জলবায়ু পরিবর্তনের চরম বিরূপ প্রভাব এখন পুরো বিশ্বকেই ভাবিয়ে তুলেছে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং দেশের সবুজ প্রকৃতিকে আরও সম্প্রসারণ করতে সরকার সম্প্রতি একটি বিশাল ও দূরদর্শী প্রকল্প হাতে নিয়েছে। “পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা এবং আগামী প্রজন্মের জন্য সবুজ বাংলাদেশ গড়ি” এই চমৎকার প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে আগামী ৫ বছরে সারা দেশে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর এক বড় লক্ষ্য নিয়ে কাজ শুরু করেছে সরকার। এই বিশাল কর্মসূচির অংশ হিসেবে শনিবার, ১৩ জুন সকালে নীলফামারীর ডিমলা উপজেলাতেও অত্যন্ত উৎসবমুখর পরিবেশে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়েছে।
শনিবার সকালে ডিমলা ইসলামিয়া ডিগ্রি কলেজ মাঠে এই চমৎকার ও পরিবেশবান্ধব আয়োজনের উদ্বোধন করা হয়। ডিমলা উপজেলা প্রশাসন এবং ডিমলা উপজেলা বিএনপি যৌথভাবে এই অনুষ্ঠানের সার্বিক দায়িত্ব পালন করে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে এই কর্মসূচির শুভ সূচনা করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইমরানুজ্জামান এবং সহকারী কমিশনার (ভূমি) রওশন কবির। এই আয়োজনের মাধ্যমে উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি ও বেসরকারি দপ্তরের আঙিনা, সামাজিক সংগঠন এবং সাধারণ মানুষের মাঝে বিভিন্ন প্রজাতির ফলজ, বনজ ও ঔষধি গাছের চারা বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়। শিশু-কিশোরদের মধ্যে পরিবেশ সচেতনতা বাড়াতে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের হাতেও চারা তুলে দেওয়া হয়।
এই মহতী আয়োজনে উপজেলার শীর্ষ পর্যায়ের অনেক কর্মকর্তা ও গণ্যমান্য ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন। তাদের মধ্যে জেলা বিএনপির উপদেষ্টা অধ্যাপক রইসুল আলম চৌধুরী, জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য গোলাম রব্বানী প্রধান এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপজেলা দপ্তরের কর্মকর্তারা অন্যতম। এছাড়া স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, পরিবেশকর্মী ও সাধারণ মানুষ অত্যন্ত স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই আয়োজনে অংশগ্রহণ করেন। সবার চোখেমুখেই ছিল নিজেদের এলাকাকে সুন্দর ও সবুজ করে সাজানোর এক নতুন আশা ও উদ্দীপনা।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত বক্তারা পরিবেশ রক্ষার বিষয়ে অত্যন্ত গঠনমূলক ও সময়োপযোগী আলোচনা করেন। তারা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আমাদের দেশে এখন তাপমাত্রা বৃদ্ধি, নদীভাঙন, খরা, বন্যা ও পরিবেশগত নানা সংকট দেখা দিচ্ছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ব্যাপক হারে বৃক্ষরোপণের কোনো বিকল্প নেই। গাছ শুধু পরিবেশের ভারসাম্যই রক্ষা করে না, এটি বায়ুদূষণ কমানো, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং কার্বন নিঃসরণ হ্রাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি দেশের প্রাকৃতিক ভারসাম্য ঠিক রাখতে এর মোট আয়তনের অন্তত ২৫% বনভূমি থাকা প্রয়োজন। সেই জাতীয় লক্ষ্য সামনে রেখেই এই ২৫ কোটি গাছ লাগানোর বিশাল কর্মযজ্ঞ শুরু হয়েছে।
বক্তারা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়ের দিকে সবার নজর আকর্ষণ করেন। তারা বলেন, শুধু ঘটা করে গাছ রোপণ করলেই আমাদের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। রোপণ করা সেই ছোট চারাগুলো যাতে গবাদিপশু বা অন্য কোনো কারণে নষ্ট না হয়, সে জন্য সেগুলোর সঠিক পরিচর্যা ও নিয়মিত সংরক্ষণ ১০০% নিশ্চিত করতে হবে। একটি গাছ বড় হয়ে পরিবেশকে তার শতভাগ সুবিধা দিতে বেশ কয়েক বছর সময় নেয়। তাই একটি সবুজ, সুন্দর ও টেকসই বাংলাদেশ গড়তে সমাজের সকল শ্রেণি-পেশার মানুষকে শুধু গাছ লাগানো নয়, গাছ বাঁচানোর আন্দোলনেও শামিল হওয়ার জোরালো আহ্বান জানান তারা।
উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, এই বিশাল কর্মসূচির আওতায় পুরো ডিমলা উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি ও বেসরকারি কার্যালয়ের আঙিনা, খাসজমি, সড়কের দুই পাশ এবং সাধারণ মানুষের বসতবাড়ির আঙিনায় পর্যায়ক্রমে লাখ লাখ গাছের চারা রোপণ করা হবে। এসব চারার মধ্যে ফলদ, বনজ ও ঔষধি প্রজাতির গাছকে সবচেয়ে বেশি প্রধান্য দেওয়া হবে। একটি পূর্ণবয়স্ক ফলদ বা বনজ গাছ কয়েক বছর পর বিক্রি করলে বা এর ফল বাজারে বিক্রি করলে অনায়াসেই ৫০থেকে১০০(ডলার) বা ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা আয় করা সম্ভব। তাই এই গাছগুলো মানুষের জন্য শুধু পরিবেশ রক্ষাই করবে না, বরং তাদের জন্য একটি বড় অর্থনৈতিক সম্পদ হিসেবেও কাজ করবে।
অনুষ্ঠানের একেবারে শেষ পর্যায়ে এসে উপস্থিত অতিথি, শিক্ষার্থী ও স্বেচ্ছাসেবীরা মিলে কলেজ মাঠে নিজেদের হাতে বিভিন্ন প্রজাতির বৃক্ষরোপণ করেন। সবাই মিলে যত্ন নিলে আজকের এই ছোট চারাগাছগুলোই একদিন ডিমলাকে একটি নির্মল ও সতেজ সবুজ শহরে পরিণত করবে। বক্তারা “একটি গাছ, একটি প্রাণ” এই উপলব্ধি থেকে প্রত্যেক নাগরিককে অন্তত একটি করে গাছ রোপণ ও পরিচর্যার আহ্বান জানান। সাধারণ মানুষও এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন এবং তারা আশা করছেন প্রশাসন এই কর্মসূচির তদারকি নিয়মিত অব্যাহত রাখবে।
















