কাতার বিশ্বকাপ ২০২২-এর আয়োজক হিসেবে প্রথমবার ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে পা রেখেছিল। কিন্তু ঘরের মাঠের সেই আসরে তারা কোনো পয়েন্ট পায়নি। এবার ২০২৬ বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচেই তারা দারুণ এক চমক দেখাল। শনিবার সান ফ্রান্সিসকো বে এরিয়ায় অনুষ্ঠিত নিজেদের প্রথম ম্যাচে শক্তিশালী সুইজারল্যান্ডকে ১-১ গোলে রুখে দিয়ে কাতার তুলে নিয়েছে তাদের বিশ্বকাপ ইতিহাসের প্রথম পয়েন্ট। ম্যাচের একদম শেষ মুহূর্তে, ইনজুরি টাইমের ৯৪তম মিনিটে বুয়ালেম খৌখির করা এক দুর্দান্ত হেড কাতারের জন্য এই ঐতিহাসিক মুহূর্তটি এনে দেয়। এই ড্রয়ের ফলে সুইসদের হতাশায় ডুবতে হয়েছে, কারণ পুরো ম্যাচজুড়ে দাপট দেখিয়েও তারা জয় নিয়ে মাঠ ছাড়তে পারেনি।
ম্যাচের শুরু থেকেই সুইজারল্যান্ড ফেভারিট হিসেবে মাঠে নামে। প্রথমার্ধের শুরুর দিকেই ব্রিল এমবোলোর করা একটি পেনাল্টি গোলে তারা লিড নিয়েছিল। এরপর তারা আরও অনেক গোলের সুযোগ তৈরি করে, কিন্তু সেগুলো কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়। অন্যদিকে কাতারের জন্য এই ম্যাচটি ছিল বেশ চ্যালেঞ্জিং। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে তাদের দুটি প্রস্তুতি ম্যাচ বাতিল হয়ে গিয়েছিল। ফলে গত বছরের ডিসেম্বর মাসের পর এটি ছিল তাদের মাত্র তৃতীয় ম্যাচ। ম্যাচ প্র্যাকটিসের অভাবে কাতারের খেলোয়াড়দের মাঝে কিছুটা জড়তা বা ‘রাস্টি’ ভাব দেখা যাচ্ছিল। পুরো ম্যাচে সুইজারল্যান্ড যেখানে মোট ২৬টি শট নিয়েছে, সেখানে কাতার ছিল অনেকটাই ব্যাকফুটে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ৩৫ বছর বয়সী খৌখির সেই এক হেডেই কাতারের বেঞ্চে বাঁধভাঙা উল্লাস শুরু হয়।
এই ম্যাচটি কাতারের স্প্যানিশ কোচ হুলেন লোপেতেগির জন্যও একটি বিশেষ ও আবেগময় মুহূর্ত ছিল। ৫৯ বছর বয়সী এই অভিজ্ঞ কোচ শনিবার তাঁর ক্যারিয়ারের প্রথম বিশ্বকাপ ম্যাচে ডাগআউটে দাঁড়ান। এর আগে ২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপে তাঁর নিজ দেশ স্পেনের কোচ হিসেবে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বিশ্বকাপের ঠিক কয়েক দিন আগে রিয়াল মাদ্রিদের সঙ্গে চুক্তির খবর ফাঁস হয়ে যাওয়ায় তাকে হঠাৎ করেই বরখাস্ত করা হয়েছিল। এবার কাতারের হয়ে সেই অপূর্ণ স্বপ্ন পূরণ করলেন তিনি এবং প্রথম ম্যাচেই পয়েন্ট পেয়ে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিলেন।
সুইজারল্যান্ডের কোচ মুরাত ইয়াকিন অবশ্য দলের পারফরম্যান্স নিয়ে বেশ চিন্তিত হবেন। টানা চতুর্থবারের মতো বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে যাওয়ার লক্ষ্য নিয়ে তারা এবার মাঠে নেমেছে। কিন্তু পুরো ম্যাচ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেও, এতগুলো সুযোগ তৈরি করেও তারা ম্যাচটি শেষ করতে পারেনি। ম্যাচের একদম দ্বিতীয় মিনিটেই সুইস ডিফেন্ডার মানুয়েল আকাঞ্জির একটি মারাত্মক ভুলের কারণে কাতারের এদমিলসন জুনিয়র গোল করার সুবর্ণ সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি সুইস গোলরক্ষক গ্রেগর কোবেলের হাতে খুব দুর্বল একটি শট মারেন। এই ভুলের পর সতর্ক হয়ে ওঠে সুইজারল্যান্ড এবং ১৩ মিনিটের মাথায় তারা একটি পেনাল্টি আদায় করে নেয়। কাতারের গোলরক্ষক মাহমুদ আবুনাদা ডি-বক্সের ভেতর রেমো ফ্রয়েলারকে ফাউল করলে রেফারি পেনাল্টির বাঁশি বাজান। যদিও সেখানে অফসাইডের একটি সন্দেহ ছিল, তবে চার মিনিট ধরে ভিএআর (VAR) চেকের পর পেনাল্টি বহাল থাকে এবং এমবোলো গোলরক্ষককে ভুল দিকে পাঠিয়ে বল জালে জড়ান।
প্রথমার্ধের বাকি সময়টা ছিল পুরোপুরি একপেশে। সুইসরা একের পর এক আক্রমণ করে কাতারের রক্ষণভাগকে ব্যতিব্যস্ত করে রাখে। তবে প্রথমার্ধের ঠিক আগে এদমিলসন আবারও একটি বিরল সুযোগ পান এবং তাঁর ডান পায়ের জোরালো শট কোবেল কোনোমতে রুখে দেন। ক্যালিফোর্নিয়ার প্রখর রোদের নিচে দ্বিতীয়ার্ধে দুই দলেরই আক্রমণের ধার কিছুটা কমে যায়। এই অর্ধে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সুযোগগুলো ছিল গ্রানিত জাকার একটি দূরপাল্লার শট যা ক্রসবারের সামান্য ওপর দিয়ে চলে যায় এবং এমবোলোর একটি শট যা সাইড নেটিংয়ে আঘাত করে।
কিন্তু ফুটবল যে অনিশ্চয়তার খেলা, তা আবারও প্রমাণিত হলো এই ম্যাচে। সুইসরা তাদের সুযোগ নষ্ট করার চরম মূল্য চো্কায় ম্যাচের একেবারে শেষ মুহূর্তে। ৯৪তম মিনিটে বুয়ালেম খৌখি পেছনের পোস্ট দিয়ে দৌড়ে এসে বুলেটের মতো এক হেডে বল জালে জড়িয়ে কাতারের জন্য ১-১ গোলের সমতা আনেন। এই ড্র কাতারের আত্মবিশ্বাস অনেক গুণ বাড়িয়ে দেবে। আগামী বৃহস্পতিবার লস অ্যাঞ্জেলেসে সুইজারল্যান্ড তাদের পরবর্তী ম্যাচে বসনিয়ার মুখোমুখি হবে। একই দিনে কাতার ভ্যাঙ্কুভারে টুর্নামেন্টের অন্যতম সহ-আয়োজক কানাডার বিপক্ষে মাঠে নামবে।















