নেত্রকোনায় চাঁদাবাজির মামলায় ‘জামায়াত নেতা’ উল্লেখ করে প্রকাশিত সংবাদের তীব্র প্রতিবাদ

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

গণমাধ্যমকে বলা হয় রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ। সাধারণ মানুষ খবরের কাগজের প্রতিটি শব্দকে সত্য বলে বিশ্বাস করে। কিন্তু কোনো খবর যদি অসম্পূর্ণ বা বিভ্রান্তিকর হয়, তবে তা ব্যক্তি বা সংগঠনের জন্য অনেক বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে। সম্প্রতি নেত্রকোনা জেলায় চাঁদাবাজির একটি মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া এক ব্যক্তিকে ‘জামায়াত নেতা’ হিসেবে উল্লেখ করে বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। এই খবরের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, নেত্রকোনা জেলা শাখা। তারা দাবি করেছে, এই সংবাদটি সম্পূর্ণ বিভ্রান্তিকর এবং দলের ভাবমূর্তি নষ্ট করার জন্য উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে প্রচার করা হয়েছে।

গত ১৬ ও ১৭ জুন দেশের বেশ কয়েকটি প্রথম সারির জাতীয় দৈনিক পত্রিকা এবং বিভিন্ন জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টালে একটি খবর বেশ ফলাও করে ছাপা হয়। খবরটির শিরোনাম ছিল, “নেত্রকোনায় চাঁদাবাজির মামলায় জামায়াত নেতা কারাগারে।” এই শিরোনামটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বেশ আলোড়ন তৈরি করে। এরপরই বুধবার (১৮ জুন) নেত্রকোনা জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি ও প্রচার-মিডিয়া সম্পাদক জহিরুল ইসলাম দলটির পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে একটি আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদলিপি পাঠান। সেখানে তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ও যৌক্তিক কিছু তথ্য তুলে ধরে প্রকাশিত খবরের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

জামায়াত নেতাদের দেওয়া প্রতিবাদলিপির মূল দাবিটি বেশ চমকপ্রদ। তারা জানান, ওই চাঁদাবাজির মামলার প্রধান আসামি মো. নজরুল ইসলাম মাত্র কয়েক মাস আগে, অর্থাৎ ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীতে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগদান করেন। কিন্তু সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, যে চাঁদাবাজির মামলায় পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে বর্তমানে কারাগারে পাঠিয়েছে, সেই মামলাটি দায়ের করা হয়েছিল ২০২৫ সালের ১৩ জুলাই। অর্থাৎ, মামলার উল্লেখিত ঘটনার সময় নজরুল ইসলাম জামায়াতের কোনো সদস্য বা নেতাই ছিলেন না। ঘটনা ঘটার অন্তত ছয় মাস পর তিনি দলে যোগ দিয়েছেন। তাই তাকে ‘জামায়াত নেতা’ হিসেবে উপস্থাপন করা ১০০% অযৌক্তিক বলে দলটির নেতারা দাবি করেন।

প্রতিবাদলিপিতে গণমাধ্যমের ভূমিকারও কড়া সমালোচনা করা হয়েছে। জামায়াত নেতারা অভিযোগ করে বলেন, ওই চাঁদাবাজির মামলায় নজরুল ইসলাম একা আসামি নন। মামলার এজাহারে আরও একাধিক ব্যক্তির নাম উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু সাংবাদিকরা তাদের সংবাদে অন্য আসামিদের নাম বা রাজনৈতিক পরিচয় একবারের জন্যও উল্লেখ করেননি। তারা শুধুমাত্র নজরুল ইসলামকে হাইলাইট করে তাকে ‘জামায়াত নেতা’ হিসেবে ট্যাগ দিয়েছেন। দলের নেতাদের মতে, এটি ইচ্ছাকৃতভাবে জামায়াতে ইসলামীর পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তিকে সাধারণ মানুষের কাছে ক্ষুণ্ন করার একটি গভীর অপচেষ্টা ছাড়া আর কিছুই নয়।

মামলার পেছনের আসল ঘটনা কী, সে বিষয়েও জামায়াত তাদের নিজস্ব অবস্থান পরিষ্কার করেছে। প্রতিবাদলিপিতে উল্লেখ করা হয় যে, মো. রুবেল রানা নামের এক ব্যক্তি এই মামলাটি দায়ের করেছেন। মূলত রুবেল রানার একটি পারিবারিক লেনদেনসংক্রান্ত বিরোধ ছিল। সেই বিরোধ মীমাংসা করার জন্য এলাকার আরও অনেকের মতো নজরুল ইসলামও সামাজিকভাবে সেখানে হস্তক্ষেপ করেছিলেন। সেই সামাজিক মীমাংসার জেরে ক্ষুব্ধ হয়েই রুবেল রানা নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে ২০ লাখ টাকা বা বর্তমান হিসাবে প্রায় ১৭,০০০$ (ডলার) চাঁদা দাবির এই মিথ্যা অভিযোগ এনে মামলা ঠুকে দেন। এটি কোনো রাজনৈতিক চাঁদাবাজির ঘটনা নয়, বরং সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত ও সামাজিক রেষারেষির ফল।

আমাদের দেশের রাজনীতিতে অনেক সময় মিথ্যা মামলা দিয়ে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার চেষ্টা করা হয়। মানবাধিকার কর্মীদের একটি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে দায়ের হওয়া মামলার প্রায় ৩০% থেকে ৪০% মামলাই হয়রানি করার উদ্দেশ্যে বা ব্যক্তিগত শত্রুতার জেরে করা হয়। নেত্রকোনা জেলা জামায়াতের পক্ষ থেকে অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বলা হয় যে, তারা দেশের প্রচলিত আইনের প্রতি ১০০% শ্রদ্ধাশীল। তারা বিশ্বাস করেন, আদালতের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমেই এই মামলার পেছনের প্রকৃত সত্য একদিন ঠিকই উদঘাটিত হবে এবং যারা প্রকৃত অপরাধী, তারাই সঠিক শাস্তি পাবে। কোনো নিরপরাধ মানুষ যেন হয়রানির শিকার না হন, সেটাই তাদের মূল চাওয়া।

সবশেষে প্রতিবাদলিপিতে দেশের সাংবাদিক সমাজের প্রতি একটি ইতিবাচক আহ্বান জানানো হয়। জামায়াত নেতারা সাংবাদিকতাকে রাষ্ট্রের অত্যন্ত সম্মানজনক চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে উল্লেখ করেন। তারা বলেন, সাধারণ মানুষ সাংবাদিকদের লেখনীর ওপর অনেক বেশি ভরসা রাখে। তাই সাংবাদিকদের উচিত কোনো রাজনৈতিক রং না লাগিয়ে সম্পূর্ণ সঠিক, বস্তুনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষ তথ্য সাধারণ পাঠকের সামনে তুলে ধরা। তারা আশা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যতে গণমাধ্যমগুলো এমন স্পর্শকাতর সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে আরও অনেক বেশি দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেবে এবং কোনো দল বা ব্যক্তির সম্মান নষ্ট করার আগে অন্তত ১০ বার তথ্য যাচাই করে নেবে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ