রাশিয়ায় নির্মাণ শ্রমিকের বদলে যুদ্ধের ফ্রন্টলাইনে: ফিরে এসে বিভীষিকার গল্প শোনালেন ঝিনাইদহের রাজন

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার মালিয়াট ইউনিয়নের গয়েশপুর গ্রামের ২২ বছর বয়সী যুবক রাজন হোসেন। অভাবের সংসারে সচ্ছলতা আনতে চেয়েছিলেন, চেয়েছিলেন বাবা-মায়ের মুখে হাসি ফোটাতে। সেই স্বপ্ন নিয়ে দালালের মাধ্যমে মোটা অংকের টাকা খরচ করে গত ৭ মে পাড়ি জমিয়েছিলেন রাশিয়ায়। কিন্তু তিনি কি জানতেন, নির্মাণ শ্রমিকের কাজের বদলে তার হাতে তুলে দেওয়া হবে মরণঘাতী রাইফেল আর পরিয়ে দেওয়া হবে ভিনদেশের সেনাপোশাক? দালালের প্রতারণায় আজ রাজনের সেই রঙিন স্বপ্ন পরিণত হয়েছে এক বিভীষিকাময় দুঃস্বপ্নে। তিনি এখন পঙ্গু হয়ে বাড়িতে ধুঁকছেন।

রাজনের ভাষ্য অনুযায়ী, রাশিয়ায় পৌঁছানোর পরপরই তার মতো আরও প্রায় ৩০ জন বাংলাদেশি যুবককে একটি অজ্ঞাত সেনা ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীতে নাম লেখাতে বাধ্য করা হয়। মাত্র ২১ দিনের নামমাত্র সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়েই তাদের পাঠিয়ে দেওয়া হয় ইউক্রেনের যুদ্ধের একদম সামনে বা ফ্রন্টলাইনে। দালালেরা ১০০% কাজের নিশ্চয়তা দিলেও বাস্তবে তাদের কামানের গোলার মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল। রাশিয়ার সেনাবাহিনীর হয়ে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে রাজন যে অভিজ্ঞতার শিকার হয়েছেন, তা যেকোনো মানুষের রক্ত হিম করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

যুদ্ধের ময়দানের সেই ভয়ংকর স্মৃতি মনে করলে আজও শিউরে ওঠেন রাজন। জুন মাসে যখন তাদের রণক্ষেত্রে নামিয়ে দেওয়া হয়, তখন চারদিকে কেবল মৃত্যু আর বারুদের গন্ধ। রাজনের দাবি, যুদ্ধের প্রথম দিনেই ইউক্রেনীয় বাহিনীর ড্রোন ও গোলার আঘাতে তার সামনেই প্রাণ হারান ১৭ জন বাংলাদেশি সহযোদ্ধা। সেই ভয়াবহ ড্রোন হামলায় রাজন নিজেও গুরুতর জখম হন। ড্রোনের গোলার আঘাতে তার কোমরের নিচের অংশ নিস্তেজ হয়ে পড়ে। নিমেষেই একজন টগবগে যুবক পরিণত হন চলচ্ছক্তিহীন এক মানুষে। রণক্ষেত্রে তার মতো আরও অনেক বিদেশি নাগরিককে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছিল বলে তিনি জানান।

মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে আসার লড়াইটা ছিল আরও অবিশ্বাস্য। আহত অবস্থায় চার দিন ধরে প্রায় ৪ কিলোমিটার পথ তাকে বুক দিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে পার হতে হয়েছে। মাথার ওপর তখন চক্কর দিচ্ছিল ইউক্রেনীয় ড্রোন, পায়ের নিচে লুকানো ছিল মাইন আর সামনে ছিল ওতপেতে থাকা শত্রু সেনা। প্রাণের মায়ায় এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার সময় তিনি চারদিন এক ফোঁটা পানিও পান করতে পারেননি। চারপাশের লাশের স্তূপ আর বোমার শব্দে তার কান ফেটে যাচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত কোনোমতে রাশিয়ার একটি সামরিক হাসপাতালে তার ঠাঁই হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা পাওয়ার পর তিনি জীবন ফিরে পান।

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকাকালীন এক মহানুভব চিকিৎসকের সহায়তায় রাজন বাংলাদেশ দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করতে সক্ষম হন। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া এবং দূতাবাসের প্রচেষ্টায় গত ২১ আগস্ট ট্রাভেল পাস নিয়ে তিনি শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশে ফিরে আসেন। বাড়ি ফিরে আসার পর পরিবার তাকে জীবিত ফিরে পেলেও তাদের দুশ্চিন্তার শেষ নেই। রাজনের বাবা ধারদেনা করে এবং জমি বন্ধক রেখে ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়েছিলেন। এখন সেই ঋণের বোঝা আর পঙ্গু রাজনের আজীবনের চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন করা এই দরিদ্র পরিবারের পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

রাজন বর্তমানে ঝিনাইদহের বাড়িতে বিছানায় শুয়ে দিন কাটাচ্ছেন। তিনি কাঁদছিলেন আর বলছিলেন, “আমরা দালালের পা জড়িয়ে ধরে বলেছিলাম, আমাদের যুদ্ধে পাঠাবেন না, আমরা কাজ করতে এসেছি। কিন্তু তারা আমাদের মাফ করেনি।” তিনি আক্ষেপ করে বলেন, যারা তাদের এই বিপদে ফেলেছে, তারা আসলে মানুষ নয়, পিশাচ। রাজনের এই করুণ পরিণতি এখন প্রতিটি বিদেশগামী তরুণের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। দালালের কথায় প্রলুব্ধ হয়ে যাচাই-বাছাই না করে বিদেশে গেলে যে কতটা ভয়াবহ বিপদ হতে পারে, রাজন তার জলজ্যান্ত উদাহরণ।

কালীগঞ্জের এই যুবকটি এখন পঙ্গুত্ব বরণ করে সমাজের বিত্তবান ও সরকারের কাছে সাহায্যের আবেদন জানিয়েছেন। দালালেরা যে বিশাল অংকের টাকা হাতিয়ে নিয়েছে, তা উদ্ধার করা এখন তাদের অন্যতম দাবি। রাজনের মতো আর কোনো তরুণের স্বপ্ন যেন এভাবে যুদ্ধের ময়দানে বা দালালের খপ্পরে পড়ে ধুলোয় মিশে না যায়, সেটাই এখন সবার প্রত্যাশা। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যেন এই দালাল চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয় এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করে, এলাকাবাসী এখন সেই দাবিই তুলছেন।

সম্পর্কিত নিবন্ধ