কানাডার টরন্টো স্টেডিয়ামে রেফারির শেষ বাঁশি বাজার পর আইভরিকোস্টের খেলোয়াড়দের জন্য যে কারও খারাপ লাগতে পারে। এত কাছে এসেও হতাশা নিয়ে মাঠ ছাড়তে হয়েছে আফ্রিকার দলটিকে। এই ম্যাচের পর ইংল্যান্ডের সাবেক ফুটবলার গ্যারি লিনেকারের সেই বিখ্যাত উক্তিটি যেন নতুন করে প্রাণ পেল, “ফুটবল খুবই সহজ খেলা। ২২ জন মানুষ ৯০ মিনিট ধরে একটি বলের পেছনে ছোটে এবং শেষ পর্যন্ত জার্মানিই সব সময় জেতে।”
আইভরিকোস্ট লিনেকারের এই উক্তির চরম সত্যতা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে। ম্যাচের ৩০ মিনিটে অধিনায়ক ফ্রাঙ্ক কেসির দুর্দান্ত এক গোলে এগিয়ে গিয়েছিল তারা। সেই লিড তারা ধরে রেখেছিল ৬৭ মিনিট পর্যন্ত। কিন্তু এরপরই দৃশ্যপটে হাজির হন জার্মানির বদলি ফরোয়ার্ড দেনিজ উনদাভ। তার জোড়া গোলে শেষ পর্যন্ত জার্মানি ম্যাচটি ২-১ ব্যবধানে জিতে নেয়। আর এই রোমাঞ্চকর জয়ের মাধ্যমেই ২০১৪ সালের পর প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের নকআউট পর্ব নিশ্চিত করল চারবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন জার্মানি। উল্লেখ্য, ১২ বছর আগের সেই ২০১৪ বিশ্বকাপেই চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল জার্মানি, এরপর ২০১৮ এবং ২০২২ সালে টানা দুটি বিশ্বকাপে তারা গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিয়েছিল।
আইভরিকোস্টের তারকা আমাদ দিয়ালোদের জন্য এই হার সত্যিই মর্মান্তিক। ম্যাচের ৬৮ মিনিটে উনদাভ যখন প্রথম গোলটি করেন, তখন দুই দল ১-১ সমতায় ছিল। ম্যাচটি যদি ড্র হিসেবে শেষ হতো, তবে আইভরিকোস্ট অন্তত একটি মূল্যবান পয়েন্ট নিয়ে মাঠ ছাড়তে পারত। কিন্তু যোগ করা সময়ের চতুর্থ মিনিটে (৯৪ মিনিট) উনদাভ নিজের দ্বিতীয় গোলটি করে আইভরিকোস্টের সেই আশাও ধূলিসাৎ করে দেন।
ম্যাচের শুরুতে আইভরিকোস্ট অধিনায়ক কেসি বক্সের ভেতর থেকে দারুণ এক শটে গোল করে জার্মানিকে রীতিমতো কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন। পিছিয়ে পড়ার পর সমতাসূচক গোল পেতে মরিয়া হয়ে ওঠেন জার্মান কোচ ইউলিয়ান নাগলসমান। চারবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের বাঁচাতে তিনি ম্যাচের ৬০ মিনিটে একসঙ্গে তিনটি পরিবর্তন আনেন। আলেক্সান্ডার প্যাবলোভিচের জায়গায় নাদিম আমিরি, লিরয় সানের জায়গায় জেমি লেভেলিং এবং জামাল মুসিয়ালার জায়গায় দেনিজ উনদাভকে মাঠে নামান তিনি। কোচের এই সাহসী সিদ্ধান্তই মূলত ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। জার্মানির জয়ে আমিরি ও উনদাভ সরাসরি মুখ্য ভূমিকা রাখেন। উনদাভের করা প্রথম গোলটির নিখুঁত পাসটি এসেছিল আমিরির পা থেকেই।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুর দিকে মুসিয়ালার একটি ফাউলের কারণে জার্মান তারকা কাই হাভার্টজের করা একটি গোল ভিএআরে বাতিল হয়ে যায়। আইভরিকোস্টও দুই অর্ধে গোলের বেশ কয়েকটি ভালো সুযোগ নষ্ট করেছে। বিশেষ করে ৮৮ মিনিটে জার্মানির বক্সের ভেতরে বল পেয়ে তাদের ফরোয়ার্ড সাইমন আদিংনা কেন শট নিলেন না, তা নিয়ে অনেক প্রশ্ন উঠবে। সেটি আইভরিকোস্টের জন্য পরিষ্কার গোলের সুযোগ ছিল।
আগে গোল করে জার্মানিকে আসলেই ভয় পাইয়ে দিয়েছিল আইভরিকোস্ট। এই ম্যাচের আগে বিশ্বকাপে সর্বশেষ যে ১০টি ম্যাচে জার্মানি প্রথমে গোল হজম করেছিল, তার মধ্যে তারা জিতেছিল মাত্র একটিতে। এই পরিসংখ্যানই বলছিল, ম্যাচটি জেতা জার্মানির জন্য কতটা কঠিন হবে। তবে নাগলসমানের দল শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত হাল না ছাড়ায় পুরো ৩ পয়েন্ট তুলে নিতে পেরেছে।
পিছিয়ে পড়েও তুলে নেওয়া এই জয়ে বিশ্বকাপ পরিসংখ্যানের একটি বিশেষ পাতায় চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্রাজিলকে পেছনে ফেলেছে জার্মানি। খেলায় কোনো না কোনো সময় পিছিয়ে পড়েও শেষ পর্যন্ত জয় তুলে নেওয়ার ম্যাচসংখ্যায় জার্মানি এখন সবার ওপরে। বিশ্বকাপে এভাবে সর্বোচ্চ ১৬টি ম্যাচ জিতেছে জার্মানি। আর ব্রাজিল জিতেছে ১৫টি ম্যাচ।
বর্তমানে ‘ই’ গ্রুপে দুই ম্যাচ খেলে পূর্ণ ৬ পয়েন্ট নিয়ে শীর্ষে অবস্থান করছে জার্মানি। সমান ম্যাচ খেলে ৩ পয়েন্ট নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে আছে আইভরিকোস্ট। তৃতীয় স্থানে থাকা ইকুয়েডর এবং চতুর্থ স্থানে থাকা কুরাসাও একটি করে ম্যাচ খেললেও এখনো কোনো পয়েন্টের দেখা পায়নি। এই গ্রুপে আরও তিনটি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে, তবে জার্মানির নকআউট নিশ্চিত হওয়ায় তারা এখন বেশ ফুরফুরে মেজাজে থাকবে।
















