সকাল ঠিক সাড়ে ৯টা। ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের এক্সপো পোর্ত দ্য ভার্সাইয়ের প্রধান প্রবেশপথের সামনে তখন মানুষের দীর্ঘ সারি। হাতে ল্যাপটপের ব্যাগ আর চোখেমুখে একরাশ স্বপ্ন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আসা হাজার হাজার তরুণ উদ্যোক্তা। এদের মধ্যে কেউ এসেছেন নিজেদের নতুন স্টার্টআপের জন্য মিলিয়ন ডলার ($) বিনিয়োগের খোঁজে, কেউ এসেছেন বিশ্বের নতুন সব প্রযুক্তি দেখতে, আবার কেউবা এসেছেন বিশ্ববাজারে নিজেদের প্রতিষ্ঠানের পরিচয় তুলে ধরতে। কড়া নিরাপত্তা তল্লাশি পেরিয়ে বিশাল প্রদর্শনী হলে পা রাখতেই যে কারও চোখ কপালে উঠতে বাধ্য। চারদিকে একের পর এক বিশাল স্ক্রিন, মানুষের মতো রোবটের অবাধ চলাফেরা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) নানা প্রদর্শনী এবং প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে ব্যস্ত আলোচনা।
মুহূর্তেই বোঝা যায়, এটি কোনো সাধারণ মেলা বা প্রদর্শনী নয়। এটি হলো ‘ভিভাটেক ২০২৬’। ইউরোপের অন্যতম বৃহৎ প্রযুক্তি ও স্টার্টআপ সম্মেলন, যা এ বছর (১৭-২০ জুন) অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণভাবে উদ্যাপন করছে তার দশম বর্ষপূর্তি। ২০১৬ সালে অত্যন্ত ছোট পরিসরে যাত্রা শুরু করা ভিভাটেক গত এক দশকে প্রযুক্তি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও কাঙ্ক্ষিত মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। একসময় এটি ছিল মূলত সাধারণ স্টার্টআপ ও বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি প্ল্যাটফর্ম। কিন্তু আজ এটি শুধু ব্যবসার জায়গা নয়, বরং প্রযুক্তি, অর্থনীতি, কূটনীতি এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার একটি বিশাল মঞ্চে পরিণত হয়েছে।
প্রদর্শনী হলের ভেতরে ঢুকে প্রথমেই চোখে পড়ে এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার একচ্ছত্র আধিপত্য। এবারের পুরো সম্মেলনটিই যেন এই দুটি অক্ষরকে ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে। একটি স্টলে দেখা গেল, এআই মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে দর্শনার্থীর সাধারণ ছবি থেকে চমৎকার নতুন একটি প্রতিকৃতি তৈরি করে দিচ্ছে। অন্য একটি স্টলে দেখানো হচ্ছে কীভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চিকিৎসকদের খুব দ্রুত ও নির্ভুলভাবে জটিল রোগ শনাক্তকরণে সহায়তা করতে পারে। আরেক পাশে একটি হিউম্যানয়েড বা মানুষের মতো দেখতে রোবট দর্শনার্থীদের নানা কঠিন প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে খুব সহজেই। কয়েক বছর আগেও প্রযুক্তি সম্মেলনের আলোচনায় নতুন অ্যাপ বা নতুন ডিভাইসের প্রাধান্য থাকত। কিন্তু এবার এআই এখন অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও রাষ্ট্র পরিচালনার মূল আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে।
ভিভাটেকের করিডর থেকে শুরু করে মূল মঞ্চ সবখানেই এবার একটি প্রশ্ন খুব ঘুরেফিরে এসেছে: যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের এই তীব্র প্রযুক্তি প্রতিযোগিতার যুগে ইউরোপের অবস্থান আসলে কোথায়? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই হয়তো প্রযুক্তি সম্মেলনের মঞ্চে এখন শুধু উদ্যোক্তারাই নন, হাজির হচ্ছেন বিশ্বের বড় বড় রাষ্ট্রনায়কেরাও। এবারের ভিভাটেকে ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং লেবাননের প্রধানমন্ত্রী নাওয়াফ সালামের অংশগ্রহণ আন্তর্জাতিক মহলের ব্যাপক মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। এআই, সেমিকন্ডাক্টর, ডেটা সেন্টার এবং ডিজিটাল অর্থনীতি নিয়ে বিশ্বব্যাপী যে নতুন ও তীব্র প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে, রাষ্ট্রপ্রধানদের উপস্থিতি মূলত তারই বড় প্রতিফলন।
একসময় প্রযুক্তি ছিল শুধুই ব্যবসার বিষয়। কিন্তু এখন এটি ভূরাজনীতি এবং জাতীয় কৌশলের একটি অপরিহার্য অংশ। মূল মঞ্চে বিশ্বের শীর্ষ প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ও শিল্পনেতাদের উপস্থিতিও ছিল চোখে পড়ার মতো। অ্যামাজনের প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজোস থেকে শুরু করে ইউরোপীয় এআই খাতের অন্যতম আলোচিত ব্যক্তিত্ব আর্থার মেন্স সবার বক্তব্যেই উঠে এসেছে এআইয়ের সম্ভাবনা, ঝুঁকি এবং ভবিষ্যতের কথা। কেউ বলছেন, এআই শিল্পবিপ্লবের পর মানবসভ্যতার সবচেয়ে বড় প্রযুক্তিগত পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে, যা মানুষের উৎপাদনশীলতা অন্তত ৪০% থেকে ৫০% বাড়িয়ে দেবে। আবার কেউ সতর্ক করে বলছেন, প্রযুক্তির বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে এর নিয়ন্ত্রণ ও নৈতিকতার প্রশ্নও সমান গুরুত্ব পেতে হবে।
তবে ভিভাটেকের প্রকৃত প্রাণ ও আবেগ খুঁজতে হলে মূল মঞ্চ ছেড়ে চলে যেতে হয় স্টার্টআপ জোনে। সেখানে বড় প্রতিষ্ঠানের চাকচিক্য হয়তো কম, কিন্তু তরুণদের স্বপ্নের পরিমাণ অনেক বেশি। একটি ছোট বুথে দেখা গেল দুই তরুণ উদ্যোক্তা তাঁদের তৈরি নতুন সফটওয়্যার নিয়ে আগ্রহী দর্শনার্থীদের খুব যত্ন করে বোঝাচ্ছেন। আরেক কোণে কৃষি প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করা একটি স্টার্টআপ বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে মিলিয়ন ডলারের ($) চুক্তির বিষয়ে আলোচনা করছে। অনেক উদ্যোক্তার সঙ্গে কথা বলে বোঝা যায়, তাঁরা এখানে শুধু পণ্য দেখাতে আসেননি। তাঁরা এসেছেন ব্যবসার সহযোগী ও বিনিয়োগকারী খুঁজতে। একটি পাঁচ মিনিটের সফল ‘পিচ’ বা প্রেজেন্টেশন কখনো কখনো কোটি কোটি ইউরোর বিনিয়োগের পথ খুলে দিতে পারে।
ভিভাটেক শুধু ব্যবসার জায়গা নয়, এটি প্রযুক্তির এক রঙিন উৎসবও। রোবটের সঙ্গে ছবি তুলছে শিশুরা। তরুণেরা ভার্চ্যুয়াল রিয়েলিটি (ভিআর) হেডসেট পরে অন্য এক জগতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। স্বয়ংক্রিয় গাড়ি নিয়ে মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই। আয়োজকেরা প্যারিসকে সিলিকন ভ্যালির মতো বিশ্বের অন্যতম প্রযুক্তি রাজধানী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চান। ফ্রান্স ইতিমধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল অবকাঠামো খাতে বিলিয়ন ডলার ($) বিনিয়োগ করছে। বাংলাদেশের দৃষ্টিকোণ থেকেও ভিভাটেক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের দেশের তরুণ উদ্যোক্তা ও স্টার্টআপগুলোর জন্য এমন আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে উপস্থিতি এখন আর কোনো বিলাসিতা নয়, বরং টিকে থাকার প্রয়োজন।
ভিভাটেকের প্রদর্শনী হলগুলো ঘুরে একটি বিষয় খুব স্পষ্ট হয়ে ওঠে, প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে মানুষের মধ্যে যেমন উত্তেজনা আছে, তেমনি আছে গভীর উদ্বেগও। এআই কি মানুষের কাজ কেড়ে নিয়ে বেকারত্ব বাড়াবে, নাকি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে? এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো পুরোপুরি মেলেনি। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত, ভবিষ্যৎ নিয়ে যে বিতর্ক, যে প্রতিযোগিতা এবং যে স্বপ্ন—তার অনেকটাই আজ প্যারিসের এই ভিভাটেকে উপস্থিত।
















