দীঘিনালায় তিন দিনব্যাপী ফল মেলা: দেশীয় ফলের পুষ্টিগুণ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলায় শুরু হয়েছে এক বর্ণাঢ্য আয়োজন। ‘করব মোরা ফল চাষ, সংরক্ষণ করব বারোমাস’—এই চমৎকার ও যুগোপযোগী প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে সেখানে তিন দিনব্যাপী জাতীয় ফল মেলা শুরু হয়েছে। বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন বেলা ঠিক ১১টায় উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কার্যালয় প্রাঙ্গণে অত্যন্ত উৎসবমুখর পরিবেশে এই মেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। দেশীয় ফলের পুষ্টিগুণ সাধারণ মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া এবং কৃষকদের ফল চাষে আরও বেশি উৎসাহিত করাই মূলত এই মেলার প্রধান লক্ষ্য। বর্তমানে বাজারে বিদেশি ফলের যে দাপট, তার বিপরীতে আমাদের নিজেদের দেশীয় ফলের কদর ও গুরুত্ব বোঝাতে এই মেলা দারুণ ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

মেলার এই সুন্দর আয়োজনের শুভ উদ্বোধন করেন দীঘিনালা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তানজিল পারভেজ। তিনি নিজ হাতে লাল ফিতা কেটে মেলার আনুষ্ঠানিক সূচনা করেন। উদ্বোধনী এই অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শাহাদাত হোসেন, দীঘিনালা থানার উপপরিদর্শক (এসআই) রাজিব শেখ, উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা সুপন চাকমাসহ কৃষি বিভাগের অন্যান্য অনেক কর্মকর্তা। মেলায় সাধারণ মানুষ ও কৃষকদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। উদ্বোধনের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ার পর অতিথিরা ঘুরে ঘুরে মেলার বিভিন্ন স্টল পরিদর্শন করেন এবং প্রদর্শিত ফলের প্রশংসা করেন।

এই ফল মেলার সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো স্টলগুলোর চমৎকার ও শিক্ষণীয় সাজসজ্জা। মেলায় অংশ নেওয়া প্রতিটি স্টলে আমাদের অতি পরিচিত এবং কিছু অচেনা দেশীয় ফল খুব সুন্দরভাবে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। দর্শনার্থীদের সুবিধার জন্য প্রতিটি ফলের পাশে একটি করে কার্ড রাখা হয়েছে, যেখানে ফলের স্থানীয় নাম, বৈজ্ঞানিক নাম, পুষ্টিগুণ এবং এতে ঠিক কী কী ভিটামিন রয়েছে, তার বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। এর ফলে মেলায় আসা সাধারণ মানুষ শুধু ফল দেখছেন না, বরং তারা ফলের উপকারিতা সম্পর্কে ১০০% সঠিক ধারণা পাচ্ছেন। অনেক ফল আছে যেগুলো পাহাড়ি অঞ্চলে প্রচুর পাওয়া যায়, কিন্তু পুষ্টিগুণ না জানার কারণে মানুষ সেগুলো খুব একটা খায় না। এই মেলা সেই অজ্ঞতা দূর করতে সাহায্য করছে।

মেলা দেখতে আসা সাধারণ দর্শনার্থীরা এমন আয়োজন দেখে বেশ আনন্দিত। চন্দনা চাকমা নামের এক দর্শনার্থী তার ছোট ছেলেকে নিয়ে মেলায় এসেছিলেন। তিনি নিজের অভিজ্ঞতা শেয়ার করে বলেন, “আমি ও আমার ছেলে এখানে এসে এমন অনেক দেশীয় ফল দেখেছি, যেগুলো আগে কখনো নিজেদের চোখে দেখিনি। আমার ছেলে এসব নতুন ফল দেখে খুব আনন্দ পেয়েছে। সে আমাকে বলেছে যে এখন থেকে সে বিদেশি ফলের বদলে দেশীয় ফলই বেশি খাবে। প্রতিটি ফলের পাশে নাম ও পুষ্টিগুণ সম্পর্কে যে তথ্য লেখা আছে, তা আমাদের মতো সাধারণ মানুষের জন্য খুবই শিক্ষণীয় হয়েছে।” শিশুদের মধ্যে এমন ইতিবাচক পরিবর্তনই আসলে এই মেলার সবচেয়ে বড় সার্থকতা।

আমাদের দেশের অর্থনীতিতে ফল চাষের একটি বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শাহাদাত হোসেন এই বিষয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেন। তিনি জানান, জাতীয় ফল মেলার মূল উদ্দেশ্য হলো স্থানীয় জনগণের মধ্যে দেশীয় ফলের পুষ্টিগুণ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা এবং কৃষকদের দেশীয় ফলের বাণিজ্যিক বাগান করতে উৎসাহিত করা। বর্তমানে বাজারে দেশীয় ফলের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। একজন কৃষক যদি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ফলের বাগান করেন, তবে তিনি বছরে অনায়াসেই ১,০০০থেকে২,০০০থেকে২,০০০ (ডলার) সমমূল্যের দেশীয় টাকা লাভ করতে পারেন। এসব ফলের চাষ শুধু আমাদের পুষ্টি নিরাপত্তাই নিশ্চিত করবে না, বরং স্থানীয় গ্রামীণ অর্থনীতিকে মজবুত করতেও অনেক বড় ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তানজিল পারভেজ দেশীয় ফলের সহজলভ্যতা ও পুষ্টিগুণের ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, বিদেশি আপেল বা মাল্টার চেয়ে আমাদের দেশীয় আম, কাঁঠাল, পেয়ারা বা লটকন পুষ্টিগুণে কোনো অংশেই কম নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রে বেশি। সবচেয়ে বড় কথা হলো, দেশীয় ফল আমাদের জন্য তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি সাশ্রয়ী। বিশেষ করে আমাদের শিশুদের মধ্যে ছোটবেলা থেকেই দেশীয় তাজা ফল খাওয়ার সুন্দর অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এই ধরনের চমৎকার আয়োজন স্থানীয় মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি করবে এবং কৃষকদের ফল চাষে নতুন করে আগ্রহ তৈরিতে ১০০% সহায়ক হবে।

তিন দিনব্যাপী এই মেলায় প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের ভিড় থাকবে বলে আয়োজকরা আশা করছেন। মেলায় শুধু ফল প্রদর্শনই নয়, কৃষকদের জন্য উন্নত জাতের চারা রোপণ ও ফল সংরক্ষণের ওপর বিশেষ পরামর্শ দেওয়ারও ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। পাহাড়ি এলাকার কৃষকরা এই মেলা থেকে অনেক নতুন জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা নিয়ে বাড়ি ফিরবেন, যা তাদের আগামী দিনের ফল চাষে অনেক কাজে লাগবে। দীঘিনালার এই ফল মেলা দেশের অন্যান্য উপজেলার জন্যও একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হতে পারে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ