দীর্ঘদিনের পরিচিত রূপ বদলে এবার সম্পূর্ণ নতুন সাজে সাধারণ মানুষের সামনে আসতে যাচ্ছে বাংলাদেশ পুলিশ। পুলিশ বাহিনীর পোশাকে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে সরকার। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এখন থেকে সাধারণ পুলিশের শার্টের রং হবে গাঢ় নীল এবং মহানগর বা মেট্রোপলিটন পুলিশের শার্ট হবে হালকা জলপাই রঙের। আর উভয় ক্ষেত্রেই প্যান্টের রং হবে খাকি। গতকাল বৃহস্পতিবার পুলিশ সদর দপ্তর থেকে এ বিষয়ে একটি আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। এই নতুন পোশাক বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে নতুন কর্মস্পৃহা আনবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, পুলিশ অধ্যাদেশ, ১৮৬১-এর ১২ ধারায় দেওয়া ক্ষমতা ব্যবহার করে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) সরকারের বিশেষ অনুমোদন নিয়ে ‘পুলিশ ড্রেস রুলস, ২০২৫’ সংশোধন করেছেন। এই গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনের মাধ্যমেই মূলত পুলিশের পোশাকের কাপড় ও রঙের বিষয়ে আগের পুরোনো বিধানগুলো পুরোপুরি পরিবর্তন করা হয়েছে। গত বছর জুলাই মাসে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের সময় অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ ও গুলি করে মানুষ হত্যার ঘটনার পর পুলিশের ভাবমূর্তি বেশ প্রশ্নের মুখে পড়ে। তখন থেকেই সাধারণ মানুষ ও বিভিন্ন মহল থেকে পুলিশের পোশাক পরিবর্তনের একটি জোরালো দাবি ওঠে। সেই দাবির প্রতি সম্মান জানিয়ে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার পুলিশ, র্যাব ও আনসারের পোশাক পরিবর্তনের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। যদিও পরে নানা কারণে র্যাব ও আনসারের পোশাকে আর কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি, তবে পুলিশের পোশাক পরিবর্তনের কাজ এবার চূড়ান্ত হলো।
নতুন এই প্রজ্ঞাপনে শুধু পুলিশের শার্ট ও প্যান্টই নয়, এর পাশাপাশি তাদের শীতকালীন জার্সি, কার্ডিগান, পুলওভার, জ্যাকেট এবং নারী পুলিশ সদস্যদের পোশাকের রং-সংক্রান্ত বিধানেও বেশ কিছু চমৎকার পরিবর্তন আনা হয়েছে। আগের পুরোনো বিধানে পুলিশের শার্টের রং ছিল অনেকটা আইরন বা লোহা-ধূসর রঙের, আর প্যান্টের রং ছিল কফি শেল বা কফি-বাদামি ধূসর। কিন্তু এখন থেকে সাধারণ জেলা পুলিশ এবং এপিবিএন, এসপিবিএন, এসবি, সিআইডি ও র্যাব ছাড়া পুলিশের অন্যান্য সব ইউনিটের ক্ষেত্রে ট্রাউজার বা প্যান্ট হবে সম্পূর্ণ খাকি রঙের টিসি টুইল কাপড়ের। আর শার্ট হবে গাঢ় নীল রঙের টিসি প্লেইন ফেব্রিক কাপড়ের। শার্টের সামনে চারটি সুন্দর পকেট থাকবে এবং সামনের অংশে সমান দূরত্বে মোট সাতটি বোতাম থাকবে।
শীতের পোশাকের ক্ষেত্রেও বেশ কিছু সুন্দর পরিবর্তন এসেছে। প্রজ্ঞাপনে স্পষ্ট বলা হয়েছে, আগে ‘লোহা-ধূসর রঙের শার্টের’ ওপর লোহা-ধূসর রঙের ফুলহাতা জার্সি বা জ্যাকেট ব্যবহারের নিয়ম ছিল। নতুন বিধানে সেটির পরিবর্তে এখন থেকে নীল রঙের শার্টের ওপর গাঢ় নীল রঙের ফুলহাতা জার্সি, কার্ডিগান বা পুলওভার যুক্ত করা হয়েছে। জ্যাকেটের ক্ষেত্রেও ‘লোহা-ধূসর রঙের জ্যাকেটের’ বদলে গাঢ় নীল রঙের জ্যাকেট দেওয়া হয়েছে। তবে মহানগর বা মেট্রোপলিটন পুলিশের জন্য এই নিয়মটি একটু আলাদা। তাদের জন্য যুক্ত হয়েছে হালকা জলপাই রঙের জ্যাকেট। অর্থাৎ শীতকালে সাধারণ পুলিশ সদস্যদের জ্যাকেট হবে গাঢ় নীল, আর মহানগর পুলিশের জন্য হালকা জলপাই রঙের জ্যাকেটের বিধান রাখা হয়েছে।
নারী পুলিশ সদস্যদের পোশাকের বিষয়েও প্রজ্ঞাপনে বেশ কিছু আরামদায়ক ও বিস্তারিত নিয়ম বলা হয়েছে। নারী পুলিশ সদস্যরা চাইলে ডিউটির সময় শাড়ি পরতে পারবেন। জেলা পুলিশ ও অন্যান্য সাধারণ ইউনিটের ক্ষেত্রে তারা গাঢ় নীল রঙের শাড়ির সঙ্গে গাঢ় নীল ব্লাউজ পরবেন। তবে মহানগর পুলিশের ক্ষেত্রে গাঢ় নীল শাড়ির সঙ্গে হালকা জলপাই রঙের ব্লাউজ পরার কথা বলা হয়েছে। এছাড়া নারী পুলিশ সদস্যরা চাইলে শালীনতার জন্য মাথার আবরণ বা হিজাব ব্যবহার করতে পারবেন। ট্রাফিক ইউনিটে যেসব নারী পুলিশ সদস্য রোদে পুড়ে কাজ করেন, তারা চাইলে সারা বছরই পূর্ণহাতা শার্ট বা ব্লাউজ পরতে পারবেন। গর্ভাবস্থায় নারী পুলিশ সদস্যরা সংশ্লিষ্ট ইউনিটপ্রধানের পূর্বানুমোদন নিয়ে আরামের জন্য সাধারণ পোশাক পরতে পারবেন।
প্রজ্ঞাপনে দেশের আবহাওয়ার কথা মাথায় রেখে মৌসুম অনুযায়ী শার্টের ধরনও নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। গরমের সময় বা গ্রীষ্মকালে পুলিশের শার্ট হবে অর্ধহাতা বা হাফহাতা। আর কনকনে শীতকালে শার্ট হবে পূর্ণহাতা বা ফুলহাতা। মাথার আবরণের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, সেটি সরকার অনুমোদিত গাঢ় নীল রঙের হবে। বাংলাদেশ সরকার প্রতি বছর পুলিশের পোশাক ও সরঞ্জাম বাবদ মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার ($) খরচ করে থাকে। এই নতুন পোশাক তৈরি করতেও সরকারের বাজেটের একটি বড় অংশ খরচ হবে। তবে নতুন পোশাকের মাধ্যমে পুলিশের প্রতি সাধারণ মানুষের যে আস্থার ১০০% সংকট তৈরি হয়েছিল, তা কিছুটা হলেও কাটবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। নতুন রঙের এই পোশাকে পুলিশ সদস্যদের আরও বেশি জনবান্ধব ও সেবামূলক মানসিকতায় দেখা যাবে, এটাই এখন দেশের সাধারণ মানুষের মূল প্রত্যাশা।
















