয়। এটি বন্ধ থাকায় বিশ্বজুড়ে শিপিং কোম্পানিগুলোকে প্রতিদিন মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার ($) বাড়তি খরচ করতে হচ্ছিল।

ইরানের ওপর পূর্বনির্ধারিত হামলার পরিকল্পনা ঠিক কেন স্থগিত করলেন, সেটিরও একটি পরিষ্কার ব্যাখ্যা দেন ট্রাম্প। তিনি জানান, তেহরানের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব এবং ওই অঞ্চলের একাধিক দেশ চুক্তির খসড়ায় নিজেদের সম্মতি জানিয়েছে। তাদের এই অনুমোদনের খবর পাওয়ার পরই তিনি বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ইরানে বোমাবর্ষণের নির্দেশ প্রত্যাহার করেন। তিনি বলেন, আলোচনা সফল হওয়ায় এবং সবাই রাজি থাকায় এখন আর নতুন করে কোনো সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার দরকার নেই। আমরা একটি সুন্দর চুক্তির মাধ্যমে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান করতে যাচ্ছি।

তবে ট্রাম্প এত জোর দিয়ে চুক্তির কথা বললেও, ইরানের পক্ষ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন সুর শোনা যাচ্ছে। তেহরান সরকার এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে এই চুক্তির বিষয়ে কোনো ঘোষণা দেয়নি। উল্টো, ইরানের পরিচিত বার্তা সংস্থা ফারস এক নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো চুক্তির খসড়া তেহরান এখনো অনুমোদন করেনি। আরেক বার্তা সংস্থা তাসনিম নিউজ ট্রাম্পের এই ঘোষণাকে সরাসরি নাকচ করে দিয়েছে। তারা সাধারণ মানুষকে সতর্ক করে বলেছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট এর আগেও এমন অনেক ঘোষণা দিয়েছেন, শেষ পর্যন্ত যার কোনো বাস্তব ভিত্তি খুঁজে পাওয়া যায়নি। তাই ইরান সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু না বলা পর্যন্ত ট্রাম্পের কথায় বিশ্বাস করা মোটেও ঠিক হবে না।

এই সংঘাতের শুরুটা হয়েছিল গত ১৮ ফেব্রুয়ারি। ওই দিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের ভেতরে সরাসরি সামরিক হামলা চালায়। এর কড়া জবাব দিতে ইরানও চুপ করে বসে থাকেনি। তারা উপসাগরীয় বিভিন্ন দেশে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও ইসরায়েলের নানা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় পাল্টা রকেট ও ড্রোন হামলা করে। এর ফলে পুরো মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে একটি সর্বাত্মক যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে। এরপর বিশ্বনেতাদের চাপে ৮ এপ্রিল ওয়াশিংটন ও তেহরান একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর করলেও সেটি বেশি দিন টেকেনি। গত কয়েক দিনে দুই পক্ষ আবারও পাল্টাপাল্টি হামলায় জড়ালে নতুন করে আতঙ্ক তৈরি হয়। পর্দার অন্তরালে অনেক দিন ধরেই আলোচনা চলছিল, যার ফলশ্রুতিতেই ট্রাম্প এই নতুন চুক্তির কথা জানালেন।

বাংলাদেশি সাধারণ মানুষ এবং অর্থনীতির জন্য এই সংঘাত ও চুক্তির বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে আমাদের প্রায় ৫০ লাখ প্রবাসী বাংলাদেশি হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে কাজ করেন। তারা প্রতি বছর দেশে প্রায় ২০ থেকে ২৫ বিলিয়ন ডলার ($) রেমিট্যান্স পাঠান। এই অঞ্চলে যুদ্ধ যদি আরও বড় আকার ধারণ করে, তবে প্রবাসীদের জীবন ও কর্মসংস্থান চরম ঝুঁকিতে পড়বে। এছাড়া যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম যদি আবার বেড়ে যায়, তবে বাংলাদেশেও পরিবহন খরচ বাড়বে এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম হু হু করে বাড়বে। তাই ট্রাম্পের এই চুক্তির ঘোষণা যেন খুব দ্রুত বাস্তবে রূপ নেয় এবং মধ্যপ্রাচ্যে আবার শান্তি ফিরে আসে, এমনটাই এখন এদেশের সবার প্রত্যাশা।

সম্পর্কিত নিবন্ধ