চুয়াডাঙ্গা বিএডিসি ফার্মের পরিত্যক্ত কোয়ার্টার এখন মাদকের স্বর্গরাজ্য: নিরাপত্তাহীনতায় এলাকাবাসী

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

চুয়াডাঙ্গায় বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের (বিএডিসি) ফার্মের চরম অবহেলা আর উদাসীনতায় সরকারের কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি এখন অপরাধীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। যথাযথ তদারকির অভাব এবং খামারের অভ্যন্তরে থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পুরনো পরিত্যক্ত স্টাফ কোয়ার্টারগুলো এখন মাদকসেবী ও উঠতি বয়সী কিশোর গ্যাংয়ের নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হয়েছে। স্থানীয়দের ভাষায়, এই এলাকাটি এখন চুয়াডাঙ্গার নতুন এক ‘মাদকের স্বর্গরাজ্য’। এর ফলে আশপাশের সাধারণ বাসিন্দা ও স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ১০০% নিরাপত্তাহীনতা আর চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, চুয়াডাঙ্গা বিএডিসি ফার্মের বেশ কয়েকটি আবাসিক কোয়ার্টার বহু বছর ধরে সংস্কারহীন অবস্থায় পড়ে আছে। রক্ষণাবেক্ষণ না হওয়ায় ভবনগুলোর দরজা, জানালা, এমনকি মূল্যবান লোহার গ্রিলও অনেক আগে চুরি হয়ে গেছে। বর্তমানে লতাপাতা আর ঝোপঝাড়ে ঘেরা এই ভাঙাচোরা কক্ষগুলোই অপরাধীদের জন্য উপযুক্ত আড়াল বা ‘সেফজোন’ হিসেবে কাজ করছে। এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, শুধু চুয়াডাঙ্গা শহর নয়, বরং বাইরের বিভিন্ন এলাকা থেকেও অপরাধীরা এসে এখানে ভিড় জমায়। দিনের আলোতেই এসব কক্ষে ফেনসিডিল, ইয়াবা ও গাঁজার কেনাবেচা চলে অবাধে।

স্থানীয় মানুষের দাবি, বিএডিসি ফার্ম এলাকাকে কেন্দ্র করে এলাকায় নতুন করে ‘কিশোর গ্যাং’ সংস্কৃতি গড়ে উঠছে। পাড়া-মহল্লার স্কুলগামী ছাত্ররা সহজেই এই অপরাধী চক্রের ফাঁদে পা দিচ্ছে এবং মাদকের নেশায় জড়িয়ে পড়ছে। সন্ধ্যার পর এই কোয়ার্টারগুলোর পরিবেশ আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। তখন এখানে পেশাদার জুয়াড়ি, ছিনতাইকারী ও ভাসমান অপরাধীদের মূল আস্তানা বসে। এই মাদক সিন্ডিকেটের যন্ত্রণায় সাধারণ মানুষের চলাচলের নিরাপত্তা এখন প্রায় ০ শতাংশে নেমে এসেছে। নেশার টাকা জোগাড় করতে এই অপরাধীরা বিএডিসি এলাকার সরকারি গাছ কেটে নিয়ে যাচ্ছে এবং সুযোগ বুঝে আশপাশের বাসাবাড়িতে চুরি-ছিনতাই করছে।

একজন ভুক্তভোগী বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “বিএডিসির মতো একটি নামী সরকারি প্রতিষ্ঠানের ভেতর এভাবে মাদকের হাট বসবে, এটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। কর্তৃপক্ষ সব দেখেও না দেখার ভান করে বসে আছে। আমরা চাই এই পরিত্যক্ত ভবনগুলো হয় দ্রুত সংস্কার করা হোক, না হলে একবারে গুঁড়িয়ে দেওয়া হোক। যেকোনো বড় ধরনের অঘটন ঘটার আগে প্রশাসনের টনক নড়া উচিত।” এলাকাবাসীর মতে, সন্ধ্যার পর এই এলাকা দিয়ে যাতায়াত করতে গেলে প্রায় ৮০% থেকে ৯০% ক্ষেত্রে ছিনতাইয়ের ভয় থাকে।

চুয়াডাঙ্গার সুশীল সমাজ ও সচেতন নাগরিকরা বলছেন, একটি সরকারি সম্পত্তি এভাবে অপরাধের চারণভূমি হতে দেওয়া যায় না। কর্তৃপক্ষের এই নীরবতা বা উদাসীনতা রহস্যজনক। তাদের মতে, শুধুমাত্র মাঝেমধ্যে পুলিশি অভিযান চালিয়ে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান করা সম্ভব নয়। এর জন্য বিএডিসি কর্তৃপক্ষকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। খামারের সীমানা প্রাচীর আরও উঁচূ করা এবং পুরো এলাকায় পর্যাপ্ত স্ট্রিট লাইট বা আধুনিক আলোর ব্যবস্থা করা এখন সময়ের দাবি। এছাড়া নিজস্ব নিরাপত্তা প্রহরীর সংখ্যা বাড়ানো হলে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড অন্তত ৭০% কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।

বিএডিসির এই পরিত্যক্ত কোয়ার্টারগুলোতে চলা অনৈতিক ও অবৈধ কর্মকাণ্ড রুখতে চুয়াডাঙ্গার জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন এলাকাবাসী। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, দ্রুত এই ঝোপঝাড় পরিষ্কার করে অপরাধীদের আস্তানাগুলো উচ্ছেদ করা হবে। দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ কৃষি উন্নয়ন খামার যেন মাদক আর কিশোর গ্যাংয়ের হাত থেকে রক্ষা পায়, সেই দাবিই এখন সবার মুখে মুখে। প্রশাসন দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে এই ‘মাদকের স্বর্গরাজ্য’ থেকে ভয়াবহ সামাজিক বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন সচেতন মহল।

সম্পর্কিত নিবন্ধ