চট্টগ্রাম জেলার পটিয়া উপজেলার হাবিলাসদ্বীপ গ্রামে সম্প্রতি চুরি, ডাকাতি ও মাদকের মতো অসামাজিক এবং বেআইনি কর্মকাণ্ড ব্যাপক হারে বেড়ে গেছে। রাতের অন্ধকারে মঠ-মন্দির ও সাধারণ মানুষের বাড়িঘরে দুর্ধর্ষ চুরির ঘটনায় গ্রামবাসীর মনে চরম আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে। এই অরাজক পরিস্থিতির তীব্র প্রতিবাদ জানাতে এবং গ্রামে শান্তি ফিরিয়ে আনতে হাবিলাসদ্বীপ গ্রামের সকল ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠন একজোট হয়ে এক বিশাল প্রতিবাদ সভার আয়োজন করে। হাবিলাসদ্বীপ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এই সভায় গ্রামের সর্বস্তরের মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেন। শ্রী তিলেকেশ্বর বিশ্বাসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে অপরাধীদের বিরুদ্ধে কড়া হুঁশিয়ারি দেন পটিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জিয়াউল হক।
সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে ওসি জিয়াউল হক চুরি ও মাদকের বিস্তারের বিরুদ্ধে পুলিশের অত্যন্ত কঠোর অবস্থানের কথা স্পষ্ট করে জানিয়ে দেন। তিনি বলেন, “অন্যায় ও অনাচারের বিরুদ্ধে গ্রামের সাধারণ মানুষ যেভাবে একজোট হয়ে আজ এগিয়ে এসেছেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। সমাজ থেকে অপরাধ দূর করতে পুলিশের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের এমন অংশগ্রহণ ১০০% জরুরি। চুরি ও মাদকের বিরুদ্ধে আমাদের পুলিশ প্রশাসনের জিরো টলারেন্স বা ০% ছাড় দেওয়ার নীতি গ্রহণ করা আছে। আমরা ইতিমধ্যে অপরাধীদের চিহ্নিত করার কাজ শুরু করেছি এবং তাদের সবাইকে অবশ্যই কঠোর শাস্তির আওতায় আনা হবে।” তিনি উপস্থিত গ্রামবাসীকে আশ্বস্ত করে বলেন, গ্রামবাসীর জানমালের নিরাপত্তার স্বার্থে পুলিশ প্রশাসন দিনরাত ২৪ ঘণ্টা কাজ করে যাবে এবং কোনো অপরাধীই অপরাধ করে পার পাবে না। পটিয়ার মাননীয় সংসদ সদস্যও এই একই লক্ষ্যে প্রশাসনের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করে চলেছেন।
এই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবাদ সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কালারপোল পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ ইন্সপেক্টর শাহীন মিয়া এবং দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ও হাবিলাসদ্বীপ ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান শফিকুল ইসলাম শফিক। ইন্সপেক্টর শাহীন মিয়া তার বক্তব্যে বলেন, অপরাধীরা যতই শক্তিশালী হোক না কেন, তাদের কোনো অবস্থাতেই বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না। পুলিশ এই লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে এবং খুব শিগগিরই গ্রামবাসী এর ইতিবাচক সুফল ভোগ করবেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
বিশেষ অতিথি সাবেক চেয়ারম্যান শফিকুল ইসলাম শফিক তার দীর্ঘ রাজনৈতিক ও সামাজিক অভিজ্ঞতার আলোকে অত্যন্ত দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, “হাবিলাসদ্বীপবাসীর নিরাপত্তা ও শান্তির বিষয়টি আমার কাজের অগ্রাধিকারের তালিকায় একেবারে শীর্ষে আছে। আমরা সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে অপরাধীদের চিহ্নিত করে প্রশাসনের সহযোগিতা নিয়ে কাজ করছি। মাননীয় সংসদ সদস্যও পটিয়ার জনস্বার্থে নিরলসভাবে কাজ করছেন।” তিনি আরও বলেন, সবার ঐক্যবদ্ধ ও আন্তরিক প্রয়াস থাকলে এই অরাজক পরিস্থিতি মোকাবিলা করা খুব সহজ একটি কাজ। তিনি গ্রামবাসীকে বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনে পদ-পদবি লাভের অসুস্থ প্রতিযোগিতা এবং নিজেদের ব্যক্তিগত হীনস্বার্থ পরিহার করে একজন সচেতন নাগরিকের ভূমিকা পালন করার জোরালো আহ্বান জানান।
শফিকুল ইসলাম শফিক আরও বলেন, যেকোনো ধরনের অসামাজিক তৎপরতা নির্মূল করতে তারা রাজনৈতিক ও নীতিগতভাবে ১০০% অঙ্গীকারবদ্ধ। তিনি গ্রামবাসীকে সাহস জুগিয়ে বলেন, তিনি সব সময় হাবিলাসদ্বীপের জনগণের পক্ষে আছেন এবং যেকোনো খারাপ পরিস্থিতি মোকাবিলায় গ্রামবাসী তাকে সব সময় নিজেদের পাশে পাবেন। তিনি শুধু গ্রামের মানুষের একটি ইতিবাচক ভূমিকার প্রত্যাশা করেন, যা তাদের কাজের গতিকে সফলভাবে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।
এই প্রতিবাদ সভায় এলাকার অনেক বিশিষ্ট সমাজসেবক, শিক্ষানুরাগী ও ধর্মীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন। তাদের মধ্যে হাবিলাসদ্বীপ ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেন, সাবেক ফাইন্যান্স কন্ট্রোলার শ্রী দীপক কান্তি সরকার, গৌর গোবিন্দ আশ্রমের সাবেক সভাপতি শ্রী কাজল দত্ত, হাবিলাসদ্বীপ রাস মহোৎসব উদ্যাপন পরিষদের সভাপতি শ্রী পীযূষ কান্তি দাশ, সমাজসেবক শ্রী তপন চৌধুরী এবং গৌর গোবিন্দ আশ্রমের সভাপতি শ্রী প্রদীপ কুমার চৌধুরী উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও গৌর গোবিন্দ আশ্রমের সাধারণ সম্পাদক শ্রী ত্রিদিব কুমার দত্ত শিমুল, বিবেকানন্দ মঠের সভাপতি শ্রী উত্তম কুমার মজুমদার সজল, সমাজকল্যাণ সংসদের সভাপতি প্রকৌশলী কণক কান্তি চৌধুরী, রামকৃষ্ণ সেবাশ্রমের সভাপতি শ্রী সমর নন্দী, জনকল্যাণ সংঘের সাধারণ সম্পাদক শ্রী দোলন দত্ত, কাত্যায়ণী সংঘের সাধারণ সম্পাদক শ্রী পুলক দাশগুপ্ত রাসু এবং স্থানীয় সাংবাদিক হারুনুর রশিদ সেখানে উপস্থিত ছিলেন। পুরো প্রতিবাদ সভাটি অত্যন্ত সাবলীলভাবে সঞ্চালনা করেন রামকৃষ্ণ সেবাশ্রমের সাধারণ সম্পাদক শ্রী দেবাশীষ চৌধুরী।
উপস্থিত অন্যান্য অতিথিরা তাদের বক্তব্যে হাবিলাসদ্বীপে সাম্প্রতিককালে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন বেআইনি ও সমাজগর্হিত অপরাধ কর্মকাণ্ডের বিস্তারিত চিত্র সবার সামনে তুলে ধরেন। তারা বিশেষ করে মঠ-মন্দির ও বাড়িঘরে চুরির ঘটনাগুলোতে চরম উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং হাবিলাসদ্বীপবাসীর পূর্ণ নিরাপত্তা দাবি করেন। তারা মনে করেন, দেশে মাদকের কারণে প্রতি বছর মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার ($) বা হাজার হাজার কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে এবং যুবসমাজ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। তাই তারা অবিলম্বে জোরালো ও দৃশ্যমান প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ কামনা করেন। একই সঙ্গে তারা সমাজে শান্তি ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে দলমত নির্বিশেষে সবার মাঝে সামাজিক ঐক্য বজায় রাখার প্রতি বিশেষ জোর দেন।
















